বিজ্ঞাপনের জন্য আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম : amaderbharatdesk@gmail.com    পাকিস্তানকে জবাব দিতে আরব সাগরে নামানো হলো আইএনএস বিক্রমাদিত্য ও নিউক্লিয়ার সাবমেরিন।    মুম্বই স্টেশনে ফুটব্রিজ ভেঙে হত ৫, আহত ৩০।    তৃণমূলে বড় ধাক্কা, বিজেপিতে যোগ দিলেন অর্জুন সিং।    বিজেপিই রাজ্যের ভবিষ্যৎ, তাই অনেকেই বিজেপিতে যোগ দিচ্ছেন : দিলীপ ঘোষ।    লড়বেন কী, ঘরেই বিড়ম্বনায় বিজেপির নতুন কৃষ্ণ-অর্জুন।    অর্জুন সিং দু’লক্ষের বেশি ভোটে হারবে দীনেশ ত্রিবেদির কাছে: অভিষেক।    বাংলার মানুষ উন্নয়ন দেখে ৪২ এ ৪২ উপহার দেবে : অপরূপা পোদ্দার।    প্রয়াত বিধায়ককে শ্রদ্ধা জানিয়ে রাজনীতির আঙিনায় সত্যজিত জায়া।     মুকুলের পথ ধরেই কি বিজেপিতে এবার ছেলে শুভ্রাংশু!    সমঝোতা না হলে রাজ্যে একাই লড়বে কংগ্রেস, সাফ জানালেন সোমেন মিত্র।    লোকসভা ভোটে বিপ্লব নয়, বালুরঘাটে অর্পিতার সেনাপতি হচ্ছে বাচ্চু ও শঙ্কর।    জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের বৈঠক এড়ালেন অর্জুন ঘনিষ্ঠ ২২ জন কাউন্সিলার।    আজ আপনার কেমন যাবে জেনে নিন।    বিদেশে বর্ণবিবাদের শিকার হলেন বলিউডের এই অভিনেত্রী!


মায়নমার রাষ্ট্র ও জনগণ কর্তৃক রোহিঙ্গা নির্যাতনের নেপথ্যের কাহিনী

দেবতনু ভট্টাচার্য, সভাপতি, হিন্দু সংহতি, কলকাতা : সম্প্রতি বার্মায় রোহিঙ্গা মুসলিম এবং বার্মিজ বৌদ্ধদের মধ্যে ঘটে চলা সহিংসতা সম্পর্কে জনমনে বেশ ভালো রকমের ভুল বুঝাবুঝি রয়েছে। তাই একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন তৈরি করে এই বিষয়টির উপর আলোকপাত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রোহিঙ্গারা হল একদল মুসলিম সংখ্যালঘু, যারা বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল থেকে অভিবাসিত হয়েছিল এবং বর্তমানে মায়নমারে বসবাস করছে। সম্প্রদায়টি কোনও প্রকারের পরিবার পরিকল্পনা না করে খুব অল্প সময়ের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে নিজেদের বংশ বিস্তার করে ফেলে, যার ফলে সেখানকার স্থানীয় লোকজন অচিরেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়ে এবং নিজেদের জায়গা জমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে বঞ্চিত হতে থাকে।
অবশ্য রোহিঙ্গারা দাবি করে থাকে, তারা রাখাইন প্রদেশের আদিবাসী, অনাদিকাল থেকেই তারা সেখানে বসবাস করে আসছে। যদিও বার্মিজ ঐতিহাসিকরা বলেন যে রোহিঙ্গারা বৃটিশ আমল থেকেই বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল থেকে অভিবাসনের মাধ্যমে বার্মায় প্রবেশ করেছে।
জেনারেল নে উইন-এর সরকার ১৯৮২ সালে বার্মিজ নাগরিকত্ব আইন পাশ করেন যেখানে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব নিষিদ্ধ করা হয়। মূলত বিভিন্ন সময়ে রোহিঙ্গাদের দ্বারা সংগঠিত বিদ্রোহমূলক কর্মকান্ড, বিশেষ করে বিভিন্ন উগ্রপন্থী গ্রুপগুলোর কর্মকান্ডের কারণে এই সিদ্ধান্তটি গৃহীত হয়।
রোহিঙ্গাদের দ্বারা সংগঠিত বিদ্রোহ মূলত পশ্চিম মায়ানমারের উত্তর রাখাইন প্রদেশেই সংগঠিত হয়। বেশিরভাগ সংঘর্ষই বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন মংডাও জেলাতেই হয়ে থাকে।
স্থানীয় মুজাহিদিন গ্রুপগুলো মায়নমারের রাখাইন প্রদেশের কিয়দংশকে মায়নমার থেকে বিচ্ছিন্ন করে পূর্ব পাকিস্তানের সাথে জুড়ে দেওয়ার জন্য ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত যুদ্ধ করেছিল। ১৯৫০ দশকের পরে তারা তাদের জনসমর্থন হারায় এবং সরকারের কাছে আত্মসমর্পন করে।
অধুনা রোহিঙ্গা বিদ্রোহ ২০০১ সালে উত্তর রাখাইন প্রদেশে শুরু হয়েছে, যদিও রোহিঙ্গা অধ্যুষিত অঞ্চলের তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্য শু মং তা অস্বীকার করেন এবং বলেন যে এই নতুন ইসলামিক বিদ্রোহ বাংলাদেশের সীমান্তেই শুরু হয়েছে।


