করোনাতেও সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা: সংজ্ঞাহারা পশ্চিমবঙ্গ

ড. রাজলক্ষ্মী বসু
আমাদের ভারত, ১৬ মে: সুচিন্তিত পাঠক বলবেন, সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু কাকে বলে? সোজাসাপটা কথায় আসি, এখনও ভারতের বুকে মুসলমান সম্প্রদায় কি সংখ্যালঘু? সেই কোন ১৯০৯ সালে H. H. Risalery বলেছিলেন, ‘Will Hinduism hold its own citadel in the future, as it has done through the long ages in past?’ ভারী প্রাসঙ্গিক বা বলা ভালো সত্যি বলেছিলেন সাদা চামড়ার সাহেব। এই কারণেই এই লেখা পড়েই অনেক হিন্দু একে সাম্প্রদায়িক বা গোঁড়া কলাম ইত্যাদি কত কথাই না বলবেন।

আবার সেই সংখ্যালঘু-গুরুর বিষয়ে আসি। ২০১১-এর আদমসুমারি অনুযায়ী ড. জে কে বাজাজ বলেছিলেন, ২০০১-২০১১ যেখানে জাতীয় সংখ্যার বৃদ্ধির হার ১৭.১ শতাংশ, সেখানে মুসলমান সংখ্যা বৃদ্ধির হার ২৪.৪ শতাংশ। শুধুমাত্র হিন্দু জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল সেবার ১৪.৫ শতাংশ। যে কোনও দেশের ক্ষেত্রেই কেবলমাত্র একটি তথাকথিত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সংখ্যা এ হারে বৃদ্ধি নিশ্চিতরূপে জনসংখ্যার সাপেক্ষে তাকে কি সংখ্যালঘু আর রাখে?

এত বড়ো গৌরচন্দ্রিকা অবতারণা করতে হলো এই বোঝাতে যে, এখন কি সংখ্যালঘু মুসলমান কথাটা খুব একটা মানানসই। নাকি বলা উচিৎ মুসলমান ধর্মাবলম্বী বা মুসলমান সম্প্রদায়। কলম আবার বিচলিত হল, হুগলি তেলিনীপাড়ার ঘটনায়। ঘটনা কেন, সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা আর গোষ্ঠী দ্বন্দ্বের কথা শুনে। করোনা কাতর রাজ্যে এখনও এমন কি করে হয়? এ রাজ্যে সব হয়। দোকান জ্বলছে, বাড়ি পুড়ছে, দূষণবিহীন বাতাসে যখন সর্বত্র আকাশ নির্মল, তখন সেখানে ধূম্রঘন আকাশ, প্রায় পঞ্চাশ সংখ্যাগুরু হিন্দু পরিবার প্রাণের ভয়ে বাড়ি ছাড়া। সংখ্যালঘুর বিশেষ ধর্মীয় ধ্বনি আর হাতে তরোয়াল। গত ১০ মে-র হুগলির কন্টাইমেন্ট জোনে রাতে শোনা যায় বোমার শব্দ। হুগলিতে বিস্তার হয় হিংসা। সংখ্যাগুরু পরিবারের মহিলারা ক্ষুধার পেটে সম্ভ্রম রক্ষার্থে বাড়ি ছাড়া। পশ্চিমবঙ্গে গ্রামেগঞ্জে এখন তো এক নতুন কুটির শিল্প আছে, দেশী ক্রুড বোমা। তাই বোমা কে কখন ক’টা আনল সে সব জিজ্ঞাসা করা নির্বুদ্ধিতা। হুগলির সাংসদও তাঁর অঞ্চলে ঢোকার অনুমতি পাননি। আমরা যে সেকুলার দেশের বাসিন্দা, তাই এটাকেও কেউ কেউ সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমে বলছেন, এ হল ভোটের রাজনীতি। এ হল সেই পশ্চিমবঙ্গ যে শিক্ষা শিল্প বিজ্ঞান সংস্কৃতির নিরিখে দেশের শীর্ষে ছিল। বিশ্বের কাছে পূজিত ছিল। এখন সে রাজ্যের অলিতে-গলিতে চলছে দুষ্কৃতীর দৌরাত্ম্য আর সেকুলারিজমের নামে ওদের জন্য আপোষ আর লাগাতর দুঃশাসন।

