বাংলা বানান, শব্দের উৎস, প্রবাদের নানা কথা–১, সংকলন— অশোক সেনগুপ্ত

অশোক সেনগুপ্ত
আমাদের ভারত, ২৫ মে:
আমরা অনেকে অজস্র লিখি। বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমের প্রসারের সঙ্গে লেখার সংখ্যা, বিস্তৃতি দুইই বেড়েছে। কিন্তু কতটা সতর্ক থাকার চেষ্টা করি শব্দপ্রয়োগে? বানান নিয়ে বিভ্রান্তি বা ধন্দ থাকেই। ক’জনই বা পরিচিত বিশেষজ্ঞদের মতামত চাই। এই ভাবনা থেকে ভ্রাতৃসম সাংবাদিক প্রদীপ দাসের সহযোগিতায় ’২২-এর ১ মে শুরু করি এই আলোচনা। তারই প্রথম ২৫টির একটি সংকলন।

সূচি

১। দাবদাহ
২। পদবী
৩। চাপান উতোর না চাপান উতর
৪। ঈদ না ইদ
৫। ময়নাতদন্ত
৬। আক্কেল গুড়ুম
৭। হিন্দু
৮। দারুন, দারুণ / ধরন, ধারণ
৯। মা
১০। রবীন্দ্রনাথের বানান ও দেবপ্রসাদ ঘোষ
১১। রবীন্দ্রভাবনা
১২। আকাদেমী না আকাডেমী
১৩। চ্যাংদোলা চ্যাং কেন?
১৪। প্রাতরাশ, প্রাতর্ভ্রমণ
১৫। সস্তার তিন অবস্থা
১৬। কর/বল/লেখ
১৭। মে মাহাত্ম্য
১৮। উচ্চারণ বদলে যায়
১৯। সঙ্গীত/সংগীত, অঙ্ক/অংক
২০। এত/এতো, তত/ততো, যত/যতো, কত/কতো
২১। চন্দ্রবিন্দু
২২। জলকে চল
২৩। ডাল-কুকুর
২৪। নজরুলের বাংলায় বিদেশি শব্দ (১)
২৫। নজরুলের বাংলায় বিদেশি শব্দ (২)

১।
দাবদাহ

প্রচারমাধ্যমে সামগ্রিকভাবে অতি সম্প্রতি যে বাংলা শব্দটা বহুল ব্যবহৃত হয়েছে, সেটি হল দাবদাহ। কথাটার আভিধানিক অর্থ ‘জঙ্গলে আগুনের তাপ’। তাহলে আমরা যে গরমে কাটাচ্ছি, সেটাকে দাবদাহ বলা কতটা উচিত?

বছর ছয় আগে পর্যন্ত আনন্দবাজার পত্রিকার রিপোর্টারদের কপি মূলত দেখতেন রতনমনি জানা। যথেষ্ঠ যত্নবান ছিলেন ব্যকরণ-বানান নিয়ে তিনি এক্ষেত্রে দাবদাহ লেখা একেবারেই পছন্দ করতেন না। এই গরমকে দাবদাহ লেখা উচিত? নিছক শুদ্ধতার যুক্তি খুঁজতে আমি চার জন বরিষ্ঠ ব্যক্তির কাছে এ ব্যাপারে মতামত চাইলাম। প্রাক্তন উপাচার্য ডঃ পবিত্র সরকারের মত, “না। দাব মানে জঙ্গল। তবে প্রচলনে অনেক শব্দের মূল অর্থ থাকে না।“ আর এক প্রাক্তন উপাচার্য ডঃ অচিন্ত্য বিশ্বাসের মত, “এ ধরনের ব্যবহারকে বলে রূঢ়ী প্রয়োগ। দারুণ গরম যেন বনের আগুনের মত। ব্যবহার করা যায়।“

এঁরা দুজনেই সাহিত্যের শ্রদ্ধেয় ও বরিষ্ঠ অধ্যাপক। এবার বাংলা চর্চা করেন এমন দু’জনের মতামত। আনন্দবাজার পত্রিকার প্রাক্তন অ্যাসিস্টেন্ট এডিটর রথীন্দ্রমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত, “ব্যবহার করা যায় না। বহুল ব্যবহারে অনেক শব্দ ভিন্ন অর্থে চালু হয়ে যায়। তখন দিব্য তার ব্যবহার চলে। যেমন, সোচ্চার শব্দের আভিধানিক অর্থ দেখে নিও‌ (সশব্দে মলত্যাগ), আর এখন কী অর্থে ব্যবহার হয়?“ ওই দৈনিকের প্রাক্তন উপ বার্তা সম্পাদক শম্ভু সেনের মতে, “আমি অন্তত এটা ব্যবহারের পক্ষপাতী নই। দাবদাহ বললে জঙ্গলের আগুনই বোঝায়। এই সময়ের গরমকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা কর। তাপদাহ বলতে পারিস। just আমার suggestion.“
***

২।
পদবী

৩০/৪/২২-এ অনলাইন আনন্দবাজারে পুলিশের ডিজি-র পদবী মালবীয় দেখে জানতে চাইলাম ওটা মালব্য নয় কেন? ওঁদের সিনিয়র এবং নিষ্ঠাবান সাংবাদিক উজ্জল চক্রবর্তীকে ছোট্ট দেখেছিলাম। এখন অ্যাসিস্টেন্ট এডিটর (বিনয় করে বলেন, হইনি, আমাকে করা হয়েছে)। তিনি উত্তরে জানালেন, “আনন্দবাজার মালবীয় লেখে, হিন্দি বানানেও উনি তাই লেখেন। এটাকে মালব্য করা যাবে না, কারণ Vya নয় Viya…”। অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণ।

অনেকে বলেন, লেখেন আচারিয়া। আবাপ লিখত আচার্য। কারণ, ওটাই শব্দের মূল উৎস। এখন কী লেখা হয় জানিনা। একবার তৎকালীন সাংসদ বাসুদেব আচারিয়া অনুরোধ করলেন, তাঁর পদবীটা যেন আচার্য না করা হয়। তাঁর অনুরোধকে মান্যতা দেওয়া হয়েছিল।

অগ্নিমিত্রা নিজের পদবী ‘পল’ বলতে পছন্দ করেন। আমার প্রশ্ন পল মানে কী? পল বলে বাঙালিদের কোনও স্বীকৃত পদবী আছে? পদবীটা অনেকের কাছে শ্রুতিমধুর নয় বলে কী আ-কার বাদ দিয়ে একটু মেমসাহেব হওয়ার চেষ্টা? আমি পাল-ই লিখি। জানিনা অন্যায় করি কিনা।

মালব্য-মালবীয় প্রসঙ্গে আবাপ-র প্রাক্তন উপ বার্তা সম্পাদক শম্ভু সেনের বক্তব্য, “মালবীয় a class of high caste। আসলে নামের ক্ষেত্রে নিয়মটা হল যে যে ভাবে নিজের নাম লেখেন সেই ভাবে লেখা। কেউ যদি মালবীয় লেখেন সেটাই লেখা উচিত। যে কারণে গাওস্কর লেখা হয়। জায়গার নামের ক্ষেত্রেও তাই। গোয়ালিয়র গেলেই দেখা যাবে শহরের সর্বত্র লেখা আছে গ্বালিয়র। তাই আমাদেরও লেখা উচিত গ্বালিয়র।“
চর্চা করলে কোন শব্দটা ঠিক, বুঝতে সুবিধা হবে।
***

৩।
চাপান উতোর না চাপান উতর

সংসদ বাংলা অভিধান বলছে চাপান মানে, “কবিগান তরজা প্রভৃতিতে এক পক্ষ কর্তৃক অপর পক্ষকে সমাধানের জন্য প্রদত্ত সমস্যা।“ উতোর, উতর দুটোই শুদ্ধ।

অন্যত্র পাচ্ছি, এক কবি প্রথমে অপর দলের কবিকে উদ্দেশ করে প্রশ্নাকারে কোনও পদ্য ছুঁড়ে দিতেন। অপর কবি সে অনুযায়ী তাৎক্ষণিক একটি ছন্দ বানিয়ে পাল্টা জবাব দিতেন। প্রথম দলের কথাকে বলা হতো ‘চাপান’, আর দ্বিতীয় দলের কথাকে বলা হতো ‘উতোর’। এই প্রসঙ্গে বলি, কবিয়াল-এর অর্থ দলপতি। সরকারও বলা হয়। আর দোহার কথাটার অর্থ কবিয়ালের সঙ্গী।

আনন্দবাজার পত্রিকার প্রাক্তন উপ বার্তা সম্পাদক শম্ভু সেনের প্রতিক্রিয়া, “চাপান আর উতোর দু’টো আলাদা শব্দ নয়। শব্দটা হল – চাপানউতোর। এটা কেউ কেউ চাপানউতর বলতে পারে, কিন্তু সেটা উচ্চারণের তফাতের জন্য। অঞ্চল ভিত্তিতে উচ্চারণ তো আলাদা হয়ে যায়। এখন সংসদ যা বলছে আর অন্যত্র যা বলা হচ্ছে, তাদের মধ্যে কোনো তফাত নেই। ‘চাপানউতোর’ শব্দটা যে কবিগান বা তরজার আসর থেকে এসেছে তা দু’ পক্ষই বলছে। এবং এটা প্রশ্নই হোক বা সমস্যা হোক, এক পক্ষ আর-এক পক্ষের দিকে ছুড়ে দিচ্ছে বা চাপিয়ে দিচ্ছে। ভেবে দেখ – চাপিয়ে দিচ্ছে, যা থেকে এসেছে চাপান। এ বার প্রতিপক্ষের দায়িত্ব হল সেই চাপানের উত্তর দেওয়া। সেই ‘উত্তর’ শব্দ থেকে এসেছে উতোর। দুয়ে মিলে হল চাপানউতোর। এটা হল আভিধানিক অর্থ। এখন আমরা যে কোনো তর্ক- বিতর্ককে চাপানউতোর বলে থাকি।“
***

৪।
ঈদ না ইদ

আজ পবিত্র ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা জানানোর দিন। ভারত-বাংলাদেশের বাংলাভাষীদের একটা বড় অংশের মানুষের মনে এর বানান নিয়ে ধন্দ রয়েছে।সংসদ বাংলা অভিধানে ঈদ্-উল্-ফিৎর, ঈদ্-উল্-জোহা এভাবে লেখা আছে। এই অভিধানে ইদকে লেখা হয়েছে ঈদের প্রকারভেদ।

কাজী নজরুল ইসলাম ‘কৃষকের ঈদ’ কবিতায় লিখেছেন—
“জীবনে যাদের হররোজ রোজা ক্ষুধায় আসে না নিদ
মুমূর্ষু সেই কৃষকের ঘরে এসেছে কি আজ ঈদ?
একটি বিন্দু দুধ নাহি পেয়ে যে খোকা মরিল তার
উঠেছে ঈদের চাঁদ হয়ে কি সে শিশু-পাঁজরের হাড়?“ অন্যত্রও লিখেছেন ‘ঈদ’।

দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডঃ সোমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত জানতে চেয়েছিলাম। তাঁর কথায়, “ইদ নয়, Eid অর্থাৎ ঈদ“। আনন্দবাজার পত্রিকার প্রাক্তন উপ বার্তা সম্পাদক শম্ভু সেনের মতে, “এটুকু জানি বাঙালি মুসলমানরা বাংলায় লেখেন ঈদ। এটা তো বাংলা শব্দ নয়। আরবি শব্দ। আরবিতে নিশ্চয় ঈদ লেখে। অন্তত ঈদের ইংরিজি বানান দেখে তাই মনে হয় – Eid।“

