সাংবাদিকদের কাছে প্রত্যাশা

অশোক সেনগুপ্ত
আমাদের ভারত, কলকাতা, ২৫ জানুয়ারি: উত্তরবঙ্গ সফরে গিয়ে গত ২৭ অক্টোবর ভুয়ো সাংবাদিক নিয়ে সরব হয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুধুমাত্র ফেসবুক পেজ অথবা ইউটিউব চ্যানেল তৈরি করে যাঁরা নিজেদের সাংবাদিক বলে দাবি করেন, তাঁদের বিরুদ্ধে পুলিশকে পদক্ষেপ করতে বলেন তিনি। অন্যদিকে, কারা সাংবাদিক হতে পারবে, বাংলাদেশ সরকার তার একটা মানদন্ড তৈরি করার বিষয় বিবেচনা করছে। গত ১৭ জানুয়ারি প্রকাশ্যেই এ কথা জানিয়েছেন ওদেশের তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ।

ভারতে বিষয়টা কতটা প্রাসঙ্গিক? পরিসর বেড়ে যাওয়ায় এখন প্রচুর সাংবাদিক। শিক্ষকতা/পিএইচডি করার বিধি কঠোর হয়েছে। বিভিন্ন ধরণের পরীক্ষা চালু হয়েছে অন্য পেশায় ঢুকতে গেলে। সাংবাদিকতায় আসার জন্য কি সেরকম কিছু ভাবা উচিত? কিভাবে বাছাই করা যেতে পারে সাংবাদিকদের? এই পর্বে শিক্ষাগত যোগ্যতা বা কোন বিষয় কতটা মানদন্ড হতে পারে? কী প্রত্যাশা সাংবাদিকদের কাছে? এই প্রশ্ন রেখেছিলাম সমাজের বিভিন্ন স্তরের অভিজ্ঞদের কাছে। তাঁদের কিছু মতামত।

“আমরা এখন মিথ্যাসর্বস্ব পৃথিবীতে বাস করি“
—ডঃ বাসব চৌধুরী
গবেষক-শিক্ষাবিদ

আমার প্রশ্ন হল, শিক্ষা কি সাহস ও সততা দেয়? দিলেও সমাজ কি তা গ্রহণ করে? সমাজকে তো সত্যকে গ্রহণ করার মতন নমনীয় হতে হবে। একজন সাংবাদিক দারুণ সৎ, দারুণ লেখেন, সত্য তুলে ধরেন, কিন্তু সংবাদপত্রের মালিক ওসব সত্য কথা লিখতে দেবেন না। কী হবে তখন সাংবাদিকের? দেখুন, ব্যক্তিগত সততা মূল্যহীন যতক্ষণ না তা সামাজিক সততার সঙ্গে মেলে। সমাজ যদি সার্বিকভাবে সততা না দেখায়, ব্যক্তি মানুষ তাঁর সততা নিয়ে ক্রমশ একা হয়ে যাবেন। আমাদের দেশে বিদ্যাসাগর তার উদাহরণ। তথাকথিত ভদ্র সমাজে মেলামেশা করে বিদ্যাসাগর সেই সমাজের মিথ্যাটা আবিষ্কার করেছিলেন। তারপর আর সেই সমাজকে তাঁর ভাল লাগেনি। সহজ সরল সাঁওতালদের মধ্যে থেকে খানিকটা শান্তি খুঁজেছিলেন তিনি। শিক্ষা নয়, পরীক্ষা নয়, সত্য-আশ্রিত জীবন যতক্ষণ না মূল্য পাচ্ছে, ততক্ষণ কোনো পেশাই আকর্ষণীয় হবে না। আমরা এখন মিথ্যাসর্বস্ব পৃথিবীতে বাস করি। বড় বড় ডিগ্রিধারীরা সোজা কথায় ধান্দাবাজ। ধান্দাবাজ দিয়ে সমাজ নির্মাণ করা যায় না। তাই আদৰ্শবান মানুষের কথা না বলাই ভাল। ধান্দাবাজরা করে খান। সাধারণ মানুষের পেটে লাথি ও লাঠি পড়ুক। এই ভাবে চলতে চলতে যদি কখনো পরিস্থিতি বদলায়, আপাতত এমনই। দেখুন আপনার সাংবাদিক সত্তা লিখে কিছু করতে পারে কি না? কম তো দেখলাম না। ভাল লেখাই শেষ কথা নয়। ভাল লেখা সমাজ গঠন করবে, সেইটা বড় কথা। এখন তেমন সমাজের কথা ভাবতে পারছি না। শিক্ষিত ভদ্রলোক– এই তো এই তো, তা বেশ তা ভাল করে কাটিয়ে দিচ্ছেন। রাজপ্রাসাদ ও রাজপ্রসাদ জুটছে। ভালই তো। এই বাজারে সাংবাদিক কিছু করতে পারবেন না। তাঁকেও তো করে খেতে হবে। সুতরাং তোমার পাঁঠা তুমি কাটো। আপনি বাঁচলে বাপের নাম।