এ রাজ্যের সেকুলারিজমের আরও এক বড় উদাহরণ হল, তারকেশ্বর মন্দিরের ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের অধ্যক্ষ ফিরহাদ হাকিম। ২০১৬ মালদহের কালিয়াচকের ঘটনা নিশ্চয়ই আমরা কেউ ভুলিনি। ২০১১-র আদমসুমারি এও বলে, মালদহ ( ৪৯.৭২%), মুর্শিদাবাদ( ৬৩.৬৭%) এবং উত্তর দিনাজপুরে (৪৭.৩৬%) মুসলিম আধিক্য। মোট ২৯৪টি বিধানসভার আসনের ১০০টি আসনই মুসলমান ভোট দ্বারা এ রাজ্য নিয়ন্ত্রিত ও নির্ণীত হয়। ঠিক যে অঞ্চলে সেদিন কালিয়াচকে দাঙ্গা হয়েছিল, এদিন হুগলির ওই অঞ্চলগুলির ডেমোগ্রাফিও প্রায় এক। এ ধরনের হিংসাত্মক কাজে বাইরের থেকে খুব সহজেই লোক আনা যায়। তথ্য স্পষ্ট, তাই কালিয়াচকের উদাহরণটাই দিই, ৩ জানুয়ারি ২০১৬-তে প্রায় ১.৫ লক্ষ সংখ্যালঘু ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে একত্রিত হয়ে তাণ্ডব শুরু করে। মহিলা শিশু, বৃদ্ধ সমেত কালিয়াচকের একটি ব্লকের জনসংখ্যা ৩.৫ লাখ। নির্দিষ্ট করে যেখান থেকে দাঙ্গা শুরু, কালিয়াচক-বালিয়াডাঙ্গা, সেখানে মুসলমান সংখ্যা ১০,০০০। অর্থাৎ ‘Flash mob’ ছিল না। আমার দৃঢ় ধারণা, হুগলি তেলেনিপাড়াতেও প্রায় কাছাকাছি মডেল। সেদিন বাংলামাধ্যম অনেকটা নিশ্চুপ থাকলেও ‘হিন্দু সংহতি’ নামক একটি সংগঠন প্রথম গর্জে ওঠে। কালিয়াগঞ্জের ঘটনাতে অনেক সেকুলার পাঠক নিশ্চয়ই স্মরণ করাতে চাইবেন, কমলেশ তেওয়ারির কথা। তিনি বুঝি ‘Blasphamic’ মন্তব্য অন্য ধর্ম সম্বন্ধে করেন। যদি তা যুক্তির খাতিরে ঠিক মেনেও নিই, তাহলেও জিজ্ঞাসা আর ক-জন সেদিন গ্রেফতার হয়েছিল। মাত্র ন-জন, তার মধ্যে ছ-জনই জামিন পান। কিন্তু কমলেশ তিওয়ারির কপাল পুড়ল। প্রসঙ্গক্রমে জানাতে চাই, এ দেশের কি কোনও Blasphemy আইন আছে?

আবার আসি চন্দননগর প্রসঙ্গে, ইতিহাস সমৃদ্ধ অঞ্চলটিতে মন্দির লুণ্ঠিত হয়েছে সেই কোন কাল থেকে। ১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে চন্দননগরের তৎকালীন ফরাসি সরকারের দেওয়ান ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী নন্দদুলাল মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। ১৭৫৬-তে লর্ড ক্লাইভ গোলা ছুড়ে মন্দিরের একাংশ ধ্বংস করে। বিগ্রহ ভেঙ্গে দেয়। লুঠপাঠ চালায়। মূর্তির ভাঙ্গা অংশ চন্দননগের ফ্রেঞ্চ ইনস্টিটিউট-এ রক্ষিত। এ রাজ্যে নানা অছিলায়, বারে বারে দেবদেবী, হিন্দু বিশ্বাসের উপর, মানুষের উপর সাম্প্রদায়িকতার বাঘ নখ আঁচড় দিয়েছে। চলেছে লুঠতরাজ। ইতিহাস কিছু জানায় কিছু জানায় না। এ দেশটা সেকুলার বলেই হয়তো অনেক অনাচার অপমান ধূলার স্তূপে নীরবে রেখে দিয়েছে।