ফেসবুকে ‘শুদ্ধ বানান চর্চা’ গ্রুপের সদস্য মহম্মদ আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, আমার জানামতে বাংলা একাডেমী সর্বশেষ ২০১৬ সালে প্রমিত বানান রীতি সংশোধন (হালনাগাদ) করে। তার ভিত্তিতে বাংলা অভিধানও রচিত হয়। বহুল প্রচলিত ‘ঈদ’ শব্দটিকে ‘ইদ’ রূপে লেখার পরামর্শ দেওয়া হয়।এক্ষেত্রে তাদের যুক্তি হলো, ইদ বিদেশী শব্দ, আর কোন বিদেশী শব্দের বানানে দীর্ঘ-ই ব্যবহৃত হবে না। অন্য একটি যুক্তি হলো- ঈদ শব্দটি উচ্চারণে দীর্ঘ স্বর উচ্চারিত হয়না। প্রকৃতপক্ষে ঈদ শব্দটি উচ্চারণে দীর্ঘ স্বরই উচ্চারিত হয়। আর তারা যে সুত্রের কথা বলেন, তা তাদের নিজেদের তৈরি। এটা কোন অপরিবর্তনীয় ধর্মীয় বাণী নয়। তাদের এ বানান রীতি বাংলাভাষী মুসলিম জনগোষ্ঠী গ্রহণ সহজভাবে করেনি। অনেকে নিমরাজি বা বাধ্য হয়ে ইদ বানান লিখছে। আবার অনেকে ঈদ বানানই লিখছে (যা একাডমীর মতে ভুল)।

ইদুলফিতর না কি ইদুল ফিতর— এই প্রশ্নের উত্তরে মহম্মদ আশরাফুল ইসলাম জানিয়েছেন, বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান অনুযায়ী
ইদুলফিতর বা ইদুল-ফিতর।
***

৫।
ময়নাতদন্ত

রাজনৈতিক খুনোখুনি বেড়ে যাওয়ায় প্রচারমাধ্যমে বেশি আসছে ময়নাতদন্ত কথাটা। সংসদ বাংলা অভিধান লিখেছে, “আর্বি মুয়ায়নহ্ থেকে এসেছে ময়না।“ উইকিপিডিয়াতে লেখা, ময়নাতদন্ত আরবি ময়না এবং সংস্কৃত তদন্ত মিলে একটি বিশেষণ পদ। অর্থ-অস্বাভাবিক বা আকস্মিক মৃত্যুর কারণ উদঘাটনের উদ্দেশ্যে শবব্যবচ্ছেদ। ইংরেজিতে “পোস্ট-মর্টেম” শব্দটি ল্যাটিন থেকে পোস্টের জন্য এসেছে, যার অর্থ “পরে” এবং মর্টেমের অর্থ “মৃত্যু”।

‘জি বাংলা’ অন্য তত্ব পরিবেশন করেছে। তাদের কথায়, “আমরা জানি, ময়না পাখি দেখতে মিশমিশে কালো এবং তার ঠোঁট হলুদ। এই পাখি প্রায় তিন থেকে তেরো রকম ভাবে ডাকতে পারে। অন্ধকারে ময়না পাখিকে দেখা যায় না চোখে। অন্ধকারের কালোয় নিজের কালোকে লুকিয়ে রাখে এরা। শুধু মাত্র অভিজ্ঞ মানুষ তার ডাক শুনে বুঝতে পারেন, যে, এটা ময়না পাখি। না দেখা ময়না কে যেমন অন্ধকারে শুধু কণ্ঠস্বর শুনে আবিষ্কার করা যায়, তেমনই পোস্টমর্টেমেও অন্ধকারে থাকা কারণকে সামান্য সূত্র দিয়ে আবিষ্কার করা হয়। সামান্য সূত্র থেকে আবিষ্কার হয় বড় থেকে বড় রহস্যের সমাধান। পাওয়া যায় আসল অপরাধীদের। পাওয়া যায় মৃত্যুর কারণ। তাই পোস্ট মর্টেমের বাংলা হয়েছে – ময়না তদন্ত (২০১৬, ১০ মে)।

২০২১-এর ২৪ জুন ‘গাজীপুর কথা’-তেও একই তত্ব। সঙ্গে লেখা হয়েছে, খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দে প্রথম কোনো মৃতদেহের পোস্টমর্টেম করা হয় বলে জানা যায়। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৪ সালে রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারের মৃত্যুর পর তাঁর মৃতদেহের পোস্টমর্টেম হয়েছিল। তখন এর রিপোর্টে বলা হয়েছিল জুলিয়াস সিজারকে ২৩ বার ছুরিকাঘাত করা হয়েছে।

যাই হোক, বিজ্ঞান বা ইতিহাস নয়, আমার বিচার্য ব্যাকরন। ময়না তদন্ত না ময়নাতদন্ত? দুরকমই দেখা যায়। কোনটা ঠিক? কেন? এ ব্যাপারে ভাষাবিদ তথা ডায়মন্ডহারবার মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডঃ সোমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে জানতে চেয়েছিলাম। তিনি জানান, “ময়নাতদন্ত। একটি কথা। আরবি ভাষা থেকে ‘मुआयना’ শব্দটি এসেছে, যার অর্থ inspection, जांच पड़ताल (Hindi). তদন্ত (সংস্কৃত শব্দ )–সন্ধি বিচ্ছেদ — তদ্ + অন্ত, অর্থাৎ তার শেষ। ভালো করে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে মৃত্যুর কারণ (শেষ) জানা।“

এক্ষেত্রে সুরতহাল কথাটিও চালু। এর অর্থ তদন্তের উদ্দেশ্যে কোনও ঘটনা বা অকুস্থলের চাক্ষুষ বিবরণ; আদালতের এজাহার। আরবি সুরত অর্থ চেহারা, আকৃতি। খুবসুরৎ। আরবি হাল অর্থ বর্তমান কাল, চলতি (হালনাগাদ), বর্তমান (হাল আমলের) প্রভৃতি।
***

৬।
আক্কেল গুড়ুম

আক্কেল দাঁত আর আক্কেল গুড়ুম কথাদুটোর কোনও মিল আছে সংসদ বাংলা অভিধান বলছে আরবি ‘আকল’ থেকে আক্কেল শব্দটি এসেছে। এর অর্থ বুদ্ধি, বিবেচনা, কাণ্ডজ্ঞান। আর আক্কেল দাঁত পূর্ণবয়সে উদগত দাঁত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক তারিক মনজুরও এই তত্বের সমর্থন করেছেন। তাঁর মতে, “‘গুড়ুম’ হলো কামান থেকে গোলা বের হওয়ার শব্দ। আকস্মিক কোনো ঘটনায় আমাদের বুদ্ধি, বিবেচনা মাঝেমধ্যে লোপ পায় বা হারিয়ে যায়। হতবুদ্ধি হয়ে যাওয়ার এই পরিস্থিতিকে বলা হয় আক্কেল গুড়ুম অবস্থা। কামানের গোলা লেগে বুদ্ধি হঠাৎ উড়ে গেলে যে অবস্থা হয়, আরকি!“ (প্রথম আলো, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২১)।

***
৭।
হিন্দু

উইকিপিডিয়ায় দেখা যাচ্ছে, গেবিন ফ্লাডের মতে, “আসল পরিভাষা হিন্দু প্রথম দেওয়া হয় ফার্সি ভৌগোলিক পরিভাষায়। যেটির মাধ্যমে সিন্ধু নদীর পাশে বসবাসকারী লোকেদের বোঝানো হত। শব্দটি দিয়ে তখন ভৌগোলিক অবস্থান বোঝানো হত, কোনও ধর্মকে বোঝানো হত না। খ্রিষ্টীয় চতুর্দশ শতাব্দীতে আরব, পারসিক ও আফগানরা ওই অঞ্চলের অধিবাসীদের প্রথম ‘হিন্দু’ নামে অভিহিত করে। 

মধ্যযুগীয় ভারতের ঐতিহাসিক বিবরণীগুলি থেকে দেশীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার বর্ণনায় ‘হিন্দু’ শব্দটির প্রয়োগের কথা জানা যায়। পরবর্তীকালে আরবি সাহিত্যেও ‘আল-হিন্দ’ শব্দটির মাধ্যমে সিন্ধু নদ অববাহিকায় বসবাসকারী জনগোষ্ঠীকে বোঝানো হয়েছে। 
ফেসবুকে পূজা সুকুল মুখার্জির ব্যাখ্যা, “হিন্দু শব্দটির সংস্কৃত অর্থ সিন্ধু। মূলত যারা সিন্ধু নদের তীরে বসবাস করত তাদের হিন্দু বলা হত অর্থাৎ সিন্ধু সভ্যতার লোকদের। মুসলিমরা সংস্কৃত শব্দ সিন্ধু শব্দটিকে উচ্চারণটি করতে পারতনা। তারা সিন্ধুকে হিন্দু (ফার্সি শব্দ) উচ্চারন করত।“ শম্ভু সেন প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, “একদম সঠিক ব্যাখ্যা। এর সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই।“

৩৮ বছরের বাংলা অধ্যাপনায় অভিজ্ঞ তথা প্রাক্তন উপাচার্য ডঃ অচিন্ত্য বিশ্বাস এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, “হিন্দু শব্দের অর্থ সিন্ধুতীরবর্তী, পরে সিন্ধু থেকে পূর্ব দেশের মানুষ। গ্রীকরা বলত ইন্ডিক। দেশ ও দেশবাচক শব্দটি আরবী আক্রমণের পর ধর্মাবলম্বী হয়েছে দ্বাদশ শতাব্দী থেকে।“
***

৮।
দারুন, দারুণ / ধরন, ধারণ

অক্ষর শুদ্ধ বানান ও ভাষা চর্চা ফেসবুক গ্রুপে
#বানানের_টিপস্-এ স্বপন ভট্টাচার্য লিখেছেন, “দরুন, দারুণ / ধরন, ধারণ– এই শব্দগুলো লিখতে গিয়ে আমরা প্রায়ই গুলিয়ে ফেলি। ‘ন’ এর জায়গায় ‘ণ’ আবার কখনও বা ‘ণ’ এর জায়গায় ‘ন’ বসিয়ে দিই।

আমরা জানি যে ণত্ববিধি অনুযায়ী ঋ, র আর ষ-এর পর ‘ন’ এলে তা হবে ‘ণ’। সেই হিসেবে দারুণ বা ধারণ এই বানানগুলো ঠিকই আছে। কিন্তু তাহলে কেন ‘দরুন’ আর ‘ধরন’ বানানে ‘ন’? এর কারণ হল ণত্ববিধি প্রযোজ্য হবে শুধুমাত্র তৎসম শব্দে। আর ‘দরুন’, ‘ধরন’ এই শব্দগুলো তৎসম শব্দ নয় তাই আমরা লিখব ‘ন’। এই প্রসঙ্গে আর একটা কথা বলে নিই। ‘ধরণ’ (ধৃ+অন) একটা সংস্কৃত শব্দ‌ও আছে। অর্থাৎ ধরে আছে যে। তবে এই অর্থে ‘ধরণ’ শব্দটার বাংলায় ব্যবহার প্রায় নেই বললেই চলে। শব্দটা বাংলায় ‘ধর’ বানিয়ে নিয়েছি। যেমন:- মুরলীধর (মুরলীধরণ), বংশীধর (বংশীধরণ)। আমরা সাধারণত বাংলায় যে ‘ধরন’ শব্দটা ব্যবহার করি তা একটা অতৎসম শব্দ যার মানে রকম বা প্রকার আর এই শব্দের বানানে ন ব্যবহার করাই বাঞ্ছনীয়।
***

৯।
মা

“আমি যদি দুষ্টুমি ক’রে
চাঁপার গাছে চাঁপা হয়ে ফুটি,
ভোরের বেলা মা গো, ডালের ’পরে
কচি পাতায় করি লুটোপুটি,”

মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার বিশ্ব মা দিবস। ’২০২২-এ দিনটি ৮ মে, অর্থাৎ আজ। আর রাত পোহালেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন। আজকের আলোচনায় আনলাম ‘মা‘ কথাটাকে।

মাত্র ১৪ বছর বয়সে মাতৃহারা হন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তবু একাধিক ছড়া লিখেছিলেন মা নিয়ে। শুরুতে স্মরণ করেছি রবীন্দ্রনাথের ‘লুকোচুরি’-র ক’টা পংক্তি। সংস্কৃত মাতৃ-মাতা থেকে বাংলায় মা। এদেশে বিভিন্ন ভাষাতেও মা কথাটায় ম-এর ছোঁয়া বেশি। হিন্দিতে मां, অসমীয়াতে মাঁ, মরাঠি ভাষায় आई, গুজরাটিতে માતા (মাতা), তামিলে அம்மா (আম্মা), তেলুগুতে తల్లి (তাল্লি), গুরুমুখীতে ਮਾਂ (Māṁ)। বিদেশি নানা ভাষাতেও তাই— ইংরেজিতে Mother,জার্মান ভাষায় Mutter, স্প্যানিশে madre, গ্রিক ভাষা μητέρα (মিতেরা), ফরাসি ভাষায় mère.

