চীনের লক্ষ্য লাদাখ, সিকিম, অরুণাচল প্রদেশ, ভুটান ও নেপাল দখল

গোপাল চন্দ্র মণ্ডল
আমাদের ভারত, ১৯ জুন: ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধে ভারতের পরাজয়ের ইতিহাস বহু শ্রুত। কিন্ত ১৯৬৭ তে চিনকে পাল্টা মারের ইতিহাস অজানা!! এই যুদ্ধে ভারতের সাফল্য এসেছিল বিদেশ নীতিতে সর্বকালের সেরা ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর হাত ধরে। তাঁর ফলশ্রুতি পরবর্তী সময়ে চীনের আপত্তি সত্ত্বেও সিকিমের ভারত ভুক্তি।

উল্লেখযোগ্য, যে ইন্দিরা গান্ধী তাঁর বাবা নেহেরুর মত অযোগ্য ছিলেন না, তাই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে ভারতের সার্ব্বভৌমিকতা, অখন্ডতা রক্ষার জন্যে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির প্রয়োজন। তাঁর সময়েই ভারত পরমাণু শক্তিধর দেশ হয়ে ওঠে ১৯৭৪ সালের ১৮ মে। দিনটি ছিল বুদ্ধ জয়ন্তী, ভারতে সরকারি ছুটির দিন। ঠিক সকাল ৮টা বেজে ৫ মিনিটে পুরো বিশ্বকে চমকে দিয়ে পোখরান টেস্ট রেঞ্জে পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় ভারত। বুদ্ধ জয়ন্তীতে বিস্ফোরণ ঘটানোয় এর কোড নাম দেওয়া হয়েছিল ‘স্মাইলিং বুদ্ধ’। আমরা চীনকে বহু পুর্বে দিয়েছিলাম ভগবান বুদ্ধের বানী, আর ১৯৭৪ সালের ১৮ ই মে তে দিলাম তাকে চমকে দেওয়ার জন্যে “স্মাইলিং বুদ্ধ”। হা হা হা!

প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তার আগেই ১৯৭১ সালে চীনের দোসর পাকিস্থানকে দ্বিখন্ডিত করে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিয়ে ভারতের পুর্ব সীমান্তকে স্থায়ীভাবে সুরক্ষিত করেন। চীন পাকিস্থানের এই দ্বিখন্ডিত হওয়াকে মেনে নিতে পারেনি। কিন্তু ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে চীন ভারতের হাতে মার খাওয়ার অভিজ্ঞতাটা ভুলতে পারেনি তাই ১৯৭১ সালে ভারত-পাক যুদ্ধতে প্রবল মার্কিন চাপ থাকলেও চীন যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত রাখে নিজেকে। ১৯৬৭ সালের প্রচন্ড মারের অভিজ্ঞতা সেদিন চীনের না থাকলে ১৯৭১ সালে চীন যে পাকিস্থানকে সামরিক সাহায্য দানের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মদানের প্রক্রিয়াকে ব্যহত করত তা বলা বাহুল্য।

১৯৬৭ সালের চিন-ভারত যুদ্ধের মুল কারণ ছিল সিকিমের উপর আধিপত্য নিয়ে। প্রসংগক্রমে বলে রাখি সিকিম ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত থাকলেও ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ সিকিম ছেডে চলে গেলে তা স্বাধীন এক ক্ষুদ্র পার্বত্য রাষ্ট্রে পরিণত হয়। চীন সিকিমের উপর নজর দিতে শুরু করে।
স্বাধীনতার পুর্ব থেকেই ভারত-চীন সীমানা বিবাদ। চীন এক সাম্রাজ্যবাদী দেশ। ১৯৫০ সালে চীন তিব্বত দখল করে। তিব্বত দখল করার পর মাও সে তুং বলেছিলেন, হাতের তালু দখল করা হয়েছে এবার পাঁচটা আঙুল কবজা করতে হবে। সেই পাঁচটা আঙুল হচ্ছে–লাদাখ, সিকিম, অরুণাচল প্রদেশ, ভুটান ও নেপাল।

