জৈব চাষের জন্য গোপালী’তে প্রশিক্ষণ দেওয়া হল কৃষকদের

মিলন খামারিয়া
আমাদের ভারত, গোপালী, পশ্চিম মেদিনীপুর, ২২ জুন: খনার বচনে আছে -‘খনা বলে শুন কৃষকগণ।
হাল লয়ে মাঠে বেরুবে যখন।
শুভ দেখে করবে যাত্রা।
না শুন কানে অশুভ বার্তা।
ক্ষেতে গিয়ে কর দিক নিরুপণ।
পূর্ব দিক হতে হাল চালন।
নাহিক সংশয় হবে ফলন।’

সত্যিই কৃষকগণ কারো কথা না শুনে হাল চালিয়ে কঠিন মাটি ভেঙ্গে ফসল ফলান। সেই ফসলে দেশের মানুষের পেট ভরছে। ভারতের অন্নদাতা’রা উনিশশো ষাটের দশকে ভারতের কৃষি বিজ্ঞানীদের পরামর্শ মতো ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য চাষের জমিতে জৈব সারের সাথে সাথে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা শুরু করেন। তাতে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং নব্বই-এর দশকে ভারতে খাদ্যের ঘাটতি মিটে যায়।

কিন্তু খাদ্যের ঘাটতি মিটলেও দেখা দেয় অন্য সমস্যা। জমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করার ফলে উৎপাদিত ফসলে মিশে যায় বিষ। খাবারে মিশে থাকা বিষে দেশের মানুষের দেবাদিদেব মহাদেবের মতো ‘নীলকন্ঠ’ হবার যোগাড়।ভগবান শিব সমুদ্র মন্থনে উত্থিত বিষ নিজ কন্ঠে ধারণ করে পৃথিবীকে বিষ মুক্ত করেছিলেন। কিন্তু ফসলে দেওয়া বিষ থেকে মানুষকে রক্ষার দায়িত্ব কে নেবে?বেড়ে চলা ক্যান্সার ও অন্যান্য মারণ রোগের হাত থেকে রক্ষা পেতে গেলে অবিলম্বে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক বিষ ব্যবহার বন্ধ করা প্রয়োজন।

সেই দিকে লক্ষ্য রেখেই ভারতীয় কিষাণ সঙ্ঘ আয়োজন করেছিল দু’দিনের ‘জৈব কৃষি প্রশিক্ষণ শিবির'(১৪ ও ১৫ মে) ও একদিনের ‘যোজনা বৈঠক'(১৬ মে)। এই শিবির হয় পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়্গপুরের গোপালী আশ্রমে।

শিবিরের শুরুতেই কিষাণ সঙ্ঘের পতাকা উত্তোলন ও প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করেন পশ্চিমবঙ্গ প্রান্তের সহ-সভাপতি আশিস সরকার। উদ্বোধনী ভাষন দেন অখিল ভারতীয় কিষাণ সঙ্ঘের সম্পাদক ভানু থাপা। জৈব কৃষির বাস্তবতা ও সঙ্ঘের অভিমুখ আলোচিত হয় তাঁর বক্তব্যে।

দু’দিনের এই প্রশিক্ষণ শিবিরে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে ৬০ জন কৃষক-কার্যকর্তা। উপস্থিত কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেন ডঃ অনুপম পাল(জৈব বিশেষজ্ঞ ও কৃষিবিদ), ডঃ আশুতোষ মন্ডল (যুগ্ম কৃষি অধিকর্তা, চুঁচুড়া কৃষি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, হুগলি), কৃষিবিদ হৃষীকেশ মন্ডল (অপর কৃষি অধিকর্তা, প্রশিক্ষণ, হাওড়া) ও অধ্যাপক রাজেন্দ্র প্রসাদ মানসভরম (আইআইটি,খড়গপুর)।

ডঃ পাল তাঁর আলোচনায় তুলে ধরেন জৈব কৃষির প্রয়োজনীয়তা, জৈব চাষ পদ্ধতি, উৎপাদন মূল্য, জৈব চাষের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।