বিভিন্ন ভাষায় কাব্য-সাহিত্য-সঙ্গীতে মাতৃবন্দনার ছড়াছড়ি। দেশকে দেখা হয়েছে মা হিসাবে। আমার তো প্রথমেই মনে আসে ’ও মা,   ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে,“ লাইনটা। কবিগুরু ‘আমার   সোনার বাংলা’ গানে ১১ বার ব্যবহার করেছেন মা কথাটা। আর ‘জনগণমন অধিনায়ক’-এ তিনি লিখেছেন “দুঃস্বপ্নে আতঙ্কে   রক্ষা করিলে অঙ্কে স্নেহময়ী তুমি মাতা।“

‘বন্দেমাতরম’-এ বঙ্কিমচন্দ্র সাত বার ‘মাতরম’ ও তিন বার ‘মা’ কথাটা ব্যবহার করেছেন। ১৮৯৬-তে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে প্রথম রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গাওয়া হয় বন্দে মাতরম গানটি।  অধিবেশনে গানটি পরিবেশন করেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
***

১০।
রবীন্দ্রনাথের বানান ও দেবপ্রসাদ ঘোষ

“তিনি কবিগুরু, বিশ্ববরেণ্য হতে পারেন, কিন্তু তিনিও ‘বাণান’ ভুল করেন— এই অভিযোগ জানিয়ে খোদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে চিঠি লিখেছিলেন বরিশালের ব্রজমোহন স্কুলের ছাত্র দেবপ্রসাদ ঘোষ! বাংলা ভাষা ও ‘বাণান’ নিয়ে তাঁর খুঁতখুঁতানি ছিল নজিরবিহীন।“

এ কথার পর ঈশানী বসাক জানিয়েছেন, “রবি ঠাকুরকেও বেমক্কা প্যাঁচে পড়তে হয়েছিল বইকি! বানান যে ভুল ‘বাণান’, তার ভূরিভূরি উদাহরণ আলমোড়ায় চিঠিতে পাঠিয়েছিলেন শ্রীযুক্ত দেবপ্রসাদ ঘোষ। এমন সাহস এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা বোধহয় একটু দুর্লভ।

রবি ঠাকুর ও অন্যান্য পণ্ডিতরা কি কখনও ভুল করতে পারেন, এমন অজুহাতে খড়ের কুটোর মতো চেপে ধরেছিলেন ‘বাণান’ কমিটির হোতাদের। বোধহয় কিছুটা ক্ষুণ্ণ হয়েই বলে ফেলেছিলেন, অনেকে অনেক কথাই বলবেন কিন্তু তার জন্য তুমি রবে নিরুত্তর। অথচ ফরাসি ভাষার ‘সিল ভু প্লে’-কে তিনি ভুল করে ‘সি ভু প্লে’ লিখেছিলেন। আর যাঁরা সত্যিকারের বই, ধর্ম এবং কর্ম ভাবতেন, তাঁরা অত ভাবেন না লেখক ব্যক্তিটি কে! আর তাই সরাসরি কলকাতা থেকে আলমোড়া কাগজের মোড়কে পুরে রাখা বার্তার পৌঁছাতে দেরি হয়নি। সেই পত্রালোচনা দেখিয়ে দিয়েছে, রবি ঠাকুর হোক কিংবা শেক্সপিয়ার— ‘বাণান’ ভুল এঁদের মতো মানুষ করলে তার দায় থেকেই যায়, কারণ সাধারণ মানুষের কাছে তাঁদের ব্যবহার্য বানানই শেষ কথা।

বরিশালের ব্রজমোহন স্কুলের খ্যাতিমান ছাত্র দেবপ্রসাদ ঘোষ ছিলেন অঙ্কে পণ্ডিত, কিন্তু শুধু অঙ্কেই তিনি আটকে ছিলেন না। আক্রমণাত্মক রক্ষণশীল চরিত্রের এই মানুষটি বাংলা ভাষাকে আন্তরিক ভাবে ভালোবাসতেন এবং তাঁর মর্যাদা রক্ষা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। একদা রবীন্দ্রনাথের উৎসাহে এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে বানান সম্পর্কে কিছু নববিধান আনার চেষ্টা করা হয়েছিল। ‘বাণান’ কমিটিতে ছিলেন রাজশেখর বসু, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, শহীদুল্লার মতো ভাষাতাত্ত্বিকগণ। কিন্তু নাম অথবা পদ দেখে কথা বলতেন না পণ্ডিত দেবপ্রসাদবাবু। কমিটিতে বৌ শব্দে ঔ কার বাদ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সুনীতিবাবু বলেন যে বউ শব্দটি দেখতে ভালো। দেবপ্রসাদবাবু দেখিয়ে দেন যে ‘বৌ’ শব্দটিই ঠিক উচ্চারণ, কারণ এটি diphthongal এবং monosyllabic। ‘বৌ’ এক নিঃশ্বাসে উচ্চারিত হচ্ছে, ব-উ ডিসিলেবিক। তাঁর রক্ষণশীলতা বাংলা ভাষার আদি রূপ রক্ষার্থে সদাজাগ্রত।

ছবি: লেখক অশোক সেনগুপ্ত।

আমরা তাঁর পত্রে দেখেছি, তিনি বলেছেন যে এই ভাষা নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার কারও নেই, এই ভাষার রূপ সুপ্রতিষ্ঠিত। তা যেন ভাঙা না হয়৷ নির্দ্বিধায় মহাকবিকে তিনি জানান, তাঁর বড় ছেলেটি থার্ড ক্লাসে পড়ে এবং তাঁর জন্য তিনি রবিবাবুর ‘ছুটির পড়া’ বইটি কিনেছিলেন। সেখানে ‘সূর্যকিরণের ঢেউ’ প্রবন্ধে Wave theory of light-এর আবিষ্কর্তা হিগেন্সের নাম দেওয়া আছে। তিনি কবিকে জানান যে ব্যক্তির নাম হয়গেন্স (Huygens) এবং তাঁর নিবাস ডেনমার্ক নয় হল্যান্ড। তিনি এ-ও জানান, বইটি ২৮ বছর আগে মুদ্রিত এবং বহুবার নতুন সংস্করণ বেরিয়েছে, তবু এই ভুলটি শুধরানো হয়নি। তা ছাড়া একবার শিশুপাঠ্য মাসিক পত্রিকায় দেবপ্রসাদ লক্ষ করেন যে ফরাসি S’il vous plait-কে বিশ্বকবি লিখেছেন সি ভূ প্লে। ‘l’ অক্ষরটি যে এখানে নীরব নয়, তা দেখিয়ে দেন তিনি। এই মানুষটি এও বোধ করেছিলেন যে রবি ঠাকুর ক্ষুণ্ণ হচ্ছেন, তবুও ভুলকে ভুল বলতে তিনি পিছু হঠতেন না। তাই বারংবার ক্ষমা চেয়েছেন এবং কারণ হিসেবে বলেছেন যে, রবি ঠাকুরের ন্যায় ব্যক্তিত্ব যদি ভুল করেন তা সাধারণের জন্য নজির হয়ে যায়।
(সূত্র— এই সময় গোল্ড)।
***

১১।
রবীন্দ্রভাবনা

রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষাকে যে কতভাবে সমৃদ্ধ করেছেন তার তুলনা পাওয়া দুষ্কর। রবীন্দ্রপক্ষে তার ওপর আলোকপাত করতে শুভজিৎ পাত্রর একটি লেখার শরনাপন্ন হচ্ছি। শুভজিৎবাবু লিখেছেন, “বাংলা শব্দতত্ত্ব’ বইতে বিদেশি নতুন শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ নির্মাণ নিয়ে তাঁর গভীর ভাবনা-চিন্তার কথা জানা যায়। বইটিতে ৯১৩টি নতুন বাংলা পরিভাষা নির্মাণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ‘অবলাবান্ধব’ পত্রিকার সম্পাদক দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায় Sympathy শব্দটির বাংলা প্রতিশব্দ হিসাবে ‘সহানুভূতি’ শব্দটি নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু এই নতুন শব্দ তেমন পছন্দ ছিল না রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। তিনি এর বদলে অনুকম্পা কিংবা দরদ শব্দটি ব্যবহারের পক্ষপাতী ছিলেন। আমাদের মনে পড়ে যাবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘কে বাঁচায়, কে বাঁচে’ ছোটোগল্পে লেখক সহানুভূতি শব্দটি ব্যবহার না করে চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছিলেন ‘দরদ’ শব্দটিকেই।

এছাড়া Culture শব্দটির প্রচলিত কৃষ্টি প্রতিশব্দটি পছন্দ ছিল না রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। তাই সুনীতি চাটুজ্যের মধ্যস্থতায় তিনি শ্রুতিসুখকর সংস্কৃতি শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। আর পরবর্তীতে এই শব্দটি ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে যায়। বুদ্ধদেব বসু গড়েছিলেন লোকপ্রিয় শব্দটি Popular এর বাংলা পরিভাষা হিসাবে কিন্তু সকলেই অবগত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নির্মিত জনপ্রিয় শব্দটির ব্যবহার এই প্রসঙ্গে অনেক গুণ বেশি। আর পরিভাষা নির্মাণে তিনি যে সর্বদা সংস্কৃত ভাষার দ্বারস্থ হয়েছেন তেমনটা ভাবা ঠিক নয়,বরং কোন শব্দ বাংলায় সহজে প্রচলিত হতে পারে সেটাও তাঁর বিবেচনায় ছিল।

রিপোর্ট এর বাংলা প্রতিশব্দ প্রতিবেদন এবং রেডিও-র বাংলা পরিভাষা আকাশবাণী স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের করা।

জাতি বলতে আমরা Genus, Species, Nation, Race, Caste সবকিছুই বুঝি। যেমন নারীজাতি, পুরুষজাতি আবার বাঙালি জাতি বা তামিল জাতি। এই বিভ্রান্তি কাটাতে রবীন্দ্রনাথ Nation অর্থে অধিজাতি, National অর্থে আধিজাতিক শব্দ ব্যবহারের পক্ষপাতী ছিলেন। খোদ নেশন শব্দটিও বাংলায় ব্যবহার করতে দ্বিধা করেননি তিনি। অর্থাৎ পরিভাষা নির্মাণে কতখানি মুক্তমনা ছিলেন তিনি তা সহজেই বোঝা যায়।r ace শব্দটির বাংলা প্রতিশব্দ তিনি করেছিলেন প্রবংশ, Tribes অর্থে জাতি-সম্প্রদায়।

তাঁর করা সব প্রতিশব্দ বঙ্গজীবনে গৃহীত না হলেও আমরা ঐচ্ছিক ছাড়া কি Optional এর অন্য কোনো প্রতিশব্দ নির্মাণ করতে পেরেছি?ঐচ্ছিক,প্রতিষ্ঠান_ এই সকল শব্দও তো তাঁর-ই সৃষ্ট।“
(ঋণ— ফেসবুকের ‘অক্ষর’ শুদ্ধ বানান ও ভাষাচর্চা’ গ্রুপ)
***

১২।
আকাদেমী আকাডেমী

বিকাশপিডিয়া লিখেছে ‘বাংলা অ্যাকাডেমি’। উইকিপিডিয়া লিখেছে ‘বাংলা আকাদেমি’। দিনভর বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন বানান। মুখ্যমন্ত্রীর পুরস্কারপ্রাপ্তির পর ঝড়ের মত শব্দটা দাপিয়ে বেড়িয়েছে প্রচারমাধ্যমে। কিন্তু অ্যাকাডেমী, একাডেমী, আকাডেমী, অকাডেমী, অ্যাকাডেমি, অকাদেমী, অ্যাকাদেমী, একাদেমী, আকাদেমী—কোনটা হওয়া উচিত?