২০১৩-র ঘটনা একবার অন্তত স্মরণ করি। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার সে বার জ্বলেছিল ২০০টি সংখ্যাগুরু পরিবারের বাড়ি। চারটি গ্রামে চলেছিল, লুঠ, অনাচার। নোয়াখালি, হেরভা্ঙ্গা, গোপালপুর, গোলাডোগরা— যা ক্যানিং থানার অন্তর্গত। ১৯ ফেব্রুয়ারি মধ্য রাতে কমপক্ষে ডজনেরও বেশি সংখ্যাগুরুর দোকানে আগুন লাগানো হয়। সেদিন সামনেই ছিল পঞ্চায়েত ভোট। ওই অঞ্চলের ভোটব্যাঙ্ক সংখ্যালঘু দ্বারা অনেকাংশেই লালিতপালিত। ১৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাক বোঝাই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ হাজির হয় এবং অস্থিরতা শুরু। সেদিন রক্ষা পায়নি পুলিশ প্রশাসনও। পুলিশ অফিসার অরূপ সমাদ্দার এবং অনুপ ঘোষাল (ক্যানিং থানা) গুরুতরভাবে আহত হন। সন্দেশখালি পর্যন্ত দাঙ্গার আগুন ছড়ায়। যখন আগুন জ্বলে তখনই সংবাদমাধ্যমের ঢোকায় বেড়ি পরে। কলমে লাগে হাতকড়া। ২০১৬, হাওড়া দেওয়ানঘাটের ঘটনা ক-জনই বা জানতে পেরেছিলাম। ১২ ডিসেম্বরের পরের রাত থেকেই সামাজিক অরাজকতা বেড়ে যায়। ধূলাগড়ে সে আতঙ্ক ছড়ালে তা কিছুটা সংবাদমাধ্যমের পাতা দখল করেছিল। স্থানীয় চিকিৎসালয়ও আক্রমণের হাত থেকে রেহাই পায়নি। পোড়া টায়ারের গন্ধ যতক্ষণ না অনুভূত হয় ততক্ষণ আমরা মারামারি বলে ঘটনা ধামাচাপা দিতে চাই।

দুর্বৃত্তদের কোনও ধর্ম কি আদৌ হয়? তারা সাম্প্রদায়িকতার ঘৃণ্য ছুরির আঘাত করে। ১৯৬৪-র হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গায় যখন পূর্ব পাকিস্থানের সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর হিংসার আঁচড় দেয়। ১৫ জানুয়ারি জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট নেতা সৈয়দ আজিজুল হক (নান্না মিয়া), ডিআইজি এন এ হক এবং ঢাকার স্থানীয় লোকজন যাত্রাবাড়ি ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের প্রায় সাত হাজার সংখ্যালঘু হিন্দু শিশু ও মহিলাকে উদ্ধার করেন। দাঙ্গার মধ্যে এটুকুই হয়ত মানবিকতার স্পর্শ। আজও এইটুকুর আশাতেই হয়ত আমরা সেকুলার শব্দে শ্রদ্ধা, বিশ্বাস রাখি। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার নিয়ন্ত্রণে যেমন সামাজিক সচেতনতা, দায়বদ্ধতা, শিক্ষা, আর্থ-সামাজিক পরিকাঠামো অনেকাংশেই দায়ী, তেমনই প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং দুষ্কৃতী দমন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাও বড় দায়িত্ব পালন করে।