জৈব পদ্ধতিতে বীজ উৎপাদন পদ্ধতি ও তার সংরক্ষণ কীভাবে করতে হবে সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন ডঃ আশুতোষ মন্ডল।

কৃষিবিদ হৃষীকেশ মন্ডল গাছের খাদ্য উপাদানে অনুখাদ্যের অভাব জনিত লক্ষণ ও তার প্রতিকার এবং জৈব সার উৎপাদন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেন।

অধ্যাপক মানসভরম জৈব চাষের উপযোগী কৃষি যন্ত্রপাতি নিয়ে আলোচনা করেন।

এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় কিষাণ সঙ্ঘের অখিল ভারতীয় সংগঠন সম্পাদক দীনেশ কুলকার্নি, অখিল ভারতীয় কার্যকারিনী সদস্য ও পশ্চিমবঙ্গ প্রান্তের সভাপতি কল্যাণ কুমার মন্ডল এবং পশ্চিমবঙ্গ প্রান্তের সংগঠন সম্পাদক অনিল চন্দ্র রায়।

ভারতীয় কিষাণ সঙ্ঘের তিন দিনের এই ‘প্রশিক্ষণ শিবির ও যোজনা’ বৈঠকের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন করা হলে অখিল ভারতীয় সংগঠন সম্পাদক দীনেশ কুলকার্নি জানান, ” ভারত কৃষিতে আত্মনির্ভরশীল হয়েছে। কিন্তু কৃষক অর্থনৈতিক দিক দিয়ে এখনো স্বাবলম্বী হয়নি। ‘কৃষককে তার উৎপাদিত ফসলের উপর লাভকারী মূল্য দিতে হবে’ – এই দাবিতে ভারতীয় কিষাণ সঙ্ঘ আন্দোলন করে চলেছে।”

সভাপতি কল্যাণ কুমার মন্ডল বলেন, “জৈব চাষের মাধ্যমে আগামী ১০-১৫ বছরের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গকে ‘জৈব কৃষি রাজ্য’ হিসেবে গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য। তার জন্য ভারতীয় কিষাণ সঙ্ঘের কার্যকর্তারা এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে তাদের নিজেদের জেলার কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে জৈব চাষে আগ্রহী করে তুলবে।”

“জৈব কৃষি ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে এই ভারতের আগামী প্রজন্মের জন্য সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশ দিয়ে যাব আমরা” – বলে জানান অনিল চন্দ্র রায়। পাশাপাশি উৎপাদিত ফসলের লাভকারী মূল্য ও জৈব কৃষি ফিরিয়ে আনার দাবিতে আগামী অক্টোবর(২০২২) মাসে ভারতীয় কিষাণ সঙ্ঘের পক্ষ থেকে কলকাতায় একটি বিশাল র‍্যালি করার পরিকল্পনার কথাও যোজনা বৈঠকে স্থির হয়েছে – বলে তিনি জানান।

সিকিম, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড সহ উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোতে জৈব পদ্ধতিতে চাষ অনেক আগেই শুরু হয়েছে। জৈব চাষের প্রয়োজনীয়তা কতটা তা আজকাল রোগগ্রস্ত মানুষের দিকে লক্ষ্য করলেই বোঝা যায়। ক্যান্সার, হার্ট-এটাক, সুগার, প্রেশার, গ্যাস প্রভৃতি মারণ রোগে জেরবার মানুষ। এখনই জৈব চাষে ফিরে না গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের প্রতি দশটি পরিবার পিছু একজন মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হবে বলে ‘হু’ জানিয়েছে। সেই ভবিষ্যৎবাণী যে কতটা সত্য তা পাঞ্জাবের ভাতিন্ডা থেকে ছাড়া ক্যান্সার স্পেশাল ট্রেনে করে চিকিৎসা করাতে যাওয়া মানুষরাই প্রমাণ দিচ্ছেন। তা দেখে না শিখলে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের মানুষকে ঠেকে শিখতে হবে, সে দিন আর বাকি নেই।

আপনাদের মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here