আনন্দবাজার পত্রিকা, অনলাইন আনন্দবাজার, এবিপি আনন্দ, আজকাল, সংবাদ প্রতিদিন, দৈনিক স্টেটসম্যান, গণশক্তি— এরা লিখছে আকাদেমী। বর্তমান অ্যাকাডেমি। জি ২৪-এ আকাদেমী (তবে অ্যাকাদেমি-ও পেয়েছি)। অনেকেই নিজের মত বানান ব্যাবহার করেছেন।

আনন্দবাজার পত্রিকার প্রাক্তন অ্যাসিস্টেন্ট এডিটর রথীন্দ্রমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে,“ওরা বাংলায় যা লেখে সেটাই লেখা উচিত।” আনন্দবাজার পত্রিকার প্রাক্তন উপ বার্তা সম্পাদক শম্ভু সেনের কথায়, “একটা ছড়া মনে রাখিস। আমরা যখন ডেস্কে কাজ করতাম তখন এই ছড়াটা মুখস্থ রাখতাম – সাহিত্য অকাদেমি, বাংলা আকাদেমি, আর সব অ্যাকাডেমি। সুতরাং বাংলা আকাদেমি। এটা আনন্দবাজারীয় বানান নয়, বাংলা আকাদেমির নাম। ওদের প্রকাশিত বইয়েই আছে।”

এই প্রশ্নের উত্তরে প্রাক্তন উপাচার্য ডঃ পবিত্র সরকার আমাকে জানিয়েছেন, “পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, ঢাকা বাংলা একাডেমি, দিল্লির সাহিত্য অকাদেমি।“
দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডঃ সোমা বন্দ্যোপাধ্যায় এই প্রতিবেদককে জানান, “অকাদেমি বানানটি সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় গ্রহণ করেছিলেন। আমরা তাই এটা ব্যবহার করি। বাংলা আকাদেমি ‘আ’ ব্যবহার করে। বাংলাদেশ একাডেমি লেখে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাজ হলে সমতার জন্যে আকাদেমি লেখা ভালো।”

প্রসঙ্গত, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি  পশ্চিমবঙ্গে
 প্রতিষ্ঠিত বাংলা ভাষার সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ ও ঐতিহ্য রক্ষার লক্ষ্যে ফ্রান্সের আকাদেমি
ফ্রঁসেজ-এর আদলে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের একটি অঙ্গ হিসাবে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে এটি একটি স্বশাসিত সংস্থার মর্যাদা পায়।
***
১৩।
#চ্যাংদোলা_চ্যাং_কেন?

সুকুমার রায় লিখেছেন, “হ্যাংলা হাতি চ্যাংদোলা
শূন্যে তাদের ঠ্যাংতোলা।” বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, দেশি চ্যাংদোলা অর্থ (বিশেষ্যে)— দুই হাত ও দুই পা ধরে দেহ ঝুলিয়ে বহন; কারো দুই পা এবং দুই হাত ধরে চ্যাঙের মতো বহন করে নিয়ে যাওয়া। সংসদ বাংলা অভিধান লিখছে চ্যাং হল চেঙ্গ-এর বানানভেদ। চেঙ, চেং কথার অর্থ শববহনের খাটুলি বা বাঁশের মাচা। আর চ্যাংদোলা হল শবের ন্যায় বহন।

ফেসবুকে ভাষা চর্চার গ্রুপে ইউসুফ খান (কলকাতা) লিখেছেন, “মুণ্ডারী ভাষায় চাঙ্গা কথাটার মূল মানে – পা দুটোকে দুদিকে ছড়িয়ে V এর মতো করা। সেখান থেকে দুফাঁক দুভাগ হওয়া মানেতে চাঙ্গা কথাটা কত ভাবে যে সাঁওতালি আর বাংলা ভাষায় আছে!বাংলায় কথাটা চাঙ্গা চ্যাঙ চ্যাং হয়ে আছে।

#চ্যাংড়া
গাছের ডালের Y এর মতো দুভাগে বেরনো ফ্যাঁকড়াকে সাঁওতালিতে বলে চাঙ্গাচাঙ্গি। গাছের ডালের ফ্যাঁকড়া বেরোচ্ছে মানে চাঙ্গা বেরোচ্ছে, তার মানে গাছ চাঙ্গা আছে বেঁচে আছে। এই চাঙ্গা-ই বাংলাতে চাঙ্গা হয়ে আছে, যার মানে প্রাণবন্ত লাইভ অ্যাণ্ড কিকিং। যেসব ছেলে ছোকরারা বেশি চাঙ্গা বেশি বেশি লাইভ অ্যাণ্ড কিকিং তাদেরকে বলে চ্যাংড়া ছেলে। এদের রোজ রোজ নতুন নতুন হাত-পা গজায়!

#চ্যাংমাছ
যে মাছ অকারণে বেশি বেশি লাফায় সে বেশি চাঙ্গা মাছ তাই সেটা চেঙ্গ চ্যাং মাছ। লাফানোতে চ্যাংমাছের বিশেষ নাম আছে। চ্যাং মাছ লাফাতে লাফাতে এক পুকুর থেকে রাস্তা পার হয়ে অন্য পুকুরে চলে যায়। তাই বাংলা ইডিআম আছে – দু গোড়ের চ্যাং, মানে তলে তলে দুপক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ রেখে চলা কুট লোক। কেউ বেশি টগবগ করে ফুটলে আমরা বলি – ‘চ্যাং মাছের মতো লাফাচ্ছিস কেন?’

#চিংড়ি
খেজুর বাবলা প্রভৃতি গাছের ডাল থেকে ছিরকুটে বেরোনো কাঁটাকে সাঁওতালিতে বলে চাঙ্গা। চিংড়ি মাছের গোঁফ দাঁড়া ঠ্যাং এরকম কাঁটার মতো দুদিকে বেরিয়ে থাকে। হয়তো সে কারণেই জলের পোকাটাকে বুড়ীরা বলতো চেঙ্গুড়ী। চিংড়ি মাছকে আগেকার দিনের বুড়িরা বলতো চেঙ্গুড়ী চেঙুড়ী চিঙুড়ি। মাছ কথাটা যোগ করতো না।“
প্রাক্তন উপাচার্য তথা বাংলার অভিজ্ঞ অধ্যাপক অচিন্ত্য বিশ্বাস এই প্রতিবেদককে জানান, “চ্যাং মুড়ি বা চ্যাং মড়ি কেন? চ্যাংমাছের মতো মুড়ি ( মুণ্ড > ) তাই কানী, চ্যাংমাছকে ‘দেড়কানা’ বলা হয়।

মড়ি = মড়া, চ্যাং দোলা করা মৃতদেহ। চণ্ডালদের মনুসংহিতা-য় ‘চলমান শব’ বলা হয়েছে।
কানী হল পুরোন কাপড়। চ্যাংমুড়ি কানী মৃতের পরিত্যক্ত বসন হতে পারে। সেই বসন যে পরে তেমনি ভাব। চ্যাংমুড়ু তেলুগুতে সিজ মনসার গাছ। বিপ্রদাসের মনসামঙ্গলে আছে।“
***

১৪।
প্রাতরাশ, প্রাতর্ভ্রমণ

মর্নিং ওয়াক হয়েছে? ব্রেকফাস্ট করেছেন?
এরকম বলতে বলতে, লিখতে লিখতে নতুন প্রজন্মের কাছে বড্ড ঝাপসা হয়ে গিয়েছে বাংলা প্রতিশব্দগুলো। প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। প্রবীনরা ভুলে না গেলেও অনেকে হোঁচট খান এর বানান নিয়ে।

আমার প্রশ্নের উত্তরে আনন্দবাজার পত্রিকার প্রাক্তন উপ বার্তা সম্পাদক শম্ভু সেন জানিয়েছেন, “প্রাতঃরাশ নয়, প্রাতরাশ। আর প্রাতভ্রমণ, প্রাতঃভ্রমণ – দু’টোই ভুল, কোনোটাই হয় না। সঠিক হল প্রাতর্ভ্রমণ। এ বার ব্যাখ্যা করি।

বিসর্গ দু’ প্রকার – (১) র-কার জাত, যেমন অন্তঃ, প্রাতঃ, পুনঃ, নিঃ, দুঃ, স্বঃ প্রভৃতি। (২) স-কার জাত, যেমন তপঃ, মনঃ, পয়ঃ, শিরঃ, মেদঃ, বয়ঃ, বখঃ, সদ্যঃ, স্রতঃ ইত্যাদি।
তা হলে দেখতে পাচ্ছি প্রাতঃ হল র-কার জাত বিসর্গ।
র-কার জাত বিসর্গের সন্ধির নিয়ম –
যদি স্বরবর্ণ, বর্গের তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম বর্ণ অথবা য, র, ল, ব, হ পরে থাকে তা হলে র-কার জাত বিসর্গের স্থানে র-কার হয়। যেমন, প্রাতঃ + ভ্রমণ = প্রাতর্ভ্রমণ (বিসর্গের পরে আছে ‘ভ’, বর্গের চতুর্থ বর্ণ); প্রাতঃ + আশ = প্রাতরাশ (বিসর্গের পরে আছে ‘আ’, স্বরবর্ণ)।

একটা অন্য উদাহরণ দিই। শব্দটা হল পুনরুদ্ধার, সন্ধিটা কী? পুনঃ + উদ্ধার। এখানে পুনঃ র-কার জাত বিসর্গ আর উদ্ধার-এর ‘উ’ স্বরবর্ণ। তাই সন্ধি হলে বিসর্গের স্থানে র-কার হল।

এই নিয়ম প্রাতঃকৃত্য, প্রাতঃকাল ইত্যাদির ক্ষেত্রে খাটে না। প্রাতঃ + কাল = প্রাতঃকাল; প্রাতঃ + কৃত্য = প্রাতঃকৃত্য। এখানে দেখুন বিসর্গের পরে আছে ‘ক’। ‘ক’ স্বরবর্ণ নয়, বর্গের তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম বর্ণও নয়, য, র, ল, ব, হ-ও নয়। তাই সন্ধির পরে বিসর্গ বিসর্গই থাকল, র-কার হল না। আশা করি বোঝাতে পারলাম।“
***
১৫।
সস্তার তিন অবস্থা

ডঃ মহম্মদ আমিন ‘বাংলা ভাষার মজা’ গ্রন্থে লিখেছেন, ”সস্তার তিন অবস্থা – এই তিন অবস্থা কী?
এই তিন অবস্থা হচ্ছে প্রথম ‘আ’ হচ্ছে আনন্দ, দ্বিতীয় ‘আ’ হচ্ছে আহাম্মকি এবং তৃতীয় ‘আ’ হচ্ছে আফসোস। এবার তিন অবস্থার ব্যাখ্যা দিচ্ছি।

মাহমুদ সাহেব বাজারে গেলেন ইলিশ কিনতে। দাম বেশি বলে না-কিনে ফেরত আসছেন। কিছুদূর আসার পর দেখলেন পথে এক লোক ইলিশ বিক্রি করছেন। তার কাছ থেকে মাঝারি সাইজের এক হালি(চারটি) ইলিশ দুই হাজার টাকা দিয়ে কিনে নিলেন। বাজারে এ সাইজের ইলিশ কিনতে লাগত কমপক্ষে তিন হাজার ছশ টাকা। চোখের পলকে ষোলশ টাকা লাভ। আনন্দে মাহমুদ সাহেবের মন ফুরফুরে হয়ে গেল। এটি সস্তার প্রথম অবস্থা।

