…তাহলে, সেদিন গোপাল কৃষ্ণ গান্ধী কি তৃণমূলের দালালি করেছিলেন?

রজত মুখার্জী

আমাদের ভারত, ৭ জুন:
চিত্র ১.
বাংলায় কমিউনিষ্ট শাসনের শেষ লগ্নে ২০০৬ সালে বিধানসভা নির্বাচনে ২৩৫ টি আসন নিয়ে বাংলার মসনদে ফের আসীন হয়েছিল তথাকথিত স্বঘোষিত মেহনতি মানুষের সরকার– সপ্তম বামফ্রন্ট সরকার।

তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন বামেদের ২৩৫টি আসনের অহংকার বাংলার রাজনীতিতে একটি নতুন সমীকরণ তৈরী করে “আমরা ওরা” যা পশ্চিমবঙ্গবাসীকে আড়াআড়ি ভাবে দ্বিখন্ডিত করেছিল।

বাংলায় শুরু হলো বিরোধীদের কন্ঠরোধ, মহিলাদের উপর অত‍্যাচার, সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে অনিচ্ছুক চাষিদের জমিদখল, নেতাইয়ে গণহত‍্যা, গড়বেতায় কঙ্কাল কান্ড, তাপসী মালিক ও রিজওয়ানুর রহমান হত‍্যাকান্ড সহ একাধিক অনভিপ্রেত ঘটনা সমূহ। সেদিন বামফ্রন্ট সরকারের বিভিন্ন ব‍্যর্থতার বিরুদ্ধে সোচ্চার কন্ঠে প্রতিবাদ করেছিলেন তৎকালীন রাজ‍্যপাল শ্রদ্ধেয় গোপাল কৃষ্ণ গান্ধী। ২০০৭ সালে নন্দীগ্রাম কান্ডের পর ছুটে গিয়েছিলেন সেখানে। বলেছিলেন, ‘হাড় হিম করা সন্ত্রাস” যে শব্দবন্ধ আজ ২০২১–এ আবারও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে বাংলার আকাশে বাতাসে।

লোডশেডিংয়ে বাংলার মানুষের দুর্দশা অনুভব করবার জন‍্য তিনি তিন ঘন্টা রাজভবনে বিদ‍্যুৎ পরিষেবা বন্ধ রেখেছিলেন, আর সেইদিন তাঁর এই প্রতিবাদী মনুষত্বের জন‍্য তৎকালীন শাসক দল কমিউনিষ্টদের অকথ‍্য ভাষার আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছিল। হতে হয়েছিল নানাবিধ মানসিক হেনস্থার শিকার। আর সেদিনের বিরোধী দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ‍্যপালের প্রতিবাদী মনুষত্বকে নতমস্তকে কুর্ণিশ জানিয়েছিলেন। এখানেই থেমে না থেকে রাজ‍্যপালের পক্ষ নিয়ে, তাঁর বিরুদ্ধে কুরুচিকর আক্রমণ করায় বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে পথে নেমেছিলেন সেদিনের বাঙালীর অগ্নিকন্যা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

চিত্র ২.

আর আজ যখন সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূলের শাসনকালে চর্তুদিকে খুন, ধর্ষণ, লুটপাঠ, সন্ত্রাস, অত‍্যাচারের রাজনীতি চলছে, মানুষ পশ্চিমবঙ্গ থেকে পালিয়ে অসমের ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নিচ্ছে। সস্তায় মেরুদন্ড বন্ধক রাখা একশ্রেণির স্তাবক মিডিয়ার নীতিহীনতায় সাধারণ মানুষ যখন প্রকৃত ঘটনা জানতে পারছে না, তখন পরিত্রাতা রূপে মহামহীম রাজ‍্যপাল জগদীপ ধনকড় তৃণমূলের রক্তচক্ষুর কাছে মাথা নত না করে যেখানেই অত‍্যাচার হচ্ছে সেখানেই তিনি পৌঁছে যাচ্ছেন, মানুষের মনে সাহস যোগাচ্ছেন, প্রকৃত ঘটনা মানুষের কাছ থেকে জেনে, তথ্য প্রমাণ সহ তুলে ধরছেন মিডিয়া তথা কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন সরকারের কাছে। আর্তদের কাতর আর্তনাদে বিবশ রাজ‍্যপালের চোখ থেকে বর্ষিত অবাধ বারিধারা বাঙ্গালীর চোখ এড়িয়ে যায়নি, তাই তো আজ কোটি কোটি বাঙ্গালী শ্রদ্ধায়, ভালবাসায় আবেগে মথিত হয়ে আপন করে নিয়েছে মাননীয় ধনকড় মহাশয়’কে।

আর শাসকের কুর্কীতি যখন ধীরে ধীরে ফাঁস হতে শুরু করেছে, তখন এই তৃণমূল সরকারের দ্বিচারিতা মানুষ মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে শুরু করেছে। উঠতে বসতে শাসক দলের ছোট, মেজো, সেজো নেতারা রাজ‍্যপালকে অকথ‍্য ভাষায় গালাগাল দিচ্ছেন, রাজ্যপালের বিরুদ্ধে নানাবিধ কুৎসা করছেন, এমনকি রাজ্যপালের মত সংবিধান স্বীকৃত একজন উচ্চ পদাধিকারীকে বিজেপির দালাল বলে আক্রমণ করতেও পিছপা হচ্ছেন না। এ দৃশ্য শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই সম্ভব যে তৃণমূল আশ্রিত গুন্ডা বাহিনী দিয়ে নিজের রাজ্যের রাজ্যপালকেই কালো পতাকা দেখিয়ে গো-ব‍্যাক স্লোগান দেওয়ানো হচ্ছে। এর পরে যদি বলা হয় যে পশ্চিমবঙ্গে আইনের শাসন ভূলুন্ঠিত, তাহলে কি বিন্দুমাত্র অতিশয়োক্তি হবে?

একবার ভাবুন, সেদিনের রাজ‍্যপাল শ্রী গোপালকৃষ্ণ গান্ধী এদের কাছে ছিলেন রক্ষাকর্তা ঈশ্বর প্রতীম, আর আজকের কর্তব্য পরায়ণ নীতিনিষ্ঠ রাজ‍্যপাল শ্রী জগদীপ ধনকড় হলেন এদের কাছে বিজেপির দালাল, নির্লজ্জ, বেহায়া, একজন বৃদ্ধ ব‍্যক্তি। নীতিপঙ্গুত্বে ভোগা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল দলটির রাজনৈতিক অধঃপতনটা একবার লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

খুব স্বাভাবিক ভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে, তাহলে, সেদিন গোপাল কৃষ্ণ গান্ধী কি তৃণমূলের দালালি করেছিলেন? উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম মাননীয়া।

পরিশেষে বলি, পাপ বাপকেও ছাড়ে না। সেদিনের উদ্ধত বামফ্রন্ট আজকে শূণ‍্যে পরিণত হয়েছে আর এই শাসকদলও অচিরেই ক্ষয়প্রাপ্ত হবে, সেদিন বেশি দুরে নয। গণতন্ত্রে জনগণই যথোপযুক্ত সাজা দেন কারণ আমরা জানি, অতি দর্পে হত লঙ্কা।

মাননীয়া কে বলতে চাই, সমুদ্রে আপনি যাই ফেলবেন, সমুদ্র আপনাকে সেটাই একদিন ফেরত দেবে। What goes around comes around, এটাই প্রকৃতির নিয়ম।
( তথ্য ও মতামত লেখকের নিজস্ব, এজন্য আমাদের ভারত দায়ি নয়।)

1 টি মন্তব্য

আপনাদের মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here