“মরলে নিজের বাড়িতেই মরব,” এই প্রতিজ্ঞা করে অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে হেঁটে দক্ষিণ দিনাজপুরে ফিরছেন ৬০ জনের দল

আমাদের ভারত, উত্তর দিনাজপুর, ৯ মে: “মরলে নিজের বাড়িতে এসেই মরবো”। ওখানে মরলে মৃতদেহের কেউ খোঁজ রাখবে না। তাই অন্ধ্রপ্রদেশের গোরক্ষপুর থেকে দক্ষিন দিনাজপুর জেলার হরিরামপুর থানার পুন্ডরী গ্রাম পঞ্চায়েতের বিরাহার গ্রামের ৬০ জনের একটি দল হেঁটেই রওনা হয়েছে। প্রায় অভুক্ত অবস্থায় তারা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। বিহার এবং অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার তাদের কিছুটা সহায়তা দিলেও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফ থেকে এখনও কোনও সাহায্য না পাওয়ায় তারা হতাশ।

মাস তিনেক আগে দক্ষিন দিনাজপুর জেলার হরিরামপুর থানার পুন্ডরী গ্রাম পঞ্চায়েতে ৬০ জনের একটি দল অন্ধ্রপ্রদেশের গোরক্ষপুরে রাজমিস্ত্রির সঙ্গে শ্রমিকের কাজ করতে গিয়েছিলেন। স্ত্রী এবং সন্তানকে তারা সঙ্গেই নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু বাধ সাধল করোনা ভাইরাসের মত মারাত্মক জীবানু। সারা দেশে লকডাউন ঘোষনার পরই তাদের কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যায়। কাজ হারিয়ে পরিবারকে নিয়ে অথৈই জলে পড়েন। কোনও দিন একবেলা আবার কোনও দিন না খেয়ে কাটাবার পর আর সেখানে তাঁরা থাকতে পারছিলেন না। তাদের মনে হয়েছে এই লকডাউনের সময় দু চারটি গাড়ির দেখা মিললেও আগামীতে এই গাড়ি চলচল একেবারে বন্ধ যাবে। মহামারি আরো ভয়াবহ হলে কেউ তাদের পাশে দাড়াবে না। এই ভেবেই তারা গোরক্ষপুর হেঁটে দক্ষিন দিনাজপুর জেলার হরিরামপুর থানার পুন্ডরী গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন।

অন্ধ্রপ্রদেশ পুলিশ তাদের দেখতে পেয়ে একটি গাড়িতে বিহার পর্যন্ত পৌছে দেয়। সেখান থেকে কিছুদূর হাটার পর বিহার পুলিশের নজরে আসে। বিহার পুলিশ তাদের বিহার সীমান্ত পূর্ণিয়া মোড়ে নামিয়ে দেয়। সেখান থেকে হাঁটা শুরু করেছেন। কাল দুপুর বারোটার নাগাদ রায়গঞ্জ থানার শিলিগুড়ি মোড়ে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে একটি গাছের তলায় একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলেন। হরিরামপুরের বাসিন্দা গৃহবধূ সান্তা হাঁসদা জানালেন, গতকাল রাত থেকে তাদের পেটে কিছু পড়েনি। এভাবেই না খেয়ে তাঁরা হেঁটেই চলেছেন। হাতে কিছু পয়সা থাকলেও দোকানপাট বন্ধ থাকায় সেই পয়সা দিয়ে জিনিস কিনতে পারছেন না।

৬০ জনের দল বুধবার রওনা হলেও এখন তারা এগারো জনে এসে ঠেকেছেন। বাকিরা দল ছাড়া হয়েছে। এই ১১ জন দলের অন্য সঙ্গীদের শিলিগুড়ি মোড়ে ট্রাফিক পুলিশের পাশে ফুটপাতে ঠান্ডা জায়গায় জিরিয়ে নিচ্ছিলেন। সেই দলেও ৩০ জন আছেন। তাদের মধ্যে মহিলা এবং ছয়মাসের শিশু থেকে একবছরের শিশুরাও আছে।

দিল কুমার হাঁসাদা জানালেন, বাপ দাদারা কোনওদিন এত দূর হাটেননি। জীবন বাঁচাতে তাঁরা হাটছেন। এক অপরিচিত জায়গায় তাদের মৃত্যু হলে কেউ তাদের দেখতেও আসবে না। কিন্তু নিজের জায়গায় মারা গেলে পরিবারের লোকেদের সামনে মৃত্যু হবে। এই লক্ষ্য নিয়েই তারা হেঁটেই বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। কষ্ট হলেও বাড়ির ফেরার আনন্দেই হেঁটে চলছেন এই আদিবাসী মানুষগুলো

আপনাদের মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here