আজ সিকিমকে আমরা চীনের আগ্রসান থেকে বিমুক্ত করে ভারতের অঙ্গরাজ্য করতে সক্ষম হয়েছি। লাদাখ,অরুনাচল প্রদেশ ভারতেই রাখতে সমর্থ্য হয়েছি। ভারতের প্রতি নেপাল, ভুটানের অনুগত্য লাভে সমর্থ হয়েছি। সিকিমের ভারত ভুক্তির প্রক্রিয়া ১৯৭১ সালেই ইন্দিরা গান্ধীর সময়ে শুরু হলেও তা বাস্তবায়িত হয় ১৯৭৪ সালে ৪ সেপ্টেম্বর। সংসদে ৩১০-৭ ভোটে বিল পাশ হয়, সংবিধান সংশোধনের মধ্য দিয়ে সিকিম ভারত ভুক্তি সম্পন্ন হ য়। সেই দিন এই ভারতের কমিউনিষ্টরা সংসদে এই বিলের বিরুদ্ধেই ভোট দান করে চীনের প্রতি তাদের আনুগত্য অব্যহত রাখে। চীন আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ করে ইউনাইটেড নেশনসে সিকিমের ভারত ভুক্তি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে “চ্যাঁ চ্যাঁ” করে সোচ্চার হয়। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধীর বিদেশ নীতি এবং কৌশলের কাছে কোনঠাসা হয়ে পড়ে চীনের চ্যাঁচানি বন্ধ হয়। কিন্ত মাও সে তুং এর উত্তরসুরি চীনা কমিউনিষ্ট পার্টির চেয়ারম্যান তথা চিনা প্রেসিডেন্টরা আজও মাও এর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখেই চলেছে,—- তিব্বতের পর লাদাখ, সিকিম, অরুণাচল প্রদেশ, ভুটান ও নেপাল দখলের।

লক্ষনীয় নেপালের বর্তমান কমিউনিষ্ট সরকারের সাম্প্রতিক লাফালাফি এবং ভারত বিরোধী মনোভাব। এর পিছনেও আছে চীনের উস্কানি এবং নেপালকে আগামী দিনে চীন ভুক্তির সুদুর প্রসারি কু-মতলব। যদিও নেপালের আম জনতা তা বুঝতে পেরে নেপাল সরকারের ভুমিকায় ক্ষোভ জানিয়ে প্রতিবাদে নেমেছেন।

১৯৬৭ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের পটভুমি, ভারতীয় সেনার বিজয় ইতিহাস, সিকিম অন্তর্ভুক্ত ঘিরে যে গৌরবোজ্জ্বল ভারতীয় ইতিহাস তা সব ভারতবাসীর জানা প্রয়োজন। সামরিক শক্তির দিকে থেকে চীন মানেই ভারতের কাছে একটা ত্রাস!! এই বিভ্রান্ত দুর করতে ১৯৬৭ সালের চিন-ভারত যুদ্ধে ভারতের বিজয়ের ইতিহাস জন সম্মক্ষে আজ আনা জরুরি।

প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পরবর্তীকালে ভারতে যে ক’জন প্রধানমন্ত্রী এসেছেন তার মধ্যে বিদেশ নীতিতে সব চেয়ে সফল বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মোদিজি। চীন আজ সারা বিশ্বে ধিকৃত এক দেশ। আমেরিকার মত বৃহৎ শক্তিশালী দেশ শুধু নয় ভারতের পুরোনো বন্ধু রাশিয়াও চীন-ভারত দ্বৈরথে ভারতকে পুর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। ইসরায়েল, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ ভারতের পাশে তাদের অবস্থান নিশ্চিত করেছে। আন্তর্জাতিক কুটনৈতিক মহলে চীন পুরো কোনঠাসা আজ, তাই তারা শান্তি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিজেদের সম্মান রক্ষায় বাধ্য হয়েই বিবৃতি দিচ্ছে। আর তা সম্ভব হয়েছে ভারতবাসীর মধ্যে জাতীয়তাবাদের বিকাশ এবং তীব্র প্রকাশ এবং প্রধানমন্ত্রী মোদীজীর সুযোগ্য বলিষ্ট নেতৃত্বের কারনেই। চীন আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে এটা নডবড়ে নেহেরুর ভারত নয় এটা মোদীজীর ভারত কিন্তু তা গিলতে বড্ড বদ হজম হচ্ছে ভারতে থাকা চীনের দালাল সেবক রাজনৈতিক বোদ্ধাদের।

( লেখক কলকাতা হাইকোর্টের এডভোকেট, জি সি মণ্ডল। মোবাইল 9830856567। তথ্য এবং মতামত লেখকের নিজস্ব।)

আপনাদের মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here