ভারত–নেপাল সম্পর্কের টানাপোড়েন

ড. রাজলক্ষ্মী বসু
আমাদের ভারত, ২৩ জুন: রবীন্দ্রনাথের দুই বোন উপন্যাসে খেয়াল পড়ে শশাঙ্কের কথা, ভোর বেলা ধড়ফড় করে বিছানা থেকে উঠে আয়নার টেবিলের উপর মুষ্ঠিঘাত করে বলেছিল “যাব না নেপাল”।
আমাদের সবার দশা কি এবার শশাঙ্কের মতো হবে? নেপাল যে এখন চিনের বেশি কাছের আর ভারতের অনেকটা দূরের–অবশ্যই কূটনৈতিক ভাবে। কেন চিনের কাছের, তা একটু কাটাছেঁড়া করি। পাহাড়ি উপত্যকা দেশটির চিনা প্রীতি তৈরি শুরু হয় ২০১৮ থেকেই। নেপাল প্রধান অলি ওই বছর চিন সফর করেন এবং ট্রান্স হিমালয়ান মালটি ডায়মেনসনাল কানেকটিভিটি নেটওয়ার্ক ( টি এইচ এম সি এন) এর যৌথ কর্মসূচীর সূত্রপাত ঘটে। ১৪ প্যারার ওই জয়েন্ট স্টেটসমেনে বলা ছিল, “the two sides agreed to intensify implementation of the MoU on cooperation under the Belt and Road Initiatives ( BRI) to enhance connectivity, encompassing such vital components as ports, roads, railways, aviation and communications within the overarching framework “. উক্ত প্রজেক্টের গুরুত্ব বোঝাতে চিনের বিদেশমন্ত্রী ওয়াঙগ অই নেপালের প্রদীপ গায়াওলির সাথে জয়েন্ট প্রেস কনফারেন্স পর্যন্ত করেন। সেদিন তাদের বক্তব্য ছিল, ট্রান্সপোর্টকে তারা কানেকটিভিটির পর্যায়ে উন্নীত করবে। অবশ্যই মাঝে থাকবে ভারত। কিন্তু বোঝা উচিত ছিল যে এরফলে ভারত উপকৃত হবে না, দীর্ঘমেয়াদি ভাবে তো আরওই না। কারণ, BRI চিনের ৬২ মিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন প্রকল্প চায়না-পাকিস্তান-ইকনমিক করিডোরেরই অংশ বিশেষ। যা বিতর্কিত ভারত অংশীদারিত্বের পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের উপর দিয়ে গেছে। ওই বছরেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং চিনের সি জিংপিং সাংঘাই কোঅপারেশন অরগানাইজেশন এ মিলিত হন এবং ট্রান্স হিমালয়ান মালটি ডায়মেনসনাল কানেকটিভিটি নেটওয়ার্কের বিশষে বিস্তারিত সমৃদ্ধশালী আলোচনা হয়। খুব অদ্ভুত ভাবে ওই আলোচনায় নেপালকেই আমন্ত্রণ করা হয়নি। অথচ ২০০৮ থেকে নেপাল ডায়লগ পার্টনার হিসেবে উপস্থিত। তাই নেপাল রাষ্ট্রপ্রধান অলির সরাসরি বেজিং বৈঠক ও আলোচনা সব রহস্যের সমাধান ঘটিয়ে আপাত প্রমান করেছিল যে নেপাল এবার চিনাভিলাষী।

