তীর্থে তীর্থে পথে পথে গঙ্গোত্রী ধাম দর্শন (তৃতীয় পর্ব)

স্বামী প্রৌঢ়ানন্দ
আমাদের ভারত, ১৬ জানুয়ারি: উপরের বার্থ থেকে নীচে নেমে এলাম। হাতমুখ ধুয়ে এসে বসলাম নীচের সিটে। কাল সন্ধ্যায় যাদের ট্রেনে দেখেছিলাম তাদের মধ্যে কয়েকজন নেমে গেছেন, আবার বেশ কিছু নতুন যাত্রী কামরায় উঠে এসেছেন। এও যেন সংসারের নিত্য নৈমিত্তিক খেলার মতন। ট্রেনে যেমন নির্দিষ্ট স্টেশন এলে নেমে যেতে হয়, আবার সেখান থেকে নতুন যাত্রী ওঠে। ঠিক তেমনই সংসারে থাকার মেয়াদ ফুরিয়ে গেলে ট্রেনরূপী দেহের খোলস ত্যাগ করতে হয়, আবার বিপরীতে নতুন শিশুর জন্মের সাথে সাথে নতুন যাত্রীর আবির্ভাব ঘটে।

সঙ্গে থাকা শুকনো খাবার দিয়ে প্রাতরাশ সারা হল।অমরদার অবশ্য প্রাতরাশ আর মধ্যাহ্নভোজ প্রায় সমান।ইতিমধ্যেই তিনি ট্রেনের হকার ভাইদের কাছ থেকে খান দশেক পুরি উদরস্থ করেছেন। এই ট্রেনের বহু যাত্রীই কুম্ভমেলায় চলেছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই আমাদের মতন লখ্নউ নেমে ট্রেন বদল করে যাবেন, আবার অনেকে এই ট্রেনেই সরাসরি লাক্সার গিয়ে সেখান থেকে সড়ক পথে হরিদ্বার যাবেন।

আমাদের কামরাতেই দেখতে পেলাম এক বাউলের দল।দলে প্রায় দশ বারো জন হবেন। কথায় কথায় জানতে পারলাম ওঁনাদের বীরভূমে আখড়া আছে, সকলেই চলেছেন কুম্ভমেলায়। ওখানেই তাবুতে তাঁরা থাকবেন প্রায় এক মাস। ওঁনাদের তাবুতে যাবার জন্য আমাকে আগাম নিমন্ত্রণ করলেন। বললেন, গোঁসাই আসুন না কয়েকদিন আমাদের তাবুতে থাকবেন, নতুন ধরনের আপনার অভিজ্ঞতা হবে। ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালাম। এই ভাবে কথায় কথায় অনেকটা সময় কেটে গেল, এক প্রবীণ বাউল গান ধরলেন-
“চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে।
আমরা ভেবে করব কি।।………”
সত্যিই কি অপূর্ব এই লালন সঙ্গীত। গানের প্রতিটি পদে সৃষ্টি তত্ত্বের বর্ননা। চাঁদ রূপ শুক্রাণু চাঁদ রূপ ডিম্বাণুর সঙ্গে মিলিত হলে তবেই সৃষ্টি হবে নতুন প্রানের। এইভাবে গান একটার পর একটা চলতেই থাকল। প্রায় দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে এল, সকলের হুঁশ ফিরল একটু কিছু খেতে হবে। বাউল দলের সবাই মিলে চিড়ে, ফল আর বাতাসা জল দিয়ে মাখিয়ে ঠাকুর’কে নিবেদন করে আমাদেরও প্রসাদ দিলেন। সেই মুহূর্তে সেই খাবার মনে হল যেন অমৃত, মনে জাগল অপূর্ব এক প্রশান্তি। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে এল, লখ্নউ আগতপ্রায়, আমরা নামার জন্য প্রস্তুত হতে লাগলাম।

আপনাদের মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here