বাংলা বানান চর্চা ২৮। ন্ড ণ্ড

অশোক সেনগুপ্ত
আমাদের ভারত, ২৮ মে: কখন ন্ড আর কখন ণ্ড হওয়া উচিত, গতকাল এ ব্যাপারে অভিজ্ঞ শম্ভু সেনের মতামত আমরা দেখেছি। ফেসবুকে ‘শুদ্ধ বানান চর্চা’ (শুবাচ) গ্রুপে শুভাশিস চিরকল্যাণ পাত্র (২০১৭, ২৪ জুন) এ বিষয়ে অনেকটা আলোকপাত করেছেন।

তিনি লিখেছেন, “ ‘ব্যান্ডেল’-এ গণ্ডগোল! অণ্ড, কাণ্ড, মণ্ড, প্রকাণ্ড, ভণ্ড ইত্যাদি শব্দে ণ্ড হয়; ন্ড হয় না। প্রশ্ন : তাহলে Bandel (পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার একটি শহর) শব্দটি বাংলায় লেখার সময় ব্যাণ্ডেল লিখব, না ব্যান্ডেল লিখব? এই ব্যাপারে আমার মনে হয় যে অণ্ড, ভণ্ড ইত্যাদি শব্দের মতো এই ক্ষেত্রেও ণ্ড ব্যবহার করলে সমস্যা হয় না।

কিন্তু আজকাল অনেকেই ণ্ড-এর বদলে ন্ড ব্যবহার করে শব্দটিকে ‘ব্যান্ডেল’ লিখছেন। এর পিছনে ওদের যুক্তি হল Bandel শব্দটি একটি বিদেশী শব্দ এবং বিদেশী শব্দে ণ্ড ব্যবহার করা চলবে না। আমার কিন্তু মনে হয় অণ্ড, কাণ্ড প্রভৃতি শব্দের মতো ব্যাণ্ডেল শব্দেও ণ্ড ব্যবহার করলে সবরকম শব্দের ক্ষেত্রে একই রকম বানানরীতি বজায় থাকে, যা সুবিধাজনক। প্রসঙ্গত, ব্যাণ্ডেল স্টেশনের পুরনো বোর্ডগুলিতে আজও ব্যাণ্ডেল বানান লেখা আছে, হাল আমলের নতুন বোর্ডগুলিতে ‘ব্যান্ডেল’ বানান লেখা হয়েছে। প্রশ্ন : বিদেশী শব্দের ক্ষেত্রে ণ্ড ব্যবহার করলে দোষ কোথায়?

আরও প্রশ্ন : Bandel, band, pendulum ইত্যাদি শব্দে যদি ন্ড ব্যবহার করা হয় (যেটা অধুনা অনেকেই করছেন) তবে অণ্ড, ভণ্ড, পণ্ডিত ইত্যাদি শব্দে ন্ড ব্যবহার করা যাবে না কেন? পণ্ডিত, অণ্ড ইত্যাদি শব্দের ণ্ড-এর সঙ্গে Bandel-এর nd এর উচ্চারণের তফাৎ কতটা? এখানে মনে রাখতে হবে যে আমাদের যেখানে ন, ণ দুটি বর্ণ আছে সেখানে ইংরাজীতে শুধু n আছে। আমাদের কোথায় ণ, কোথায় ন হবে তার নির্দ্দিষ্ট নিয়ম আছে। বর্তমান ক্ষেত্রে ণ ও ড একই বর্গের (ট ঠ ড ঠ ণ) বলে ণ্ড (ণ +ড) হওয়াই বাঞ্ছনীয় বলে আমি মনে করি।

প্রসঙ্গত, শ্রীজ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের ‘বাংলা ভাষার অভিধান’ গ্রন্থে ‘ব্যাণ্ড’ বানান আছে, ‘ব্যান্ড’ নয়। আমার মতে এটা উনি ঠিকই করেছেন। কিছুকাল আগে বাঁকুড়া শহরের ভৈরবস্থানের কাছে ‘লিজেণ্ড’ নামে একটি বিউটি পার্লারের বিজ্ঞাপন দেখেছিলাম। তারা ইংরেজী Legend শব্দের লিপ্যান্তর করেছেন ‘লিজেণ্ড’ এবং আমার মতে সেটা ঠিকই করেছেন।

অধুনা আমাদের বাংলা একাডেমি যে বিদেশী শব্দে ণ ব্যবহার না করার কথা বলে তা আমি জানি। কিন্তু একাডেমির এই বিধির পিছনে যথেষ্ট সুযুক্তি আছে কিনা তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আমার তো বারে বারে মনে হয় যে বাংলা একাডেমি বাংলার নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে পারছে না এবং ভাষার ক্ষেত্রে আমরা আজও ইংরেজির দাসত্ব করে চলেছি। আমি তাই বানানের ক্ষেত্রে শ্রীহরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও শ্রীজ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস মহাশয়ের অভিধান অনুসরণ করতে শুরু করেছি। ঐ দুই অভিধানে প্রদত্ত বাংলা বানানগুলি ব্যাকরণ ও নিরুক্তের বিচারে যুক্তিপূর্ণ বলে আমার মনে হয়েছে।

বানান যে সর্ব্বদা উচ্চারণ অনুসারী হতে হবে তা কিন্তু নয়। যেমন আমরা লিখি ‘বলছি’, কিন্তু উচ্চারণ করি ‘বোলছি’। লেখা হয় pneumonia, কিন্তু উচ্চারণ করা হয় নিউমোনিয়া (p বাদ)। তেমনি পণ্ডিত, পণ্ড, খণ্ড ইত্যাদি শব্দগুলিতেও ণ-এর সঠিক উচ্চারণ না হলেও শব্দগুলি ওইরকম লেখা হয় এবং সেটা দোষের নয়।

একইভাবে উচ্চারণ ‘ব্যান্ডেল’ (বা তার কাছাকাছি) করলেও বানান ‘ব্যাণ্ডেল’ লিখলে তা দোষের হয় না, বরং পণ্ডিত, খণ্ড ইত্যাদি শব্দগুলির সঙ্গে একত্রে স্থান পেয়ে তা আমাদের ব্যাকরণ ও নিরুক্তের রীতিকে ধরে রাখে। এছাড়া ভাষায় ভাষায় গভীর সম্পর্ক থাকে এবং শেষ বিচারে কোনো ভাষাই বিদেশী নয়। তাই শব্দের দেশি-বিদেশি জাতপাত বিচার না করে প্রাচীনদের মতো একরকম বানানবিধি চালু রাখার কথা আমরা বিবেচনা করতেই পারি। সেটা করলে অধুনা বানান নিয়ে যেসব বিশৃঙ্খলা হচ্ছে সেগুলি দূর করার একটা ভালো উপায় পাওয়া যায়।“

এ প্রসঙ্গে অভিজ্ঞ অধ্যাপক তথা প্রাক্তন উপাচার্য ডঃ অচিন্ত্য বিশ্বাসের মন্তব্য, “পুরোন সাহিত্যে -এর রূপ (morph) একালের পণ্ডিতরা বোঝেননি। ষ্ণ-এর morph -ও তাই। আসলে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত ণ লেখা হত ল-এর মত। ণ্ড ষ্ণ -এর বোঝায় সেই ইতিহাস রয়ে গেছে। একে অন্য ভাবে লেখা ঠিক নয়। তাতে পুরোন সাহিত্যের সঙ্গ বিচ্ছেদ হতে বাধ্য। বিদেশি শব্দে ন্ড হলে আপত্তি নেই।“
***

আপনাদের মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here