করোনা গৃহশিক্ষক ও সমাজ

ড.রাজলক্ষ্মী বসু, আমাদের ভারত, ২১ মার্চ: কারো পৌষমাস তো কারো সর্বনাশ। আবার তা প্রমাণ করল সেই করোনা ভাইরাস। এক শিক্ষিকা ৪৫ মিনিটে ৩০০$ উপার্জন করে ফেললেন! তাও কিনা সৎ পথে ঘরে বসে! এমনটাই ঘটিয়েছেন লিলি ওউগ।

বেজিং এর এই শিক্ষিকা বাড়ি থেকে ছাত্র পড়ানো শুরু করেন। কারণ ছেলেপুলেরা এখন স্কুলে যেতে পারছে না। তাদের পঠন পাঠনের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। এমন অনেক পড়ুয়া আছে যারা গৃহশিক্ষক ছাড়া পড়তেই পারে না। গৃহশিক্ষক শিক্ষা ব্যবস্থার এবং নীরবে শিক্ষা পদ্ধতির ভিত্তি গঠনকারী এক শিক্ষা উপাদান। UNESCO ২০১৪ র সমীক্ষায় বলেছিল, প্রাইভেট টিউশনি শিক্ষার্থীর মনন মস্তিষ্ক কার্য ক্ষমতা এবং প্রতিযোগিতা মূলক পরীক্ষার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করে। মাস্টারমশাই কথাটা মনে আসলে, ম স্কুলের পাশাপাশি কোনও এক তথাকথিত চাকরি খোঁজা বা খুঁজতে খুঁজতে হাঁফিয়ে পড়া বা স্বাধীন শিক্ষায় বিশ্বাসী কিন্তু অতি জনপ্রিয় গৃহশিক্ষকের মুখ মনে আসবেই। UNESCO র হিসাবানুযায়ী ২৯টি দেশের ছাত্র ছাত্রীরা অনেকাংশেই প্রাইভেট টিউটরমুখী। মোট প্রাইভেট টিউটরপ্রেমী ছাত্র সংখ্যা নেহাতই কম নয়, প্রায় ৩৯১.৫ মিলিয়ন! শুধু চিনের লিলি ওউগ নয়, সব সামাজিক দূরত্ব মেনে নিজের বাড়িতে বসে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে গৃহশিক্ষক রমরমিয়ে ছাত্র পড়াচ্ছেন ফিলিপিনস–এও। ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই প্রাইভেট টিউশনের নানান অনলাইন ক্লাস চলছে, তার মধ্যে 51 talk of China online Education Group ( GOE.N) এবং Rare Job অত্যন্ত জনপ্রিয়। প্রতি মিনিটের জন্য মূল্য ধার্য হচ্ছে ৬.৩৬$। বাড়ি গিয়ে কড়া নেড়ে ছাত্র পড়ানোর চল ওসব দেশে নেই।

প্রাইভেট টিউশন বলতে যে চিত্র আমরা বাঙালিরা বুঝি, টানা বারান্দায় কিচির মিচির শব্দ বা বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়ানো। টিউশনির স্যারেরা শিক্ষিত বা উচ্চশিক্ষিত হয়েও এ রাজ্যে বা এ দেশেও বলা ভালো অনেকটাই অসংগঠিত ক্ষেত্রের মতো কাজ করছেন। নামকরা ট্রেনিং সেন্টার বা কোচিং স্কুল ছাড়া বাকি যারা গৃহশিক্ষক তারা ই-ক্লাস বা ভিডিও কনফারেন্স–এসব কিছুরই তেমন একটা সাহায্য বোধহয় পান না। বিশেষ করে মফস্বল অঞ্চলের গৃহশিক্ষকদের এ মুহূর্তে বেশ কঠিন দিন চলছে। যারা কেবলমাত্র গৃহশিক্ষকতা করেই দিন গুজরাতেন তাদের বেতন যদি বন্ধ থাকে তাহলে তা চূড়ান্ত দুশ্চিন্তার বিষয়। “যদি” শব্দটাই ব্যবহার করতে হলো, কারণ বেতন দেওয়া বা না দেওয়া নির্ভর করে ছাত্রের পরিবারের আর্থিক ক্ষমতা ও মানসিক রুচির উপর। এরা না পারবেন আইনী দাবি করতে না পারবেন মৌন মিছিল করতে। সামাজিক দূরত্বের জন্য তাদের পড়ানো আপাতত স্হগিত। মাইনে তথৈবচ।