একা নেপালই চিনের সাথে ১,৪১৫ কিলোমিটার সীমান্তরেখা বরাবর অবস্থান করছে, তাই এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সি জিংপিং, অলিকে বিশেষ মর্যাদায় বেজিং ডেকেছিলেন। কেবলমাত্র অর্থনৈতিক উপনিবেশ গঠনের স্বার্থেই চিন নেপালের প্রতি এতটা মনোযোগী। ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষে নেপালের চিনা রপ্তানি ছিল মাত্র ১.২৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যা পরের অর্থবর্ষে আরো কমে দাঁড়িয়েছে ০.০২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এক্সপার্ট ইমপোর্ট রেশিও মাত্র ১.৫ শতাংশ। তাই এটা স্পষ্ট যে নেপাল হবে চিনের হাতের তাস। যেমন খুশি তেমন ব্যবহার করবে এবং চিনা বাজার তৈরির স্বচ্ছন্দ মধ্যস্থতাকারী মাটি হবে নেপাল। অলির পুনরায় নির্বাচনী জয়লাভ এবং কমিউনিস্ট শক্তির দেশ হিসেবে নেপালের আবির্ভাবও চিনেরই আশীর্বাদ। নেপাল প্রধান অলি রাজনৈতিক তর্জায় ব্যস্ত কিন্তু কোনও অর্থনৈতিক রূপান্তরের পদক্ষেপ নেননি, পুণরায় প্রমাণ করে যে নেপাল চিনের অনুগত।

সুষমা স্বরাজ বিদেশমন্ত্রী থাকা কালীন বহুবার নেপালের পাশে থেকেছেন, মৈত্রেয়ীর হাত প্রসারিত করেছে ভারত, কিন্তু দুই দেশের যে “এমিনেন্ট পারসনস গ্রুপ” তারাই কোথাও গিয়ে দূরত্বে থেকেছেন। নেপালের কূটনৈতিক ভঙ্গি ভারতের আগ্রহ সৃষ্টির পরিপন্থী হয়। নেপালের কূটনৈতিক আচরণ কসমেটিক্স। স্ট্রাটেজিক আদৌ না। দ্রুততার সাথে চিনা দায়খয়রাতি নিয়েই নেপাল খুশি থাকতে চাইছে। তাই আপাত সময়সাপেক্ষে দীর্ঘ মেয়াদি ভারতমুখী স্হিতিশীল কূটনৈতিক সম্পর্কে আসার মনোভাব নেপালের নেই। ২০১৮, মার্চ,পার্লামেন্ট স্যান্ডিং কমিটিতে বিদেশ সচিব গোখলেও এই মতামতই পেশ করেন। নেপাল রাষ্ট্রপ্রধান চিনের আগ্রাসী আগ্রহ কি সত্যিই বুঝলেন না? নাকি নিজের ক্ষেমতা রক্ষার্থে রাষ্ট্রকে উপনিবেশ প্রদেশেই রূপান্তরিত করলেন। সেদিনের পার্লামেন্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির বৈঠকে গোখলে বলেছিলেন, “put forward ideological positions about what (their) Foreign Policy consists of, and that India should and do have our own worldview”.অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

স্মরণে রাখতে হবে ২০১৮ তে নেপাল কর্তা অলি দিল্লির আমন্ত্রণে আসেন। নেপাল ভারত সম্পর্কের ফাটলে কিছু মেকি মলম লাগানোর অছিলায় ১৯৫০ এর মৈত্রেয়ী সমঝোতার সংস্করণের কথাটিও সেদিন হয়। নেপালেই চিনের আনুগত্যে থাকতে হবে কারণ ডোকালাম স্ট্যান্ড অফের পরেও চিন ভারতের বানিজ্য অঙ্ক ছিল ৮৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের! যা প্রতি বছর ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই ভারতের বাজার চিনের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ইতিমধ্যেই চিনা রপ্তানি ১৪ শতাংশ কমেছে, আশা রাখি আগামীতে আরো কমবে। চিন নেপাল সম্পর্কে ভারতকে সুষ্ঠু জায়গা না দিলে হয়তো পররাষ্ট্র জটিলতা ভারতকে সহ্য করতে হবে কিন্তু আখেরে ক্ষতির খাতায় নেপাল ফুলমার্কস পাবে।

আপনাদের মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here