জন্মাষ্টমীর পিছনে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস জানেন কি?

আমাদের ভারত ডেস্ক, ১১ আগস্ট: করোনা আবহেও উৎসব আসে আপন নিয়মেই। নাগপঞ্চমী, রাখিপূৰ্ণিমার পর প্ৰতিবছরের মতো সময়টা এবার জন্মাষ্টমী পালনের৷ জন্মাষ্টমী মানে শ্ৰীকৃষ্ণের জন্মতিথি৷ শ্ৰাবণ মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমীতিথিতে বিষ্ণুর অষ্টম অবতার হিসাবে ধরাধামে অবতীৰ্ণ হন শ্রীকৃষ্ণ। এই দিনটিকেই জন্মাষ্টমী হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে।

শ্ৰীকৃষ্ণের জন্মবৃত্তান্ত: কথিত আছে, মথুরার অত্যাচারী রাজা কংসর বিনাশের জন্যই শ্ৰীকৃষ্ণের আগমন, কংসর বোন দেবকীর গৰ্ভের অষ্টম পুত্ৰসন্তান হিসাবে৷ এই অষ্টম সন্তানই যে কংসের মৃত্যুর কারণ হবে তা কংস দৈববাণী মারফৎ আগেই জেনেছিলেন৷ তাই বিয়ের পর স্বামী বাসুদেব সহ বোন দেবকীকে কারাবন্দি করে রাখেন৷ দেবকীর প্ৰথম ছয়টি সন্তানকে কংস নিষ্ঠুরভাবে সদ্যোজাত অবস্থাতেই হত্যা করেন৷

সপ্তম সন্তানটি গৰ্ভে আসার পরে অলৌকিকভাবে বৃন্দাবনে রোহিণীর গৰ্ভে চলে যায় এবং কংসকে জানানো হয় সন্তানটি গৰ্ভস্থ অবস্থাতেই নষ্ট হয়ে গেছে৷ ইনিই পরবর্তীকালে শ্ৰীকৃষ্ণের বড়ভাই বলরাম রূপে আবিৰ্ভূত হবেন৷ আর তারপরেই বহুপ্ৰতীক্ষিত অষ্টম পুত্ৰসন্তানের পালা৷ আশ্চৰ্যজনকভাবে ঝড়বৃষ্টি আর প্ৰবল হাওয়ার সেই অষ্টমীর রাতে কারাগারের রক্ষীরা সকলেই ঘুমিয়ে পড়লেন, খুলে গেল কারাগারের দরজা৷ বাসুদেব বুকভৰ্তি যমুনার জলে মাথায় করে সদ্যোজাত পুত্ৰসন্তানকে নিয়ে বৃন্দাবনে নিজের বন্ধু নন্দলালের গৃহে নিজের পুত্ৰসন্তানকে দিয়ে তাঁর ও যশোদার সদ্যোজাত কন্যাসন্তানকে নিয়ে এলেন৷ কংস যখন এই কন্যাসন্তানের ব্যাপারে জানতে পারলেন তখন তাকেও মারতে উদ্যত হলেন৷ কিন্তু আচমকাই কন্যাটি উপরে উঠে মা দুর্গার রূপ ধারণ করে কংসকে পুনরায় অভিশাপ দেন৷ ওদিকে শ্ৰীকৃষ্ণ তখন বালগোপাল (শিশু গোপাল) হয়ে যশোদা মায়ের স্নেহছায়ায় বেড়ে উঠছেন বৃন্দাবনে৷