সস্তা না পেলে মাহমুদ সাহেব একটা ইলিশই কিনতেন। তখন খরচ হতো মাত্র নয়শ টাকা। কিন্তু সস্তা বলে আনন্দের আতিশয্যে আহাম্মকি করে দুই হাজার টাকায় চারটা কিনে নিলেন। এটি আহাম্মকি।

ইলিশ হাতে আনন্দিত মনে কয়েক পা এগোনোর পর মনে পড়ে গেল ছোটো শালীর কথা। মাছওয়ালার কাছ থেকে আরো দুটো ইলিশ কিনে শালীর বাসায় পাঠিয়ে দিলেন। এটিও আহাম্মকি। এরূপ আহাম্মকিকে আতিশয্যিক আহম্মকিও বলা যায়। এটি সস্তার দ্বিতীয় অবস্থা।

বাসায় ঢুকে বউয়ের হাতে মাছের থলে তুলে দিয়ে আনন্দচিত্তে বাথ রুমে ঢুকলেন মাহমুদ সাহেবে। কাজ শেষ হওয়ার আগেই বাথ রুমের দরজায় আঘাত। অসমাপ্ত অবস্থায় বের হয়ে দেখলেন, বউয়ের এক হাতে ইলিশের থলে অন্য হাতে বটি। বাসা দুর্গন্ধে ভরে গেছে। কিছু বলার আগে বউ ইলিশের থলেটা মাহমুদ সাহেবের দিকে ছুড়ে দিয়ে বললেন, পচা মাছগুলো পুরো বাসাকে গন্ধময় করে দিয়েছে। এক্ষুনি ফেরত দিয়ে এস। নইলে তোমাকে এই বটি দিয়ে মাছে মতো – – -।

মাহমুদ সাহেব আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য বললেন, ইলিশ পচা হলেও খাওয়া যায়।
বউ বললেন, আরে আহম্মক, এগুলো ইলিশ মাছ নয়, চৌক্কা।

তখনই রিং করলেন মাহমুদ সাহেবের শালী, দুলাভাই আপনার মাছের গন্ধে বাসায় থাকা যাচ্ছে না। আমার স্বামী বমি করে দিয়েছে। এমন অপমানটা না-করলেই কী হতো না?“
***

১৬
কর/বল/লেখ

ফেসবুকে অক্ষর শুদ্ধ বানা ও ভাষাচর্চা গ্রুপে ‘#বানানের_টিপস্’ দিতে গিয়ে স্বপন ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, “ক্রিয়াপদের ক্ষেত্রে বোধ হয় আমাদের সংশয় তুলনামূলকভাবে বেশি। ক্রিয়াপদের শেষে ও-কার দেওয়া সংগত কি না? বিশেষত যেখানে আমরা ক্রিয়াপদের শেষে ও উচ্চারণ করে থাকি।

এ বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির নির্দেশ /সুপারিশশুলো কী সেদিকে একটু নজর দেওয়া যাক।

নিত্যবর্তমানকালের ক্রিয়ার শেষে আমরা কখনো ও-কার ব্যবহার করব না। যেমন: ‘তুমি কী কর?’, ‘তুমি কোন ক্লাসে পড়?’ ইত্যাদি। আবার বর্তমান অনুজ্ঞায় তা হবে ও-কারান্ত। যেমন: ‘তুমি এখন এই কাজটা করো।’ ‘তুমি এই ব‌ইটা পড়ো।’

তুচ্ছার্থক বর্তমান অনুজ্ঞার বিষয়ে তাদের সুপারিশ এই সব জায়গায় ক্রিয়াপদের শেষে হসন্ত ব্যবহার করতে হবে। যেমন: ‘তুই কর্’, ‘তুই পড়্’ ইত্যাদি। যদিও সাধারণভাবে আমরা এই ধরনের শব্দে হসন্ত দিই না এবং হসন্ত না দিলেও তা পড়তে আমাদের কোনও অসুবিধা হয় না।

ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞায় শেষে ও-কার তো লাগবেই, প্রয়োজনে একাধিক ও-কার লাগাতে হবে। যেমন: ‘তুমি সময়মতো এই কাজটা কোরো’, ‘তুমি পরে এই লেখাটা পোড়ো’।

তবে অতীত ও ভবিষ্যৎ কালে ক্রিয়াপদের শেষে আমরা ও-কার কখন‌ই ব্যবহার করব না। যেমন: করল, বলল, পড়ল, করত, বলত, পড়ত ইত্যাদি। আবার করেছিল, বলেছিল বা পড়েছিল। অথবা করব, বলব, বা পড়ব ইত্যাদি।

অনেকে বলেন যে ‘হল’ বা ‘হত’ এই শব্দগুলো ‘হলো’, ‘হতো’ এভাবেই লেখা দরকার তা না হলে হল (hall), বা হত (মৃত) শব্দের সঙ্গে গুলিয়ে যেতে পারে। কিন্তু এই মতের পিছনে কোনো যুক্তি আছে বলে মনে হয় না। কারণ বাংলায় এই ধরনের অজস্র শব্দ আছে যেগুলো বানান আর উচ্চারণ এক হলেও আলাদা অর্থ বোঝায়। পুরো বাক্য পড়ে এবং প্রেক্ষিত বুঝেই আমরা শব্দের অর্থ নির্ণয় করি। তাই প্রশ্ন যে কত শব্দের এই রকম বানান পরিবর্তন করা হবে।
অবশ্য বাংলা আকাদেমিও ‘হল’, ‘হত’ এভাবেই লেখার পরামর্শ দিয়েছে।“

প্রাক্তন উপাচার্য ডঃ পবিত্র সরকার সায় দিয়েছেন এই বিশ্লেষণে।
***

১৭।
মে মাহাত্ম্য

বানান-ব্যাকরণ-প্রবাদের ঘেরাটোপ থেকে আজ একটু বাইরে উঁকি মারি! অজস্র বাংলা বিদেশি শব্দ নিয়মিত ব্যবহার করি আমরা। পরে প্রসঙ্গক্রমে আবার আসব বাংলায় বিদেশি ভাষা নিয়ে। বিদেশি হয়েও রীতিমত স্বদেশি হয়ে উঠেছে ইংরেজি মাসের নামগুলো। মে কথাটা এসেছে গ্রীক উর্বরতার দেবী মাইয়া থেকে। রোমানদের অনুরূপ দেবী ছিল বোনা দে। তারা মে মাসে বোনা দে-এর জন্য উৎসব পালন করে।

রোমানরা মে মাসকে মাইউস বলত। বছরের পর বছর নাম পাল্টেছে। মধ্যযুগের শেষের দিকে ১৪০০ এর দশকে এটিকে প্রথম মে বলা হয়েছিল। অন্যান্য ভাষায় মে চীনা (ম্যান্ডারিন) – wuyuè, ডেনিশ – maj, ফরাসি – mai (মাই), ইতালীয় -maggio (ম্যাজিও), ল্যাটিন – Maius (মাইউস), স্প্যানিশ – mayo (মায়ো)।

একসময় মে মাসকে বিয়ে করার জন্য দুর্ভাগ্যের মাস হিসেবে গণ্য করা হতো। একটি কবিতায় বলা হয়েছে “Marry in May and you’ll rue the day”। পুরানো ইংরেজিতে মেকে “month of three milkings” বলা হয়। ইন্ডিয়ানাপলিসে প্রতি বছর এই মাসে ৫০০ গাড়ির দৌড় অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত ঘোড়দৌড় কেনটাকি ডার্বিও এই মাসের দ্বিতীয় শনিবার অনুষ্ঠিত হয়। মে মাসটি ক্যাথলিক চার্চে ভার্জিন মেরিকে উৎসর্গ করা হয়। যুক্তরাজ্য মে মাসকে জাতীয় হাসির মাস হিসেবে পালন করে। মে মাসের শেষ সপ্তাহ লাইব্রেরি ও তথ্য সপ্তাহ।
***

১৮।
উচ্চারণ বদলে যায়

“সেই ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দেই রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘প্রকৃত বাংলা ব্যাকরণ একখানিও প্রকাশিত হয় নাই। সংস্কৃত ব্যাকরণের একটু ইতস্তত করিয়া তাহাকে বাংলা ব্যাকরণ নাম দেওয়া হয়। বাংলা ব্যাকরণের অভাব আছে, ইহা পূরণ করিবার জন্য ভাষাতত্ত্বানুরাগী লোকের যথাসাধ্য চেষ্টা করা উচিত।’

আসলে বাংলা ভাষাকে যথাযথরূপে বিশ্লেষণ করে আজ অবধি কোনো ব্যাকরণ বই লেখা হয়নি। যা আছে তা, হয় সংস্কৃত ব্যাকরণের ছায়ানুসারী, নয়তো ইংরেজি ব্যাকরণের ভাবানুবাদ। জয়া ফারহানা বলেছেন, ‘প্রমিত বাংলা মুদ্রণের জন্য বর্ণমালা ও বানানের যে প্রমিতকরণ দরকার ছিল সেটা হয়নি। বানানে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে প্রতিদিনই নতুন করে তৈরি হচ্ছে বিশৃঙ্খলা।’ ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে রবীন্দ্রনাথই প্রথম বাঙালি ব্যক্তিত্ব যিনি বাংলা ভাষা সমস্যার বিষয়টি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করেছেন।

প্রশ্ন হচ্ছে, প্রমিত ভাষা কী। বাংলা একাডেমি তার প্রমিত বাংলা ব্যবহারিক ব্যাকরণে প্রমিত ভাষার যে সংজ্ঞা দিয়েছে তা হচ্ছে, ‘… অধিকাংশ বক্তা বলে বা শোনে এমন একটি মুখের ভাষাও আছে, যা স্থানবিশেষে আবদ্ধ নয় এবং সমাজের শ্রেণি বা গোষ্ঠীতেও আবদ্ধ নয়। তারই নাম প্রমিত ভাষা’ (পৃ. ৩)। ভাষার উচ্চারণ কিছু দূর পর-পর বদলে যায়। ভাষাবিদরা গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে, প্রতি ১৩ মাইলে উচ্চারণ বদলে যায়। আর ম্যাক্সমুলারের মতে প্রতি পাঁচ মাইল অন্তর ভাষা বদলে যায়। পাশে অন্য ভাষা থাকলে তার ব্যাপক প্রভাবও পড়ে। ফলে একই ভাষার অন্তর্গত হলেও এক অঞ্চলের মানুষের কথা অন্য অঞ্চলের মানুষের পক্ষে অনেক সময় বুঝে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে। আমরা যেমন সিলেট বা চট্টগ্রামের লোকের কথা বুঝতে সমস্যায় পড়ে যাই। অনেক ক্ষেত্রে মোটেই বুঝতে পারি না।

এ কারণে প্রমথ চৌধুরী বলেছিলেন, ‘বাংলা ভাষা আহত হয়েছে সিলেটে, আর নিহত হয়েছে চট্টগ্রামে।’ ফলে আছে একটি প্রমিত ভাষা—যা ভিন্ন-ভিন্ন অঞ্চলের লোক একসঙ্গে হলে ব্যবহার করে। পড়াশুনা লেখালেখিও সাধারণত প্রমিত ভাষাতেই হয়ে থাকে—যদিও প্রমিত বাংলা বেশির ভাগ মানুষের মুখের ভাষা নয়। ভাষা শহীদরা এই প্রমিত বাংলার জন্যই রক্ত দিয়েছে। কোনো বিশেষ অঞ্চলের বাংলাকে তারা বোঝেননি। সাধু ভাষাকে যখন পিছনে ফেলে চলিত ভাষায় লেখালেখি শুরু হল, তখনই প্রমিত ভাষা সামনে চলে আসল। সাধু ভাষা একটি কৃত্রিম গদ্যভাষা—যা কখনই মুখে বলা হয়নি।

