ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অনশন ধর্মঘটে সামিল হয়ে জেলে গিয়েছিলেন বলিউডের ট্র্যাজেডি কিং দিলীপ কুমার

আমাদের ভারত, ৭ জুলাই : তিনি কিংবদন্তি। তিনি বলিউডের প্রথম “খান”। কিন্তু বলিউডের ট্র্যাজেডি কিং যে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনেও সামিল হয়েছিলেন তা হয়তো অনেকেই জানেন না। ব্রিটিশ বিরোধী ভাষণ দেওয়ার জন্য তাকে বন্দিও হতে হয়েছিল।

দিলীপ কুমার ব্রিটিশ বিরোধী রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। অভিনয় জীবনে আসার আগে তিনি ব্যবসা শুরু করেন। একটি ক্যান্টিন চালাতেন ভারতীয় সিনেমার সর্বকালের এই সেরা অভিনেতা। পুনেতে ক্যান্টিনে কাজ করার সময় ব্রিটিশ বিরোধী ভাষণ দিয়েছিলেন তিনি। আর তার জন্য তাকে জেলে যেতে হয়েছিল। জেল বন্দী সত্যাগ্রহ আন্দোলনকারীদের সঙ্গে তিনিও অনশন ধর্মঘটে যোগ দেন ফলে তাকেও অন্যান্য সত্যাগ্রহীদের মত নেহেরু অনুগামীদের দলে ধরে নেওয়া হয়।

বুধবার সকালে দীর্ঘ রোগ ভোগের পর বলিউডের এই প্রবীণ অভিনেতা পাড়ি দিলেন ফিরে না আসার দেশে। সকাল ৭.৩০ টা নাগাদ মুম্বাইয়ের হিন্দুজা হাসপাতালে প্রয়াত হন তিনি। মৃত্যু কালে তার বয়স হয়েছিল ৯৮ বছর। বর্ষিয়ান এই অভিনেতার প্রয়াণে শোকস্তদ্ধ বলিউড সহ দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্র। ডাক্তার জলিল পার্কার জানিয়েছেন, গত তিন-চার মাস থেকেই তিনি ফুসফুস এবং হৃৎপিন্ড সংক্রান্ত অসুস্থতায় চিকিৎসাধীন ছিলেন। প্রোস্টেট ক্যান্সারের কারণে তাঁর শরীরের অন্যান্য অঙ্গগুলি গুরুতর ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। তাই তিনি চিকিৎসায় সারা দিলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো গেলনা।

বলিউডের ‘ট্র্যাজেডি কিং’ দিলীপ কুমারের আসল নাম মহম্মদ ইউসুফ খান। বলিউডের প্রথম খান তিনি। নিজের জীবনের বহু অজানা কথা ও ঘটনার বর্ণনা তিনি করেছেন তাঁর আত্মজীবনী ‘দিলীপ কুমার; দ্য সাবস্ট্যান্স এন্ড দ্য শ্যাডো’-তে।
তিনি জানিয়েছেন, তাঁর ইচ্ছা ছিল ব্যবসায়ী হওয়ার। তাই পড়াশোনা শেষ করে তিনি পুণেতে একটি ক্যান্টিন শুরু করেন। পরে রোজগার বাড়ানোর তাগিদে চলে যান বোম্বেতে। এবং বিভিন্ন ভাষায় দক্ষতার জন্য বোম্বে টকিজে যুক্ত হন চিত্রনাট্য লেখা এবং ছবি বাছাইয়ের কাজে। সেখানেই সাক্ষাৎ হয় প্রযোজক দেবিকা রানীর সাথে। তাঁর পরামর্শেই অভিনেতা নাম পরিবর্তন করে অভিনয় জগতে পদার্পণ করেন। কিন্তু কাছের মানুষের কাছে তিনি বরাবর ইউসুফ হয়েই থেকেছেন।

১৯৪৪ সালে তাঁর প্রথম ছবি ‘জোয়ার ভাটা’ সেভাবে সাফল্য না পেলেও ১৯৪৭ এর ‘জুগনু’ প্রথম হিট হয় এবং ১৯৪৯ সালের ‘আন্দাজ’ দিলীপ কুমারকে চলচ্চিত্র জগতে প্রতিষ্ঠিত করে। তাঁর পর তিনি মুঘল-এ-আজম, নয়া দৌর, গঙ্গা যমুনা, দাগ, দেবদাস, , ক্রান্তি, মশাল সহ ৬৫টিরও বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি । তাঁর মধ্যে রয়েছে ‘রাম অর শ্যাম’ এর মত কমেডি ছবিও । এছাড়া নৌকাডুবি, সাগিনা মাহাতো এবং পারি-র মত বাংলা ছবিও করেছেন তিনি।

একসময় তিনি ব্রিটিশ পরিচালক ডেভিড লিনের অফার ফিরিয়ে দেন। আবার এলিজাবেথ টেলরের বিপরীতে কাজ করারও সুযোগ পেয়েছিলেন অভিনেতা কিন্তু তা সফল হয়েনি। ১৯৯৮ সালে তাঁর শেষ ছবি ছিল ‘কীলা’।

বলিউডের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ এই অভিনেতা সেরা অভিনয়ের জন্য পেয়েছেন ৮ টি ফিল্মফেয়ার পুরষ্কার। এমনকি সেরা অভিনেতা হিসাবে প্রথম ফিল্মফেয়ার পুরষ্কার তিনিই পেয়েছেন। এছাড়া ভারতীয় অভিনেতা হিসাবে সর্বোচ্চ পুরষ্কার বিজয়ী হিসাবে গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসেও নাম রয়েছে তাঁর। ১৯৯৪ সালে দাদাসাহেব ফালকে সহ ১৯৯১ সালে পদ্মভূষণ এবং ২০১৫ সালে পদ্মবিভূষণ সম্মানেও ভূষিত হন। এছাড়া পাকিস্থানের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ‘নিশান-এ-ইমতিয়াজ’ প্রদান করা হয় তাঁকে।
দিলীপ কুমার তাঁর অভিনয় এবং চলচ্চিত্র নিয়ে যতটা চর্চিত ছিলেন ততটাই চর্চিত ছিলেন তাঁর ব্যক্তিগত জীবন। প্রখ্যাত অভিনেত্রী মধুবালার সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক বেশ চর্চিত বিষয় ছিল যার উল্লেখ দিলীপ কুমার তাঁর আত্মজীবনীতেও করেছেন। অভিনেতার প্রেম ও বিবাহের সম্পর্ক নিয়ে বহু জল্পনা শোনা গেলেও সায়রা বানুর সঙ্গে তাঁর বৈবাহিক জীবন কেটেছে পাঁচ দশকের বেশি, অভিনেতার জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত। ভারতের রাজনীতিতেও তিনি ছাপ রেখেছেন। ১৯৮০-৮১ সালে তাঁকে মুম্বাইয়ের শেরিফ ঘোষণা করা হয়। তিনি ২০০০ সালে রাজ্যসভার সদস্য হয়েছিলেন।

তাঁর এই বর্নময় জীবন ও তাঁর অভিনয় চিরকাল মাইলফলক হয়ে থাকবে মানুষের মনে।

আপনাদের মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here