পুজোর রীতি ও উপবাস:
এই গেল শ্ৰীকৃষ্ণের জন্মবৃত্তান্ত৷ জন্মাষ্টমীতে সেজন্য নন্দগোপালেরই পুজো করা হয়৷ প্ৰথমে তাঁর মূৰ্তিকে দুধ, দই, ঘি, মধু ও গঙ্গাজল দিয়ে স্নান করানো হয়, এই প্ৰথাকে শাস্ত্ৰে বলা হয়েছে ‘অভিষেকম্’। নতুন বস্ত্ৰ ও ফুলের মালা পরানো হয়৷ মথুরা ও বৃন্দাবন তো বটেই সারা ভারতেই অত্যন্ত পবিত্ৰ ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা হয় জন্মাষ্টমী তিথিটি৷ বেশিরভাগ ভক্তই নিৰ্জলা উপবাস রাখেন, আর যারা নিৰ্জলা থাকতে পারেন না তাঁরা এই বিশেষ দিনটা ফলার কিংবা দুধ, সন্দেশ খেয়ে কাটান৷ উপবাস করার রীতিটিকে বলা হয় ‘সংকল্প’৷ মধ্যরাতে যখন অষ্টমীতিথি শেষ হয়, তখন উপবাস ভঙ্গ করা হয়৷ মথুরা ও বৃন্দাবনে অনেকেই সারারাত জেগে থাকেন, যাকে বলা হয় জাগরণ৷

৫৬ ভোগ: জন্মাষ্টমীর দিন বিকেল থেকেই মন্দিরে মন্দিরে বা যেসব বাড়িতে জন্মাষ্টমীর পুজো হয়, সঙ্গে আরতি ও সংগীত পরিবেশিত হয়৷ পরের দিনটি নন্দ উৎসব নামে পরিচিত৷ জন্মাষ্টমীতে নন্দগোপালকে ৫৬ রকমের ভোগ দেওয়া হয়৷ এরপরে তা প্ৰসাদ হিসেবে বিতরণ করা হয়৷ এর মধ্যে থাকে মূলত মাখন-মিছরি, ক্ষীর, রসগোল্লা, জিলিপি, রাবরি, মাঠরি, মালপোয়া, মোহনভোগ, চাটনি, মোরব্বা, খিচুরি, দুধ, দই, কাজু ইত্যাদি৷

দহিহান্ডি: এই প্ৰথাটি আমাদের বাংলায় খুব একাট প্ৰচলিত না হলেও উত্তর ও পশ্চিম ভারতে প্ৰচলিত আছে৷ নন্দগোপাল যখন ননী চুরি করত তখন যেভাবে পর পর সখাদের উপর উঠে মাটির কলসি থেকে তা নিত, সেইভাবেই এখানে দহিহান্ডি করা হয়৷ মাটির কলসি ২০-৩০ ফুট উঁচুতে রাখা হয়, তারপর ছেলেরা পিরামিডের আকারে দাঁড়িয়ে পড়ে, তার উপরে একজন উঠে সেই কলসিতে রাখা মাখন, ঘি, ড্ৰাইফ্ৰুটস কলসি ভেঙে বের করে আনে৷ শুধু ছেলেরা নয়, মেয়েরাও এই মজার খেলায় অংশ নেয়৷ বলা হয় এই কলসির ভাঙা টুকরো বাড়িতে রাখলে যাবতীয় নেতিবাচক এনাৰ্জি বাড়ি থেকে চলে যাবে৷

রাসলীলা: রাসলীলার বিষয়বস্তু হল নন্দগোপালের বেড়ে ওঠার সময়কার ছোট ছোট গপ্ল, কখনও তা বালখিল্যতা, আবার কখনও দুষ্টুমিতে ভরা৷ মূলত ১০-১৩ বছর বয়সী ব্ৰাহ্মণ ছেলেমেরোই রাসলীলায় অংশ নেয়৷ রাসলীলার মধ্যে জন্মলীলা, শংকরলীলা, পুতনালীলা, নাগলীলা বেশি জনপ্ৰিয়, এগুলিতে মূলত স্থানীয় ভাষারই প্ৰচলন আছে, অর্থাৎ কি না ব্ৰজভাষা৷

প্ৰাদেশিক রীতি: দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে জন্মাষ্টমীর দিন চাল ও ময়দার গুঁড়ো দিয়ে নন্দগোপালের পায়ের ছাপ আঁকা হয়, অনেকটা আমাদের কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর মতো৷ এতে মনে করা হয় নন্দগোপাল ঘরে এল৷ গুজরাতেও এইদিন তাস খেলার প্ৰথা আছে৷ এমনকী খেলাতে বাজিও ধরা হয়৷ এইদিন গুজরাতিরা দুদিন আগে তৈরি করা ঠান্ডা খাবার খায়, যাকে বলে ঠান্ডাই৷

আপনাদের মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here