সম্প্রতি কয়েকমাস আগে ২০১৬ সালের অক্টোবরে একটি সংঘর্ষের রিপোর্ট প্রকাশিত হয় যা বাংলাদেশ-মায়নমার সীমান্তে সংগঠিত হয়। এই সংঘর্ষটি শুরু হয় একজন রোহিঙ্গা পুরুষ কর্তৃক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রাখাইন মহিলাকে ধর্ষণ ও খুনের মাধ্যমে। পরবর্তীতে প্রতিশোধ হিসেবে ওই রোহিঙ্গা পুরুষকে খুন করা হয়, আর এভাবেই দাঙ্গার আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এটা কোনও এক পাক্ষিক গণহত্যা ছিল না, ছিল একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, যার ফলে উভয় পক্ষেরই বহু লোক হতাহত হয়।
ইস্যুটি আরও গরম হয়ে উঠে যখন রোহিঙ্গারা বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদেরও খুন করতে শুরু করে। যখন মাত্র দুই মাসের মধ্যে ১৯ জন সন্ন্যাসীকে জবাই করে হত্যা করা হয় তখন সন্ন্যসীরা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে লড়াইরত স্থানীয় জনগণের পক্ষাবলম্বন করেন।

এখন আমাদের প্রত্যেকের মনেই যে প্রশ্ন ওঠে তা হল, বিশ্বের প্রায় সমস্ত জায়গাতেই মুসলিমরা খৃস্টানদের কেন খুন করে? মুসলিমরা মুসলিমদেরও কেন খুন করে? কোনও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী তো ধর্মীয় কারণে মানুষ খুন করে না।
সেই আলোচনায় যাওয়ার আগে, মায়নমারে আমরা দেখতে পাই, মায়ানমারের লোকজন ধর্মান্তরকরণ একেবারেই পছন্দ করেন না। এর মানে হচ্ছে, আপনি যেকোনও একটা ধর্ম পালন করতে পারেন। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি অন্য কাউকে আপনার ধর্মে কনভার্ট করার জন্য চেষ্টা করছেন না ততক্ষণ পর্যন্ত কোনও সমস্যা নেই। খৃষ্টানরা বহু আগেই এই শিক্ষা পেয়েছে। যদিও তারা ধর্মান্তরের চেষ্টা করে, তবে তা খুব নীরবে, নিভৃতে। হিন্দুদের এ ধরণের লক্ষ্য কোনও কালেই ছিল না। বৌদ্ধরাও এ কাজে উৎসাহী নয় কিন্তু মুসলিমরা? বেশ … বেশ… বেশ
রোহিঙ্গাদের বেলায় আমরা দেখতে পাই তারা আন্তঃধর্ম বিবাহের বেলায় অত্যন্ত রক্ষণশীল অবস্থান গ্রহণ করে। যদি কোনও রোহিঙ্গা মেয়ে রোহিঙ্গার বাইরে অন্য কাউকে বিয়ে করে তবে তারা তাকে কঠিন শাস্তি দেয়, ক্ষেত্রবিশেষে মেরেও ফেলে। কিন্তু তারা একটি বৌদ্ধ মেয়েকে বিয়ে করে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তর করতে সবসময়ই প্রস্তুত থাকে। সঙ্গত কারণেই এটা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী জনগণের কাছে ভালো লাগবে না।
বার্মার খৃস্টান এবং হিন্দু যারা জনসংখ্যার দিক দিয়ে দ্বিতীয় ও চতুর্থ স্থানে অবস্থান করে তারা ঠিকই আর দশজনের মত সুন্দরভাবেই জীবন যাপন করছে। যদিও কিছু খৃস্টান জনগোষ্ঠী স্থানীয় বার্মিজদের বিরুদ্ধে দ্বন্দ-সংঘাতে জড়িত, তবে তা নেহাতই জমি-জমা বা সম্পত্তি সংক্রান্ত। এ দ্বন্দ ধর্মীয় দ্বন্দ নয় মোটেও।
এছাড়া বার্মায় যেকোনও ধর্মবিশ্বাসের উপর আঘাতকে রাষ্ট্রীয় অপরাধ হিসাবেই দেখা হয়। কেউ যদি এই অপরাধ করে তাহলে কয়েক ঘন্টার মধ্যেই তাকে জেলে যেতে হবে।