বাংলা একাডেমির ব্যাকরণ ও অভিধানেই তো বলা হলো—এই প্রমিত উচ্চারণে ই ঈ এবং তার কার, উ ঊ এবং তার কার, ঙ ং, জ য, ণ ন, ত ৎ, শ ষ স এর ধ্বনি অভিন্ন। ঞ এর উচ্চারণ প্রতিবেশ অনুসারে কখনো ন, কখনো ঙ, কখনো অনুনাসিক স্বরধ্বনি হয়ে শেষপর্যন্ত য় হয়। ব-ফলা, ম-ফলা, য-ফলা দ্বিত্ব বর্ণ হিসেবে ব্যবহার হয়। এটাও বলা হলে, বাংলা ভাষার উচ্চারণ পদ্ধতির বৈশিষ্ট্যই হলো হ্রস্ব মাত্রার উচ্চারণ। ব্যাকরণ বইতে এটাও স্বীকার করা হলো যে, উৎস ভাষা থেকে আসা শব্দের উচ্চারণ অব্যাহত থাকে না; তৎসম (অর্থাৎ সংস্কৃতের সমান) বলা হয় নিছকই লেখায় সমরূপের জন্য—বাস্তবে উচ্চারণে এই সমতা নেই বললেই হয়। এটাও বলা হয়েছে যে, অন্য ভাষা থেকে গৃহীত হলে তা সেই ভাষারই শব্দ হয়ে যায়, তা ফেরত দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। ফেরত না দেওয়ার কথাটি পবিত্র সরকারের। এতে স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, যদি সংজ্ঞা অনুসারে প্রমিত বাংলার ব্যাকরণ ও অভিধান তৈরি করতে হয়, তাহলে যা বলি-না বা শুনি-না তা নিয়ে কেন তথাকথিত প্রমিত ব্যাকরণ রচনা করা হলে, কেন তাতে সংস্কৃত বানানের নিয়ম-কানুন ঢুকিয়ে দেওয়া হলো, কেন প্রমিত অনুযায়ী ব্যাকরণ অভিধান তৈরি করা হল না, কেন সংস্কৃত অনুসরণ করে ব্যাকরণ অভিধান তৈরি করে তাকে প্রমিত নাম দিয়ে বাংলা একাডেমি ধোঁকা দিল? একাডেমির অভিধানেই তো স্বীকার করা হয়েছে যে, অভিধানে বানান বা লিপি সংস্কার করা হয়নি, কেবল বানানকে অভিন্ন ও প্রমিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রমিত ভাষা অনুযায়ী বানান না করা হলে তা আবার প্রমিত হয় কীভাবে?

বলা হয়ে থাকে, বাংলা ভাষার উচ্চারণ বর্ণভিত্তিক। সে কারণে বাংলার উচ্চারণে কোনো গোলযোগ নেই। আর তাই বর্ণের সংখ্যা বেশি। একথা সত্য যে, ইংরেজি বা অনেক ভাষার চেয়ে বাংলার উচ্চারণ অনেক বেশি বর্ণভিত্তিক, গড়মিল কম। তাই বলে কি সম্পূর্ণ বর্ণভিত্তিক। আসলে কোনো ভাষার উচ্চারণই সম্পূর্ণ বর্ণভিত্তিক নয়। রবীন্দ্রনাথ এটা লক্ষ করে এ নিয়ে বেশ কিছু আলোচনা করেছেন। বাংলা একাডেমির ব্যাকরণ বইতেও এ নিয়ে অনেক কথা বলা হয়েছে। এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা না করে কয়েকটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি মোটামুটি বুঝা যাবে। যেমন জল, কল, বল, অভাব, কপাল, হর ইত্যাদি শব্দের উচ্চারণ সম্পূর্ণ বর্ণভিত্তিক। একে বলা হয় বিবৃত স্বর। কিন্তু যখন লিখি অতি, তা পড়ি ওতি; লিখি কলু পড়ি কোলু; লিখি মন/মণ পড়ি মোন; এভাবে বন হয় বোন, জন হয় জোন, এক হয় এ্যাক, বড় হয় বড়ো, অনুজ হয় ওনুজ, গদ্য হয় গোদ্দো, সভ্য হয় শোবভো, জন্য হয় জোন্নো, তত হয় ততো, অতুল হয় ওতুল, অসুর হয় ওসুর, গর্দভ হয় গর্ধোব, সহ্য হয় সোজঝো, পবন হয় পবোন, ব্যয় হয় ব্যায় ইত্যাদি। একে বলা হয় সংবৃত স্বর। এ রকম হাজারো উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। বাংলা একাডেমির বানান-অভিধানে যদিও শব্দ সংখ্যা কত আছে বলা নেই, তবে আমার মনে হয় কমবেশি ৬৫ হাজার হবে। এ অভিধানে শব্দ ও তার উচ্চারণ দেওয়া আছে। তাতে দেখা যায়, প্রায় প্রত্যেকটি শব্দের উচ্চারণ লেখা থেকে ভিন্ন।

এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, অনেক ক্ষেত্রেই অ যদিও ও-এর মতো উচ্চারিত হয়, অন্যান্য বর্ণের উচ্চারণেরও পরিবর্তন হয়, তবে এই পরিবর্তনের মাত্রা সর্বত্র একই রকম নয়। কোনো জায়গায় বেশি মাত্রায়, কোনো জায়গায় কম মাত্রায় অ হয় ও। অন্যান্য বর্ণের পরিবর্তনেও একই কথা খাটে। সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে বাংলায় স্বরবর্ণের দীর্ঘ উচ্চারণ স্বয়ংসিদ্ধ এবং স্বতন্ত্র নয়। বাক্যের মধ্যে শব্দের অবস্থান প্রভৃতির উপর স্বরধ্বনির দৈর্ঘ্য নির্ভর করে। কাজী সিরাজ সঠিকভাবেই বলেছেন, ভাষা তার আপন গতিতেই ধ্বনির হ্রস্বতা কিংবা দীর্ঘতা সৃষ্টি করে থাকে। একথা শুধু ধ্বনির ক্ষেত্রেই নয়, শব্দের অর্থের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। বাংলা একাডেমির ব্যাকরণে বলা হয়েছে, ‘শব্দের কোন্ অর্থ কোথায় তৈরি হবে, তা পুরো বাক্যটির উপর নির্ভর করে। বাক্যে ব্যবহৃত না হলে শব্দের অর্থ একটি বায়বীয় ধারণা মাত্র, বাক্যে ব্যবহার হলেই তার অর্থের সমস্ত সম্ভাবনার মধ্য থেকে একটি বা দুটি (দ্ব্যর্থকতার ক্ষেত্রে) অর্থ স্পষ্ট হয়।’ উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, এখন আমার হাত খালি—এই বাক্যটির মধ্যে ‘হাত খালি’র আক্ষরিক অর্থটা প্রধান নয় (প্রমিত বাংলা ব্যবহারিক ব্যাকরণ পৃ. ৩০৭)। আবার দেখুন বিভিন্ন বাক্য কীভাবে ‘চাল’ শব্দটির বিভিন্ন অর্থ নির্ধারণ করে। ঘরে চাল বাড়ন্ত, খাবে কী?; ফুটো চাল দিয়ে বৃষ্টির জল পড়ে; তার চাল-চলন মোটেই ভালো নয়; চাল-চুলার ঠিক নেই, তোমাকে মেয়ে দেবে কে?; সে কুট-চাল দিতে পারদর্শী; দাবা খেলায় শেষে সে ঘোড়ার চাল দিল তাতেই কিস্তি মাত হলো। এভাবে ‘চাল’ শব্দটি বিভিন্ন বাক্যে বিভিন্ন অর্থ-প্রকাশ করল। দেখুন ‘মাথা’ শব্দটি কতভাবে ব্যবহৃত হতে পারে। অঙ্কে তার মাথা নেই, সে মাথামোটা মানুষ, মেয়েটির মাথায় একরাশ চুল, তোমার কথার আগামাথা কিছু বুঝলাম না, আমার মাথায় অনেক বোঝা, এই রাস্তার মাথায় তার বাড়ি, এটা না করলে আমার মাথা খাও, রহিম মাতবর গ্রামের মাথা, সে মাথায় কিছু রাখতে পারে না, ট্রেন ছাড়ার মাথায় সে স্টেশনে পৌঁছল, সে সুটকেসটা মাথায় বয়ে আনলো ইত্যাদি। আবার যদি বলা হয় ‘আপনি এই কাজটি করুন।’ অথবা ‘সে এক করুণ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে’। এখানে দুই ক্ষেত্রে করুন শব্দটি দুই অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই করুন বানানে ণ বা ন ব্যবহার করা হয়েছে তা মুখ্য নয়। বাক্যই তার অর্থ ঠিক করে দিয়েছে। এভাবেই শব্দের ভিন্নার্থক প্রয়োগ হয়ে থাকে।

যাহোক, উল্লিখিত আলোচনা হতে একথা পরিষ্কার যে, আমাদের উচ্চারণ সম্পূর্ণ বর্ণভিত্তিক নয়। কাজেই বর্ণভিত্তিক উচ্চারণের জন্য বর্ণসংখ্যা বেশি করা হয়েছে তা সত্য নয়। আসলে বর্ণবাদী মানসে সংস্কৃতকে সেবা করতেই তা করা হয়েছে।“

সূত্র— ফেসবুকে ‘অক্ষর শুদ্ধ বানান ও ভাষাচর্চা’ গ্রুপে গরিব নেওয়াজের লেখা।
***

১৯।
সঙ্গীত, সংগীত/ অঙ্ক, অংক

ফেসবুকে শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)তে ‘#একটিশব্দহলেওহোকনির্ভুল’ শিরোনামে একটি পোস্ট। সঙ্গীত, সংগীত এমন আরও কয়েকটি শব্দ: অহংকার (অহম্+কার), সংখ্যা (সম্+খ্যা), সংগত (সম্+গত)।

ব্যাখ্যা: আধুনিক বাংলায় ম্-র পর কণ্ঠ্য-বর্গীয় ধ্বনি থাকলে ‘ম্’ স্থানে প্রায়ই ‘ঙ’ না হয়ে অনুস্বার (ং) হয়। সূত্র: বাংলা ভাষার ব্যাকরণ, নবম-দশম শ্রেণি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, বাংলাদেশ। পৃষ্ঠা-৪১।

প্রাক্তন উপাচার্য তথা বাংলার প্রাক্তন অধ্যাপক ডঃ অচিন্ত্য বিশ্বাস অবশ্য এই মতের বিরোধী। তাঁর মতে, সঙ্গীত, অঙ্ক-ই ঠিক। ব্যাংক হতে পারে, বিদেশী শব্দ। বর্গের আনুনাসিক্য ধ্বনি (পঞ্চম অর্থাৎ ঙ ঞ ণ ন ম) হবে যুক্ত-ব্যঞ্জন হলে। যেমন, কঙ্ক, চঞ্চু, গণ্ড, বন্ধ, বিম্ব। কণ্ঠ্য বর্ণে অনুস্বার আনাটা হিন্দীর প্রভাব। কখগঘ-এর সঙ্গে ঙ না থাকলে কী লাভ? লঙ্কা, পাঙ্খি, সঙ্গ, লঙ্ঘন না লিখলে বাংলা ভাষার উচ্চারণ বৈশিষ্ট্য অস্বীকৃত হয়। অঙ্ক লেখাই উচিত।

বদলের তো উদ্দেশ্য থাকবে। কৃষ্ণ না লিখে কৃষণ (ষ-এ অনুস্বার দিলে) লিখলে ভাবী- প্রজন্ম কি বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কৃষ্ণচরিত্র’ পড়বে না! এই ঐতিহ্য বিচ্যুতির ফল তো ভয়ঙ্কর!
***