আর একটা ব্যাপার। লেখককে স্বশিক্ষিত হতে হবে। যে কোনো সুশিক্ষিত মানুষই স্বশিক্ষিত। আর সাংবাদিকের দরকার ইন্টিগ্রিটি। এইখানে চলমান সমাজের সঙ্গে সাংবাদিকের বিরোধ। আপনি কি খুব শিক্ষিত মানুষকে লেখক হিসেবে পান? তিনি তাঁর নিজের জায়গায় করে খাবেন। কিন্তু পরীক্ষা নিলেই ভালো সাংবাদিক পাবেন, বাছাই করা….আমি জানি না এমন সম্ভব কি না? তবে হ্যাঁ, প্রযুক্তি যদি লাগে, শিখতে হবে। কম্পিউটার প্রয়োগ জানতে হবে।
(একটি নামী প্রতিষ্ঠানের অধ্যাপক, প্রাক্তন উপাচার্য)
***

“সাংবাদিকের লেখাপড়া করাটা একান্ত দরকার“
তরুণ গোস্বামী
সাংবাদিক

প্রথমেই বলি আমাদের একটি বিষয় পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন, পড়াশুনা এবং লেখাপড়া। একেবারে ছোট বয়েস থেকে কোনো বিষয় নিয়ে গবেষণা করে ডিগ্রি পাওয়া বা কোনো পরীক্ষায় পাশ করে চাকরি পাওয়া এগুলো হচ্ছে পড়াশুনো। আর লেখাপড়া হচ্ছে যা সিলেবাসে নেই, সেই বিষয়গুলো পড়া।

সাংবাদিকতা করতে গেলে লেখা পড়া করাটা খুব জরুরী। আর কোনো পেশাতেই এত কিছু জানতে হয় না। একজন সফল চিকিৎসক বা অ্যাকাউন্ট্যান্ট বা ইঞ্জিনিয়ার হয়তো ভারতীয় সংবিধানের কিছুই জানেন না, মাধ্যমিক স্তরের পরে এ বিষয় আর পড়েননি, কিন্তু একজন সাংবাদিককে সংবিধান জানতে হবে। আতিমারির সময় ভাইরাস কী, তার কাজ কী জানতে হবে। ট্রেন দুর্ঘটনা কভার করতে গেলে, রেল ব্যবস্থার খুঁটি নাটি জানতে হবে। এই জন্য সাংবাদিকের লেখা পড়া করাটা একান্ত দরকার কারণ এত বড় ক্যানভাস নিয়ে আর কোনো পেশাতে চলতে হয় না।

পৃথিবী খুব দ্রুত গতিতে পাল্টে যাচ্ছে আর সঙ্গে তাল মেলাতে হলে প্রশিক্ষণ খুব প্রয়োজনীয়। আমার মনে হয় সাংবাদিকের চাকরিতে নেবার সময় দুটি জিনিস দেখা দরকার, তার ভাষা জ্ঞান আর যে শহরে সে কাজ করতে চাইছে সেই শহর এবং রাজ্যটির বিষয়ে সে কতখানি জানে। আমি বহু সামাজিক ভাবে সফল মানুষকে জানি যারা পশ্চিমবঙ্গে কতগুলো জেলা, কত গুলো গ্রাম বা ব্লক জানেনই না। এতে তাদের পেশা কোনো ভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, তাই জানবার চেষ্টা করেন না।

সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ একান্ত জরুরি। তাদের দেখার চোখ তৈরি করে দিতে হয় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে। কিভাবে তাড়াতাড়ি লিখতে হয়, হেডিং দিতে হয় খবরের তাও শেখানো উচিত। এখন একটি বিরাট সংখ্যক সাংবাদিকের লেখা পড়া নেই। ফলে খবর পরিবেশনে কোনো বৈচিত্র্য নেই।
আমাদের দেশের বৈদ্যুতিন মধ্যম এবং প্রিন্ট মিডিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা কমছে শুধু মাত্র সাংবাদিকদের একটি বিরাট অংশ প্রশিক্ষণ পায়নি বলে।
(কলকাতার ‘মিলেনিয়াম পোস্ট’-এর রেসিডেন্ট এডিটর)।
***

“যে কেউ এসে এই পেশার মর্যাদা খারাপ করছে”
—ডঃ প্রবীর দে
অর্থনীতিবিদ

সাংবাদিকরা সেই পেশার সাথে যুক্ত যাঁদের মাধ্যমে আমরা সমাজকে দেখি। অত্যন্ত এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকে সাংবাদিকদের। সমাজের চোখে সাংবাদিকরা হলেন সৎ ও ধার্মিক ব্যক্তি। তাঁরা জনসাধারণকে ঘটনা, সমস্যা এবং কীভাবে সেগুলো জীবনকে প্রভাবিত করে সে সম্পর্কে শিক্ষিত করেন। তাই সর্বদা সাংবাদিকতার মান বজায় রাখার চেষ্টা হয়। যেমন ইংল্যান্ডে বেশিরভাগ চাকরির জন্য ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর দ্য ট্রেনিং অফ জার্নালিস্ট (এনসিটিজে) দ্বারা স্বীকৃত যোগ্যতা প্রয়োজন। আমাদের এখানে সেরকম যোগ্যতার দরকার হয় না। সময়ের সাথে সাথে আমাদের পরিবর্তনের প্রয়োজন। সাংবাদিক হতে গেলে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে ভালো। অন্তত একটা মান থাকতেই হবে। তা নাহলে যে কেউ এসে এই পেশার মর্যাদা খারাপ করবে এবং সেটাই হচ্ছে। মান ঠিক রাখতে পারলে, এই পেশাটাই উপকৃত হবে। ভালো ছেলে মেয়েরা এই পেশার সাথে যুক্ত হতে পারবে। উৎকর্ষতা বাড়বে। এই পেশার প্রতি লোকের শ্রদ্ধা বাড়বে। সেই সঙ্গে নিজস্ব পরিচয় থাকতে হবে। আর সেটা তখনই তৈরি হবে যখন প্রতিষ্ঠানগুলো এক হয়ে দেখভাল করবে সংবাদপত্রসেবীদের।

এ ছাড়া, হাতে মুঠোফোন এসে যাওয়াতে আজ ইউ টিউব ও অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া যেমন ফেসবুকেও কুটিরশিল্পের মত সংবাদ পরিবেশিত হচ্ছে। ঘরে ঘরে সাংবাদিক তৈরি হয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে নিয়ে এইসব সাংবাদিকের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সংবাদ পরিবেশন হয় যার কোনো সামাজিক দায় দায়িত্ব থাকে না। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে এইসব চ্যানেলের কোনো মানদণ্ড নেই। সাংবাদিকরা সামান্য পয়সার জন্যে এই সব করে থাকেন। এতে খবর থাকে না। সোশ্যাল মিডিয়া কর্তৃপক্ষের আরো বেশি দায়িত্বশীল হওয়া উচিত।
(অধ্যাপক- রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম ফর ডেভলপিং কান্ট্রিজ, নয়াদিল্লি)
***

“শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রয়োজন তবে প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না“
— ড: আবীর কুমার গড়াই
সংগ্রহশালা বিশারদ।