বছর বছর এ রাজ্যে দাঙ্গার পরিমাণ বেড়েই চলেছে। ২০১৪-তে ছিল ১৬টি সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা, ২০১৫ সাক্ষী রইল ২৭টি সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের। ২০১৬ এ ৩২টি সাম্প্রদায়িক রেষারেষি রাজ্য অশান্তির তালিকায় যোগ করেছে। তথাকথিত নাস্তিক বলে যাদের পরিচয়, বামপন্থীরা সেই বামনেতা বিকাশ ভট্টাচার্যই একদা বলেছিলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসার লোভে একসময় সাম্প্রদায়িক সুড়সুড়ি দিয়েছিলেন। এখন তার ফল ভোগ করতে হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে মাঝে মধ্যেই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।’

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার জন্য সোশ্যাল মিডিয়াকেও বড়ো দায়িত্ব নিতে হবে। বহু ক্ষেত্রে উসকানিমূলক ভিত্তিহীন অসংবেদনশীল মন্তব্য সামাজিক স্থিতি শান্তির ব্যাঘাত ঘটায়। যেমন নেত্রকোনায় মন্দির ধ্বংসের গুজব। সস্তায় ইন্টারনেট যেন শান্তি কেড়ে না নেয়। এত কিছুর পরও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের হানাহানিতে আমরা ঘৃণা করি, গোঁড়ামিতে অবিশ্বাস করি। ‘টলারেন্স’ শব্দটা আমরা (সব ভারতবাসী, জাতীয়তাবাদী) ছাড়া আর কেই বা জানি। পশ্চিমবাংলায় ডেমোগ্রাফি যেমন বদলাচ্ছে, তেমনই বদলাচ্ছে সামাজিক স্থিরতা, সহিষ্ণুতা। আমরা সেই পশ্চিমবঙ্গ চাই, যে বিবরণ একদা নীরদচন্দ্র চৌধুরী দিয়েছিলেন। দুর্গাপুজোর বলিদানের অভিজ্ঞতায় তিনি বলেছিলেন, পাঁঠাবলির আগে যত জোরে ‘ম্যা ম্যা’ চিৎকার করত, মুসলমান বাজানদারেরাও তত জোরে বাদ্যি বাজাত।
দিল্লির সুলতানদের মতো বাংলার ইসলামি নবাবরা মন্দির ধ্বংসের তেমন ধারাবিবরণী দেয়নি। লিপিবদ্ধ তেমন কোনও পূর্ণাঙ্গ তালিকাও পাওয়া যায় না। সেই কোন মধ্যযুগ থেকেই এ রাজ্যে ধর্মীয় হানাহানি হচ্ছে। রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র অন্নদামঙ্গল কাব্যে বলেছিলেন, ‘যত দেবতার মঠ, ভাঙ্গি ফেলে করি হঠ, নানা মতে করে অনাচার।’ সেই অনাচার এই আধুনিক যুগে যেন আর না হয়। অনেক অনাচারের সাক্ষী আমাদের ইতিহাস, তথাপিও টলারেন্স শব্দেই ধৈর্য্য রাখি আমরা। পরবর্তী সময়ে সেকুলার শব্দের অবতারণা, সেকুলার শব্দের আবহে পুরো বর্তমান সমাজচিত্র যেন the most decisive transformational event-এর সন্ধান পায়। ‘Hope’ এবং ‘Despair’ এর মধ্যে আমরা দোদুল্যমান। ‘Minority-ism’ –এ কেউই ভালো থাকতে পারে না। ‘pseudo secularism সেই minority-ism কেই প্রশ্রয় দেয়। উন্নত সমাজব্যবস্থায় তা পরিপন্থী। তাই সবাই সেকুলারিজমে বিশ্বাস রাখব, যা বলে সবকা সাথ সবকা বিকাশ। (তথ্য এবং মতামত লেখকের নিজস্ব, এর জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ি নয়।)

আপনাদের মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here