২০।
এত/এতো, তত/ততো, যত/যতো, কত/কতো

অক্ষর শুদ্ধ বানান ও ভাষাচর্চা গ্রুপে ‘বানানের টিপস্’-এ স্বপন ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, “কোনও কোনও শব্দের শেষে ও-কার দেওয়ার প্রস্তাব করেছে বাংলা আকাদেমি। সেগুলো হল: বড়ো, খাটো, ছোটো, কালো, ভালো, মতো। এছাড়াও এগারো, বারো, তেরো, চোদ্দো, পনেরো, ষোলো, সতেরো, আঠারো এই শব্দগুলোর শেষেও ও-কার দেওয়া বাঞ্ছনীয়।

কিন্তু, এত, তত, যত, কত ইত্যাদি শব্দে ও-কার আমরা দেব না। এটা ‘কোন’ [কোন্] জায়গা? এই বাক্যে ‘কোন’ শব্দটা প্রশ্নবাচক সর্বনাম। আবার ‘তোমার যাবার ‘কোনও’ (কোনো) দরকার আছে কি? এখানে ‘কোনও’ শব্দটা অনিশ্চয়সূচক সর্বনাম। এই শব্দের শেষে আমরা ও ব্যবহার করব। তবে এক্ষেত্রে ও বর্ণ না লিখে ও-কার দেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ ‘কোনও বা ‘কোন‌ো’ দুটোই লেখা চলে। আর তাই ‘আরো’/আর‌ও, ‘কারো’/ ‘কার‌ও’, ‘কখনো’/ ‘কখন‌ও’, ‘আরোই’/’আর‌ওই’ এভাবেও লেখা চলবে।

আর একটা কথা ইংরেজি Too বোঝাতে হলে কিন্তু ও-কার দিলে চলবে না। অর্থাৎ ‘আজো’, ‘আমারো’ ‘রামেরো’ এগুলো না লিখে ‘আজ‌ও’, ‘আমার‌ও, ‘রামের‌ও’ এভাবেই লিখতে হবে।

অত‌এব অনিশ্চয়সূচক সর্বনাম এবং ইংরেজি ‘too’ উভয় ক্ষেত্রেই ও-কারের বদলে ‘ও’ ব্যবহার করলে কোন‌ও ভুলের সম্ভাবনা থাকে না। তবে মনে রাখতে হবে যে ও যখন সাধারণ সর্বনাম অথবা এবং-এর পরিবর্তে ব্যবহার করা হচ্ছে তখন কিন্তু তা আলাদা করেই লিখতে হবে। যেমন, ‘আমি আর ও কাল সেখানে যাব’, ‘রাম ও রহিম কাল সেখানে যাবে’।

‘লো’ প্রত্যয়যুক্তশব্দের ‘লো’ ও-কার দিয়েই লিখতে হবে। যেমন: জোরালো, ঘোরালো, টিকোলো, প্যাঁচালো ইত্যাদি।

‘তো’, ‘হয়তো’, ‘নয়তো’ এগুলোও ও-কার দিয়েই লিখতে হবে।
***

২১।
চন্দ্রবিন্দু

“শুধু বিঘে দুই ছিল মোর ভুঁই’’— ছোটবেলায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুই বিঘা জমি’ পড়েনি, এমন বাঙালির সংখ্যা কম। চারপাশে ভুঁইফোরের ছড়াছড়ি। অনেকে রেস্তোরাঁয় খেতে যান। রেনেসাঁস আন্দোলনের চর্চা করেন। কিন্তু অনভ্যাসের জন্য গন্ডগোল করে ফেলেন শব্দে চন্দ্রবিন্দুর অবস্থান নিয়ে। রেস্তোরাঁ হয়ে যায় রেস্তোঁরা। ভুঁইফোর হয়ে যায় ভুইফোঁর।

অক্ষর শুদ্ধ বানান ও ভাষাচর্চা গ্রুপে সম্পাদক/অ্যাডমিন ঝলক দাস জানিয়েছেন, “মৌলিক শব্দে সর্বদা চন্দ্রবিন্দুর অবস্থান প্রথম বর্ণে। কারণ, ধ্বনি পরিবর্তনের সময় শব্দে অনুনাসিক ধ্বনি থাকলে তা সাধারণত প্রথম বর্ণে সঞ্চালিত হয়। যেমন :
বাম > বাঁও, ভূমি > ভুঁই, অন্ত্র > আঁত, পঙ্ক > পাঁক।

বিদেশি শব্দের অন্ত্যবর্ণে কদাচিৎ চন্দ্রবিন্দু দেখা যায়। যেমন : জাহাঁপনা, রেস্তোরাঁ, রেনেসাঁস, জাহাঁবাজ। কয়েকটি সংখ্যাবাচক শব্দের বানানে চন্দ্রবিন্দুর ব্যবহার আছে। যেমন : পাঁচ, পঁচিশ, পঁয়ত্রিশ, সাঁইত্রিশ, পঁয়তাল্লিশ, পঁয়ষট্টি, পঁচাত্তর, পঁচাশি, পঁচানব্বই।“

চন্দ্রবিন্দু বিলুপ্তির কারণে শব্দার্থের অনিবার্য পরিবর্তনের ওপরেও আলোকপাত করেছেন তিনি। তাঁর কথায়, “গ’-বর্ণে নিম্নে দেখানো হলো—
গাঁ (গ্রাম); গা (শরীর)
গাঁই (ব্রাহ্মণদের শ্রেণিবিভাগ); গাই (গাভি)
গাঁজন (পচন); গাজন (গম্ভীরা)
গাঁতা (দলবদ্ধভাবে কাজ); গাতা (গায়ক)
গাঁথা (গ্রন্থন করা); গাথা (কাব্য)
গাঁদা (ফুলবিশেষ); গাদা (স্তুপ)
গুঁড়া (চূর্ণ, রেণু); গুড়া (নৌকার আড়কাঠ)
গুঁড়ি (কাণ্ড); গুড়ি (নিঃশব্দে গুটিসুটি হয়ে থাকা)
গুঁড়িগুঁড়ি (বিন্দুবিন্দু); গুড়িগুড়ি (ধীরগতিতে)
গেঁট (অনড়, আঁটোসাঁটো); গেট (ফটক)
গেঁয়ো (গ্রাম্য); গেয় (গাওয়ার উপযুক্ত)
গোঁ (জিদ, একরোখামি); গো (গোরু)
গোঁড় (নাভির স্ফীত মাংসপিণ্ড); গোড় (গোড়ালি)
গোঁড়া (অন্ধবিশ্বাসী; গোড়া (মূল)
গোঁপ (গুম্ফ, গোঁফ); গোপ (গো-রক্ষক)।

বাংলা ব্যঞ্জনবর্ণে চন্দ্রবিন্দুর অবস্থান কত নম্বরে প্রশ্ন করলে ক’জন বলতে পারবেন, যথেষ্ঠ সন্দেহ আছে।
অবস্থান এক্কেবারে শেষে হলেও গুরুত্বের নিরিখে কিন্তু মোটেই তুচ্ছ নয়!
**

২২।
জলকে চল
“বেলা যে পড়ে এলো, জলকে চল।“
ফেসবুকে ‘শুদ্ধ বানান চর্চা’ গ্রুপে এই বাক্যটির বিশ্লেষণ করে দেওয়ার অনুরোধে ১৩৩টি মন্তব্য এসেছে। এর মধ্যে তিনটি গ্রহণযোগ্য উত্তর এখানে দিলাম। কৌশিকি সেনগুপ্ত লিখেছেন, “বাক্যটি বাংলার আঞ্চলিক উপভাষা ‘ঝাড়খন্ডী’-র উদাহরণ। বেলা পড়ে এসেছে, অর্থাৎ বিকেল হয়ে এসেছে প্রায়। তাই অল্পবয়সী মেয়েটি তার সখীকে জল আনতে যাবার জন্য ডাকতে এসেছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘বধু’ কবিতার অংশ এটি। গ্রাম বাংলার সহজ সরল জীবনে অভ্যস্ত অল্পবয়সী মেয়েটি বধূ হয়ে এসেছে শহরের গলিতে মোড়া একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে। এখানে বধুটির জীবন অনেক নিয়মের গন্ডীতে বাঁধা। মেয়েটি তার বিবাহপূর্ববর্তী গ্রাম্য সরল জীবনের কথা মনে করছে, সে কথা বোঝাতে গিয়ে কবি উপরোক্ত উক্তিটির অবতারণা করেছেন।“

নিমা সহেলি লিখেছেন, “জল কে চল— এই বাক‍্যে ‘কে’ বিভক্তি নিমিত্ত অর্থে ব‍্যবহৃত হয়েছে। এর সহজ অর্থ হচ্ছে জলের জন‍্য চল বা জলের নিমিত্তে চলো। এখানে ব‍্যবহৃত বিভক্তিটি দ্বিতীয়া বিভক্তি নয়, চতুর্থী বিভক্তির (তৎপুরুষ সমাসে) উদাহরণ।“

শাহিন আখতার লিখেছেন, “এটা রবীন্দ্রনাথ রচিত, সঞ্চয়িতা গ্রন্থের “বঁধু” কবিতা হয়, তাহলে এটি নিঃসন্দেহে নিছক জল সংগ্রহ নয়। বরং অসীমের আহবান এবং সে আহবানে সাড়া দেওয়ার পাথেয় সম্পর্কে ইংগিত করা হয়েছে। যেখানে মৃত্যু পরবর্তী জীবনের ডাক কে বুঝানো হয়েছে।“

রাজদীপ মাহাতো লিখেছেন, “অধিকাংশ ব্যকরণ বইয়ে ‘ঝাড়খণ্ডী উপভাষা’ -র রূপতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যে নিমিত্ত এবং অধিকরণ করকে -কে বিভক্তির উদাহরণ হিসেবে লাইনটি দেওয়া হয়েছে। যা এই উপভাষার ক্ষেত্রে সঠিক। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কবিতায় এই অর্থেই ব্যবহার করেছেন। আবার ‘কুমিরডাঙা’ খেলায় ‘কুমির’কে উত্যক্ত করতে বারবার ” কুমির তোর জলকে (জলে, অধিকরণ) নেমেছি!” বলা হয়। (কেন্দ্রীয় রাঢ়ী উপভাষা অঞ্চলে) তাই একটা বিতর্কের জায়গা থেকেই যাচ্ছে!“

এ প্রসঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার প্রাক্তন উপ বার্তা সম্পাদক শম্ভু সেনের ব্যাখ্যা, “রবীন্দ্রনাথের ‘মানসী’ কাব্যগ্রন্থের ‘বধূ’ কবিতার প্রথম লাইন ‘বেলা যে পড়ে এল, জলকে চল্’। এ ব্যাপারে উপরে যে মন্তব্যগুলো পড়লাম, তার সব ক’টিই ঠিক। স্বাভাবিক ভাবেই এই ছত্রটির দু’টি অর্থ আছে – একটি, ওপর ওপর পড়ে যে অর্থ মনে হয়, আর দ্বিতীয়টি, অন্তর্নিহিত অর্থ। বেলা যে পড়ে এল, জলকে চল্ – এটি গ্রামবাংলা, বিশেষ করে রাঢ়বাংলার কথ্য ভাষা। এর মোদ্দা অর্থ – দিনের আলো পড়ে যাচ্ছে অর্থাৎ দিন শেষ হয়ে আসছে, পুকুরে চল। তখনকার দিনে বিদ্যুৎ ছিল না, গ্রামে তো নয়ই। গ্রামের বধুরা সংসারের যাবতীয় কাজ দিনের আলোর মধ্যে সেরে ফেলতেন। তার পর সন্ধে নামার আগে দল বেঁধে পুকুরে গিয়ে সেখানে নেয়ে (স্নান করে) কলসিতে জল ভরে কাঁখে নিয়ে ফিরতেন। কলসিকাঁখে বধূরা একটা ছবি সৃষ্টি করতেন। সে অন্য প্রসঙ্গ। জল নিয়ে ফিরে তার পর বাড়িতে সন্ধে দেওয়ার পালা। তাই সখী ডাক দিচ্ছে – দিনের আলো শেষ হয়ে এল, পুকুরে (নদীতে বা অন্য জলাশয়ে) চল। এখানে ‘জলকে’-র অর্থ ‘জলে’, অর্থাৎ জলাশয়ে যাওয়ার ডাক। ঠিক যেমন, কুমির তোর জলকে নেমেছি, অর্থাৎ কুমির তোর জলে নেমেছি (যেমনটি বলেছেন রাজদীপ)। আর অন্তর্নিহিত অর্থ সম্পর্কে শাহিন আখতার যা বলেছেন তা-ই। ‘বেলা যে পড়ে এল’ অর্থাৎ জীবন তো শেষ হয়ে এল। জলকে চল্ – জল তো অসীম। এ বার অসীমের আহ্বানে সাড়া দেওয়ার পালা।“