আসলে সবটাই বিশ্বাস। কথাটি শুনতে দার্শনিক মনে হলেও কিন্তু সত্য। খবরের কাগজই বলি বা টেলিভিশনে খবরের বিভিন্ন চ্যানেল, আমরা বিশ্বাস করি যে যা পড়ছি, দেখছি বা শুনছি তা সত্য। তাই খবরের কাগজ বা টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখি। বিশ্বে প্রতিদিনই তো সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, শিক্ষা ইত্যাদি ক্ষেত্রে কিছু না কিছু ঘটনা ঘটে থাকে এবং সংবাদমাধ্যমের সহযোগেই সেই সংক্রান্ত তথ্য আমরা ঘরে বসে পেয়ে থাকি, আর তাতে কোনো সন্দেহ নেই যে তা সম্ভব হয়ে থাকে সাংবাদিকদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই। যে কোনও ক্ষেত্রেই সংবাদ পরিবেশনের জন্য যেটি অবশ্য প্রয়োজন, তা হল তথ্য সংগ্রহ করে সঠিক পদ্ধতিতে জনগণের কাছে উপস্থাপন করা, তবে এর থেকেও যে বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয় সেটি হল বিভিন্ন বিষয় বা ঘটনার গুরুত্ব অন্বেষণ করে তা যথাযথ ভাবে প্রকাশ করার দক্ষতা। তাই সাংবাদিক নিয়োগের ক্ষেত্রে বাছাইয়ের অবকাশ থেকেই যায়। ইন্টারনেটের দৌলতে বর্তমানে বিশ্ব মানুষের হাতের মুঠোয়, এই রকম সময়ে যেকোনও খবর পরিবেশনের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের আরও বেশি সচেতন ও দক্ষতা সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন। তাই যে কোনও শিক্ষানবিশ সাংবাদিক নিজের কর্মজীবন শুরু করার আগে সেই দক্ষতা সম্পন্ন কিনা তা জানা দরকার। তবে এটাও ঠিক যে পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি সাংবাদিকতায় আবেগ ও ভালোবাসারও প্রয়োজন হয়। তা না হলে সংগৃহিত তথ্য থেকে পরিবেশিত তথ্যের যে প্রক্রিয়া, সেটি অপূর্ণ থেকে যায়। তাই সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও অন্যান্য কর্মক্ষেত্রের ন্যায় নূন্যতম শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রয়োজন হলেও ক্যাট, ক্ল্যাট, নেট, গেট, সেটের মত কোনো প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।
(পরামর্শদাতা, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ইনস্টিটিউট অফ এশিয়ান স্টাডিজ, কলকাতা।)
***

“নেশাটাই শেষ কথা“
— প্রদীপ মল্লিক, চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট

প্রতিযোগিতা মূলক পরীক্ষা কোনও দিন কোনও পেশার ক্ষেত্রে শেষ কথা নয়। কেবল মাত্র শুরুর কথা। তাহলে ডাক্তারি পাশ করে কেউ গান করতে যেতেন না বা চার্টার্ড একাউন্টেন্ট লেখক হতেন না। কোনও কোনও পেশায় না শিখে দাঁত ফোঁটানো যাবে না। দুটো পেশায় নেশাটাই শেষ কথা— এক সাংবাদিকতা (গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ ) ও দ্বিতীয় পলিটিক্স (জনগণের কথাই শেষ কথা)। এ দুটোয় প্রতিযোগিতা মূলক পরীক্ষা আবশ্যিক নয়। সাংবাদিকতায় শিক্ষাগত যোগ্যতা, জ্ঞানের পিপাসা, আপোষহীন মনোভাব ও সত্য ও নীতিকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখার চারিত্রিক বৈশিষ্টই যথেষ্ট। সেটা নিয়োগকর্তা অবশ্যই যাচাই করে নেন। পরীক্ষা দিয়ে চরিত্র গঠন করা সম্ভব নয়। চরিত্র গঠন করে সমাজ ও পরিবার।

সব কিছুই আপন মনের মাধুরী মিশায় পরিবেশিত হয়। নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা প্রায় না হওয়ারই সমান। তাই যা চলছে ভালই চলছে সত্য অর্ধসত্য ও অসত্যের সহবস্থান। আর এ পোড়ার দেশে শাস্তি হয় না।
(একটি নামী সংস্থার আর্থিক পরামর্শদাতা)।
***

আপনাদের মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here