জঙ্গলমহলে তৃণমূলের আধিপত্য ভেঙে প্রভাব বাড়াচ্ছে বিজেপি

জে মাহাতো, আমাদের ভারত, ঝাড়গ্রাম, ১৬ অক্টোবর:
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তথা তৃণমূলের খাসতালুক জঙ্গলমহলে শক্তি বাড়াচ্ছে বিজেপি। সাম্প্রতিককালের সভাগুলিতে উপচে পড়া মানুষের ভিড় সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, আগামী বিধানসভা নির্বাচনের জন্য তৃণমূলের কাছে এই ভিড় অশনিসংকেত। গত লোকসভা নির্বাচনে পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম ও মেদিনীপুর কেন্দ্রে বিজেপির জয়ে সিঁদুরে মেঘ দেখেছে শাসক দল।

গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে জঙ্গলমহলের এই চার জেলায় তৃণমূলের হাতে থাকা শতাধিক গ্রাম পঞ্চায়েতের দখল নিয়েছে গেরুয়া দল। তারপর লোকসভা নির্বাচনেও এই চারটি এবং বিষ্ণুপুর কেন্দ্রে পর্যুদস্ত হয়েছে তৃণমূল। এই ফলাফল স্পষ্ট করেছে, একুশের বিধানসভা নির্বাচনে জঙ্গলমহলে তৃণমূলের মাথা তুলে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে কতখানি জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এক নম্বর থেকে দুই নম্বরে নেমে যাওয়ার ঘটনা জঙ্গলমহল থেকে মমতা ম্যাজিকও ক্রমশ উধাও হওয়ার ছবিই সামনে আনে।

গত বিধানসভা নির্বাচনে বান্দোয়ান, খাতড়া, রানিবাঁধ রাইপুর, সিমলাপাল, বিনপুর, ঝাড়গ্রাম, শালবনি, নয়াগ্রাম, গোপীবল্লভপুর ও মেদিনীপুর কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থীরা গড়ে প্রায় চল্লিশ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন। এই ব্যবধান মুছে বিজেপির অগ্রসর হওয়ার প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছিল পঞ্চায়েত নির্বাচনে। তৃণমূলের থেকে প্রায় একশটি পঞ্চায়েতের ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল বিজেপি। এরপর বিজেপির শক্তি প্রকাশ পায় লোকসভা নির্বাচনে। জঙ্গল মহলের পাঁচটি লোকসভা কেন্দ্রেই তারা প্রথম স্থানে উঠে আসে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিভিন্ন ভাতা ও সহায়ক প্রকল্পে, একশো দিনের কাজের প্রকল্পে এবং বেশ কিছু সরকারি প্রকল্প ও যোজনায় দুর্নীতির অভিযোগ এবং বেকারত্ব ক্রমশ নড়বড়ে করে দিচ্ছে পরিবর্তনের সরকারের ভিত। যার ফলে তৃণমূলের ভোটের ফলাফলে ক্রমশ মুখ থুবড়ে পড়ছে। জঙ্গলমহলে তৃণমূলের নেতাদের দাম্ভিকতা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঝাড়খন্ড দলগুলির এবং বামেদের একটি বড় অংশ বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। বিষয়টি লোকসভা নির্বাচনেই সামনে এসেছিল, যা এবার আরও প্রকট হচ্ছে। তারাই বিজেপির সভা ভরাচ্ছে এবং পরোক্ষে আরো গ্রহণযোগ্য করে তুলছে বিজেপিকে।

গত পরশু মঙ্গলবার জঙ্গলমহলের শিলদার জনসভায় লোক সমাগম দেখে আপ্লুত কৈলাস বিজয়বর্গীয় এবং মুকুল রায় বলেন, লোকসভা নির্বাচনে জঙ্গলমহলে বিজেপির জয় খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। আগামী বিধানসভা নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয় হবে বিজেপির। পরিবর্তনের পরিবর্তন হবে রাজ্যে। জঙ্গলমহলের আদিবাসী কুড়মি সমাজের ভোটই সবথেকে বড় ফ্যাক্টর।

পঞ্চায়েত নির্বাচনে হোঁচট খাওয়ার পর লোকসভা নির্বাচনে সেই ভোট ফিরিয়ে আনতে আদিবাসী সমাজ সংগঠনের নেতা রবিন টুডু এবং মাহাতো বা কুড়মি সমাজের কিছু নেতাদের দায়িত্ব দেয় তৃণমূল। রবিন টুডুর স্ত্রী বিরবাহা টুডুকে ঝাড়গ্রাম কেন্দ্রে প্রার্থীও করা হয়। কিন্তু তারপরই আদিবাসী ও কুড়মি সমাজ বিভক্ত হয়ে যায়। ফলে আদিবাসীদের সম্পূর্ণ ভোট অধরাই থেকে যায় শাসকদলের প্রার্থীর। রাজনৈতিক মহল বলছে, বিজেপিকে রুখতে আদিবাসীদের মধ্যে ভাঙন ধরাতে গিয়েই বিপাকে পড়েছে তৃণমূল। রবিন টুডুদের সমাজ সংগঠন থেকে বেরিয়ে এসে মাঝি পারগানা মহল আলাদা সংগঠন তৈরি করে এবং লোকসভা নির্বাচনে আলাদা প্রার্থী দেয়। ফলে যে আদিবাসী ভোট জঙ্গলমহলে এতদিন বাঁচিয়ে এসেছে সেই ভোটই ডোবাচ্ছে তৃণমূলকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here