বাংলা সাহিত্যর গবেষক সুমন চন্দ্র দাস প্রতিক্রিয়ায় এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, “রবীন্দ্রনাথের বঁধু কবিতার লাইন। এখানে আভিধানিক অর্থ ‘জলকে চল ‘ কেবল জল আনতে যাওয়া যা গ্রাম্য লৌকিক কথা বলার অবকাশ মাত্র।কিন্তু এর লক্ষণ্যা হল পুকুর বা নদীতে জল আনতে যাওয়ার কথা। আর ব্যঞ্জনা হল বেলা শেষ হয়ে আসছে জীবন আয়ুর কাল সীমারেখা অতিক্রম করে রূপ থেকে অরূপের পথে যাত্রা। কালের প্রবাহে অন্তত পথে যাত্রা।“
***

২৩।
ডাল-কুকুর

সামনেই নজরুল ইসলামের জন্মদিন। তাঁর ব্যবহৃত নানা শব্দ নিয়ে আলোচনা করা যায়। নজরুলের ‘লিচু চোর’ কবিতায় আছে,
“বাবুদের তাল-পুকুরে
হাবুদের ডাল-কুকুরে
সে কি বাস করলে তাড়া,
বলি থাম একটু দাড়া।”

ডালকুকুর অর্থ— শিকারি কুকুর, শিকারে লেলিয়ে দেওয়া কুকুর। কথাটা এলো কীভাবে? শ্রী জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস তাঁর ‘বাঙ্গলা ভাষার অভিধান’ গ্রন্থে লিখেছেন: “ধরিবার জন্য শিকারের পশ্চাৎ ছাড়িয়া দেওয়া; কুত্তা=কুকুর। পশ্চাদ্ধাবিত হইয়া শিকার করিবার জন্য যে কুকুরকে ছাড়িয়া দেওয়া (ডালা) যায়”।

ড. মোহাম্মদ আমীন তাঁর ‘পৌরাণিক শব্দের উৎসকথন ও বিবর্তন অভিধান’-এ লিখেছেন, “এই বর্ণনা দেখে বলা যায়, হিন্দি ডালনা বা ডাল শব্দের একটি অর্থ— ‘শিকারে লেলিয়ে দেওয়া’, ‘শিকারি’। এই ডানা ‘ডাল্‌না’ থেকে ‘ডাল’ ও কুকুর-অর্থে ‘কুত্তা’ মিলিত হয়ে হিন্দি ‘ডালকুত্তা’ নির্মিত হয়েছে। যা বাংলায় ‘ডালকুত্তা’।“

এ ছাড়া লিখেছেন, “ডালকুত্তা শব্দের বাংলা হলো: ডালকুকুর। অনেকের মতে, ডালমেশিয়ান হতে হিন্দি ডালকুত্তা নামের উদ্ভব। যা বাংলায় নিজস্ব শব্দ হিসেবে আত্তীকৃত হয়ে যায়। প্রসঙ্গত, ক্রোয়েশিয়ার ঐতিহাসিক ডালমেশিয়া (Dalmatia) অঞ্চলেভছিল এ জাতীয় কুকুরের আদি জন্মস্থান। এখান থেকে প্রজাতিটি সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।“
***

২৪ ।
নজরুলের বাংলায় বিদেশি শব্দ (১)

“আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস,
আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ!“

শতবর্ষ পূর্ণ হল নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’-র। ২৪ মে নজরুল ইসলামের জন্মদিন। বাংলা শব্দমালায় অজস্র বিদেশি শব্দ ঢুকে আছে। মিশে গিয়েছে আমাদের প্রাত্যহিক কথায়। সেই তালিকা অতি দীর্ঘ। এই যে ওপরের দুটি লাইন, বেদুঈন এক যাযাবর জাতি। এটি একটি আরবি কথা। চেঙ্গিসও বহিরাগত।
কুর্ণিশ ফার্সি শব্দ।

আবার এই কবিতাতেই “খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া“— আরবি-তে খোদা মানে আসল কর্তা, আরবি-তে আরশ মানে সিংহাসন। আইন, কানুন-সহ বেশ কিছু বিদেশি শব্দ রয়েছে শতবর্ষের এই বিখ্যাত কবিতায়।

‘নজরুল-কাব্যে ভাষা, শব্দ ও ছন্দ’-তে (‘যায় যায় দিন’, ২১ মে, ২০২১) জাহান আরা খাতুন লিখেছেন, “নজরুল ইংরেজি সাহিত্যের সঙ্গে ভালোভাবে পরিচিত ছিলেন না। এ জন্য তাঁর পদবিন্যাস রীতিতে ইংরেজি বিধানের অভাব পরিলক্ষিত হয়। তবে আরবি, ফারসি ভাষার সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগাযোগ ছিল। হিন্দু, মুসলিম ঐতিহ্য সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন। এ জন্য তাঁর শব্দভান্ডার ছিল সমৃদ্ধ। ভাষা স্বাতন্ত্র্যে দীপ্ত। নজরুল তৎসম, তদ্ভব, দেশি, বিদেশি সব রকম শব্দই কাব্যে ব্যবহার করেছেন। আরবি, ফারসি শব্দের নৃত্যচপল তরঙ্গদোলায় তার দরদি মনের অভিপ্রায় ব্যক্ত হয়েছে। উদাহরণ হিসাবে
উল্লেখ করেছেন ‘দুজনার হবে বুলন্দ নসিব লাখে লাখে হবে বদনসিব’ (ঈদ মোবারক), ‘হেরেম বাঁদীরা দেরেম ফেলিয়া মাগিছে দিল নওরোজের নও মফিল’(নওরোজ), ‘তেরিয়া হইয়া হাঁকিল মোল্লা ভ্যালা হল দেখি ল্যাঠা’ (মানুষ কবিতায় গ্রাম্য শব্দ) প্রভৃতি হরেক বিদেশি শব্দ।
***

২৫।
নজরুলের বাংলায় বিদেশি শব্দ (২)

বাংলা শব্দের প্রয়োগ যাঁদের ভাবায়, তাঁরা সকলেই জানেন কতরকম ভাবে শব্দকে নিয়ে খেলা করেছেন কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর জন্মদিনকে উপলক্ষ করে আজও এ নিয়ে সামান্য আলোকপাত।

“আলগা কর গো খোঁপার বাঁধন দিল ওহি মেরা ফাঁস গয়ি; বিনোদ-বেণীর জরিন্ ফিতায় আন্ধা এশক মেরা ফাঁস গয়ি।“ চিরকালের এই গানের দুটি কলির উল্লেখ করে যূথিকা বসু তাঁর ‘সুর ও বাণীর মালা দিয়ে তুমি’-তে লিখেছেন, “এই গানে বাংলা শব্দের পাশেই উর্দু শব্দ আবার তারপরেই বাংলা শব্দের সহাবস্থান—গজলের পরিবেশটিকে অনেকখানি তুলে ধরেছে। ভাব প্রকাশের ক্ষেত্রেও যেন মনে হয়—‘আলগা কর গো খোঁপার বাঁধন’-এর পর ‘চিত্ত যেথায় হারিয়ে গেছে’ এই ধরনের জোলো বাণীর পরিবর্তে ‘দিল ওহি মেরা ফাঁস গয়ি’ সুপ্রযুক্ত। এছাড়া শব্দ ব্যবহারে কোনো ছুঁৎমার্গ ছিল নজরুলের। নিজের আবেগকে প্রকাশ করতে গিয়ে যখন শব্দের প্রয়োজন হয়েছে তাকেই এনে বসিয়েছেন গানের পংক্তিতে।’

নজরুলের গানে শব্দের ব্যবহার’-এ আমিনুল ইসলাম লিখেছেন, “নজরুল তাঁর কবিতায় যেমন, গানেও তেমনি অজস্র আরবি, ফার্সি-উর্দু-হিন্দি শব্দ ব্যবহার করেছেন। এতে গানের বাণী আরও সমৃদ্ধ ও ব্যঞ্জনানিবিড় হয়ে উঠেছে। গজল ও ইসলামি গানগুলো দেশি-বিদেশি শব্দের যুৎসই ব্যবহারে হয়ে উঠেছে অনন্য। বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধকরণে নজরুলের এই ভূমিকা নিঃসন্দেহে অতুলনীয়। এখানে আরেকটি কথা প্রণিধানযোগ্য—বাংলা ভাষাভাষী মানুষের অর্ধেকেরও বেশি ইসলাম ধর্মানুসারী। তাদের প্রতিদিনের জীবনযাপনে ও কথোপকথনে স্বাভাবিকভাবেই ও অপরিহার্যভাবেই অনেক আরবি-ফার্সি শব্দ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এছাড়া এদেশে বহুদিন ফার্সি রাজভাষা থাকার কারণে এবং মুসলমানদের ধর্মীয় পুস্তকগুলো আরবি ভাষায় লিখিত হওয়ায় অফিস আদালত, ভূমিব্যবস্থাপনা, বিয়ে-শাদির অনুষ্ঠানে শত-শতকথোপকথনে স্বাভাবিকভাবেই ও অপরিহার্যভাবেই অনেক আরবি-ফার্সি শব্দ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। নজরুল ইসলাম এসব শব্দ ব্যবহার করে গানগুলোকেও সেসময়ে সংগীতবিমুখ বাঙালি মুসলমানের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছেন। এটা দূরদর্শিতার পরিচয়বাহী।

তাঁর ব্যবহৃত আরবি-ফার্সি শব্দগুলোর ব্যবহারও চমৎকার। জোছনার কুমকুম, রহমতের ঢল, পুণ্যের গুলিস্তান, রংমহলার তিমির দুয়ার, শিশমহল, নীল পিয়ালায় লালসিরাজী, লালগেলাসের কাচমহলা, দিলদরদীর দিললাগি, বাদশাজাদীর রঙমহল, বিজলী জরিন ফিতা, লু হাওয়ার ওড়না, মিঠাপানির নহর, ফুটন্ত গুলবাগিচা, বিরহের গুলবাগ, শরাবরঙের শাড়ি, বাণ-বেঁধা বুলবুল, তনুর তলোয়ার, গোলাপগালের লালি, চাউনিবাঁ সুমাআঁকা ডাগর আঁখি, গাফেলতির ঘুম, সোনাল ফুলের বাজু, অনুরাগের লাল শরাব, অস্তাচলের প্রাসাদ মিনার, শরাবী জামশেদী গজল, গুলবাহারের উত্তরীয়, ঈদের চাঁদের তশতরী, মদির আঁখির নীল পেয়ালায়, বেদন বেহাগ, সুরের সাকি, নও-বেলালের শিরিন সুর, আল আরাবী সাকি, হৃদয় জায়নামাজ, তৃষ্ণা-দরিয়া, মুসাফির, জরিন হরফ, রাঙা-গুলের বাজার, খুশির জলসা, নূরের দরিয়া প্রভৃতি শব্দের ব্যবহার অভূতপূর্ব এবং অপূর্বসুন্দর।“ (‘চিন্তাসূত্র’, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৫)।
***

আপনাদের মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here