ইতিহাসবিদদের মতে, মায়ানমারে রোহিঙ্গারা যখন প্রথম গিয়েছিল তখন স্থানীয় লোকজন তাদের স্বাগত জানিয়েছিল। শুরুর দিকে খুব একটা সমস্যা ছিল না। যবে থেকে রোহিঙ্গারা পঞ্চাশ কিংবা ষাটের দশকে অস্ত্র হাতে বিদ্রোহ শুরু করল তখন থেকেই সমস্যাটা শুরু হল। তবুও দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ছোটখাটো সংঘর্ষ ছাড়া এটা খুব বড় আকার ধারণ করে নাই, যতদিন না পর্যন্ত বছর পাঁচেক আগের একদিনে মুসলিমরা একটা কান্ড করল। সেদিন কয়েক হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম একত্রিত হয়ে রাজপথে মিছিল করে স্থানীয় বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়, তাদের খুন করে। যে কারণে বার্মার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রতি-আক্রমণ শুরু করে যারা তাদের ভাই-বোনদের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত অঞ্চলে ধরে ধরে খুন করছিল।
কাজেই এটা বুঝতে হবে যে, বৌদ্ধরা মুসলিমদের খুন করছে না বরং স্থানীয় জনগণ বিদ্রোহীদের মোকাবেলা করছে যে জনগণ নিজ দেশে জাতিগত নৃশংসতার স্বীকার। যদি বৌদ্ধরা ধর্মীয় কারণে খুন খারাপি করত তাহলে তারা খৃস্টানদের উপরও হামলা করত। অন্তত খৃস্টানদের বিরুদ্ধে (যারা ধর্মীয় বিচারে দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ) কোনও না কোনও বৈষম্য প্রদর্শন করত যা বার্মায় কখনোই ঘটেনি।
এটাও বুঝতে হবে যে, এখানে কেউই ধর্ম যুদ্ধ করছে না। এটা একটি রাজনৈতিক যুদ্ধ যেখানে স্থানীয় জনগণ বিদেশ থেকে অভিবাসিত হয়ে আসা এক দখলদার জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করছে। এই জনগোষ্টী শুধু অবিশ্বাস্য হারে নিজেদের বংশ বিস্তারই করছে না, অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের জোর করে কিংবা কৌশলে নিজ ধর্মে ধর্মান্তর করার চেষ্টাও করছে। তারা রোহিঙ্গা পুরুষদের বৌদ্ধ নারীকে বিয়ে করতে উৎসাহিত করছে কিন্তু নিজেদের নারীদের বেলায় কোনও বৌদ্ধ পুরুষকে বিয়ে করা নিষিদ্ধ করে রেখেছে। এই যুদ্ধটা রোহিঙ্গা মুসলিমরা স্থানীয় বৌদ্ধদের উপর আক্রমণ করার মাধ্যমে শুরু করেছে, যা পৃথিবীর অন্যান্য জায়গাতেও ঘটছে। রোহিঙ্গারাই আল্লাহু আকবর ধ্বনি দিয়ে মানুষ খুন করছে কিন্তু বৌদ্ধরা ধর্মের নামে এটা করতে পারে না, কেননা তাদের ধর্ম বিশ্বাস তাদের এই কাজ করতে উৎসাহিত করে না। কিন্তু তাদের বেঁচে থাকার তাগিদ আজ তাদের মানুষ খুন করতে বাধ্য করছে।
বার্মার বৌদ্ধরা গত অর্ধ শতাব্দীকাল ধরে দেখছে যে, রোহিঙ্গা মুসলিমরা বহির্বিশ্বের, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, পাকিস্তান, বাংলাদেশ থেকে সহায়তা নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। কাজেই তারা তাদের সমস্যা সমাধানে এই অপ্রিয় পন্থাটাকে বেছে নিয়েছে। বৌদ্ধদের সামনে আজ একটাই প্রশ্ন, তারা কি মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাতে একের পর এক খুন হতে থাকবে নাকি নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে?

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of