বাংলা চর্চা ২৫। নজরুলের বাংলায় বিদেশি শব্দ (২)

অশোক সেনগুপ্ত
আমাদের ভারত, ২৪ মে: বাংলা শব্দের প্রয়োগ যাঁদের ভাবায়, তাঁরা সকলেই জানেন কতরকম ভাবে শব্দকে নিয়ে খেলা করেছেন কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর জন্মদিনকে উপলক্ষ করে আজও এ নিয়ে সামান্য আলোকপাত।

“আলগা কর গো খোঁপার বাঁধন দিল ওহি মেরা ফাঁস গয়ি; বিনোদ-বেণীর জরিন্ ফিতায় আন্ধা এশক মেরা ফাঁস গয়ি।“ চিরকালের এই গানের দুটি কলির উল্লেখ করে যূথিকা বসু তাঁর ‘সুর ও বাণীর মালা দিয়ে তুমি’-তে লিখেছেন, “এই গানে বাংলা শব্দের পাশেই উর্দু শব্দ আবার তারপরেই বাংলা শব্দের সহাবস্থান—গজলের পরিবেশটিকে অনেকখানি তুলে ধরেছে। ভাব প্রকাশের ক্ষেত্রেও যেন মনে হয়—‘আলগা কর গো খোঁপার বাঁধন’-এর পর ‘চিত্ত যেথায় হারিয়ে গেছে’ এই ধরনের জোলো বাণীর পরিবর্তে ‘দিল ওহি মেরা ফাঁস গয়ি’ সুপ্রযুক্ত। এছাড়া শব্দ ব্যবহারে কোনো ছুঁৎমার্গ ছিল নজরুলের। নিজের আবেগকে প্রকাশ করতে গিয়ে যখন শব্দের প্রয়োজন হয়েছে তাকেই এনে বসিয়েছেন গানের পংক্তিতে।’

নজরুলের গানে শব্দের ব্যবহার’-এ আমিনুল ইসলাম লিখেছেন, “নজরুল তাঁর কবিতায় যেমন, গানেও তেমনি অজস্র আরবি, ফার্সি-উর্দু-হিন্দি শব্দ ব্যবহার করেছেন। এতে গানের বাণী আরও সমৃদ্ধ ও ব্যঞ্জনানিবিড় হয়ে উঠেছে। গজল ও ইসলামি গানগুলো দেশি-বিদেশি শব্দের যুৎসই ব্যবহারে হয়ে উঠেছে অনন্য। বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধকরণে নজরুলের এই ভূমিকা নিঃসন্দেহে অতুলনীয়। এখানে আরেকটি কথা প্রণিধানযোগ্য—বাংলা ভাষাভাষী মানুষের অর্ধেকেরও বেশি ইসলাম ধর্মানুসারী। তাদের প্রতিদিনের জীবনযাপনে ও কথোপকথনে স্বাভাবিকভাবেই ও অপরিহার্যভাবেই অনেক আরবি-ফার্সি শব্দ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এছাড়া এদেশে বহুদিন ফার্সি রাজভাষা থাকার কারণে এবং মুসলমানদের ধর্মীয় পুস্তকগুলো আরবি ভাষায় লিখিত হওয়ায় অফিস আদালত, ভূমিব্যবস্থাপনা, বিয়ে-শাদির অনুষ্ঠানে শত-শতকথোপকথনে স্বাভাবিকভাবেই ও অপরিহার্যভাবেই অনেক আরবি-ফার্সি শব্দ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। নজরুল ইসলাম এসব শব্দ ব্যবহার করে গানগুলোকেও সেসময়ে সংগীতবিমুখ বাঙালি মুসলমানের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছেন। এটা দূরদর্শিতার পরিচয়বাহী।

তাঁর ব্যবহৃত আরবি-ফার্সি শব্দগুলোর ব্যবহারও চমৎকার। জোছনার কুমকুম, রহমতের ঢল, পুণ্যের গুলিস্তান, রংমহলার তিমির দুয়ার, শিশমহল, নীল পিয়ালায় লালসিরাজী, লালগেলাসের কাচমহলা, দিলদরদীর দিললাগি, বাদশাজাদীর রঙমহল, বিজলী জরিন ফিতা, লু হাওয়ার ওড়না, মিঠাপানির নহর, ফুটন্ত গুলবাগিচা, বিরহের গুলবাগ, শরাবরঙের শাড়ি, বাণ-বেঁধা বুলবুল, তনুর তলোয়ার, গোলাপগালের লালি, চাউনিবাঁ সুমাআঁকা ডাগর আঁখি, গাফেলতির ঘুম, সোনাল ফুলের বাজু, অনুরাগের লাল শরাব, অস্তাচলের প্রাসাদ মিনার, শরাবী জামশেদী গজল, গুলবাহারের উত্তরীয়, ঈদের চাঁদের তশতরী, মদির আঁখির নীল পেয়ালায়, বেদন বেহাগ, সুরের সাকি, নও-বেলালের শিরিন সুর, আল আরাবী সাকি, হৃদয় জায়নামাজ, তৃষ্ণা-দরিয়া, মুসাফির, জরিন হরফ, রাঙা-গুলের বাজার, খুশির জলসা, নূরের দরিয়া প্রভৃতি শব্দের ব্যবহার অভূতপূর্ব এবং অপূর্বসুন্দর।“ (‘চিন্তাসূত্র’, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৫)।
***

আপনাদের মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here