এই মহামারীতে যে সব দেশ বেশি কাবু তারাই টিউটরদের উপর দূর ই- টিউশনিতে সন্তানের লেখা পড়ায় নিশ্চিত। কিন্তু এখনও এই দিকটায় আমাদের কিছু টা ঘাটতি আছে। আর্থিক ভাবে যারা সামর্থ্য তারা যেন মানসিক ভাবেও সামর্থ্য হন গৃহশিক্ষকের পুরো বেতন দিতে। সমীক্ষায় দেখা গেছে গৃহশিক্ষক নির্ভরতা পশ্চিমবঙ্গে সর্বোচ্চ। প্রতি পাঁচ জনের চারজনই গৃহশিক্ষকমুখী। গৃহশিক্ষকদের কথা এ রাজ্যে ক’বার ভাবা হয়েছে! তাঁরা যে শিক্ষক। না পারছেন ত্রান নিতে না পাচ্ছেন মাইনে। সামাজিক দূরত্ব মেনে কি বিউটি পার্লার খোলা যায়? যদি যায়, তাহলে কেন কোচিং ক্লাস নয়? অভাবের তাড়নায় ইতিমধ্যেই এ রাজ্যের এক গৃহশিক্ষক আত্মহত্যা করেছেন। এই শিক্ষকদের দ্বারাই ছাত্র মনন বহু ক্ষেত্রে লালিত পালিত হয়। তাহলে আজ কেন তাঁরা বঞ্চিত?

পশ্চিমবঙ্গ গৃহশিক্ষক কল্যাণ সমিতি নানা ক্ষেত্রে গৃহশিক্ষকদের নানা দাবিতে সরব। ২০১৯ এ সরকারী স্কুলের শিক্ষকদের টিউশনি বন্ধের দাবিতে তারা সরব ছিলেন। রাজ্যের সরকারি স্কুলের পঠন পাঠনের চূড়ান্ত অবনতির ফলেই এবং গত এক দশক ধরে স্কুল সার্ভিস কমিশন এ রাজ্যে নতুন শিক্ষক নিয়োগে স্লথতা প্রদর্শন করলে একদিকে যেমন প্রাইভেট টিউটরের প্রয়োজন রমরমিয়ে এ রাজ্যে, তেমনই বেকারত্বের ফলে টিউটরের সংখ্যাও বাড়ন্ত। শিক্ষক শূন্যতা নিয়ে চলা স্কুলগুলিতে ছাত্রদের আগ্রহ কম। গত চার বছর আগেই এ রাজ্যের ছাত্র শিক্ষক অনুপাত ছিল লজ্জার ও চিন্তার, ১:৬০। তাই এই খরা কাটাতে এক মাত্র উপায় গৃহশিক্ষক।

গৃহশিক্ষক এ রাজ্যে কতটা মান পাচ্ছেন? এ রাজ্য কিন্তু গৃহশিক্ষকের মানের ইতিহাস জানে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মালতী পুঁথিতে কয়েকটি অনুবাদ পাওয়া যায়। যার মধ্যে “ম্যাগবেথ” বিখ্যাত। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গৃহশিক্ষক জ্ঞানচন্দ্র ভট্টাচার্যের নির্দেশ ও সহযোগিতায় ঐ তর্জমা করেন। আমরা যেন গৃহশিক্ষককে শুধু “প্রয়োজন” বলেই না জানি। তাঁরা অনেক সাফল্যের না জানা, না জানানো রহস্যের চাবি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here