আরও খবর বিনোদন

তীর্থে তীর্থে পথে পথে, কামাখ্যা দর্শন (একাদশ পর্ব)

স্বামী প্রৌঢ়ানন্দ

আমাদের ভারত, ৫ ডিসেম্বর: জ্ঞান ফিরে আসতে দেখলাম জঙ্গলের মাঝে শুয়ে আছি। গাছ পালার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো প্রবেশ করছে। সন্ন্যাসী মহারাজকে কোথাও দেখতে পেলাম না। আমি কি এতক্ষণ ধরে স্বপ্ন দেখছিলাম? কিন্তু সামনে দেখতে পাচ্ছি ধুনির ছাই পড়ে রয়েছে। এই রকম সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই দেখি দুজন স্থানীয় ব্যক্তি এদিকে আসছে, বোধহয় তাঁরা গাছের কাঠ, পাতা সংগ্রহ করেন।আমাকে দেখতে পেয়ে কাছে এলেন। অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন আপনি কি সারারাত এখানেই ছিলেন? আমার উত্তর শুনে তারা অবাক হয়ে গেলেন, বললেন ভগবান আপনাকে রক্ষা করেছেন, এ যে গভীর জঙ্গল, মাঝে মধ্যেই এখানে হিংস্র জীবজন্তু বের হয়। এর মধ্যেই একজন তার ঝোলা থেকে দুটো রুটি আর একটু গুড় বের করে বললেন, মহারাজ এটা খেয়ে নিন।

এতক্ষণ অনুভব করিনি কিন্তু এবার বুঝতে পারছি বেশ ক্ষিধে পেয়েছে। সানন্দে তার দেওয়া রুটি গুড় খেয়ে নিলাম। তারাই আবার আমাকে তাদের সঙ্গে রাখা জল আমাকে দিল। খাওয়া শেষ হলে বলল, চলুন মহারাজ আপনাকে নীচে নামিয়ে দিয়ে আসি। তাদের সাথে আমি নীচে নামতে লাগলাম। কথায় কথায় জানতে পারলাম এক জনের নাম ধনারাম আর এক জনের নাম ধুবল, তারা প্রতিদিন জঙ্গলে আসে কাঠ সংগ্রহ করতে। কিছু জমি আছে সেখানে তারা চাষবাস করে, এতেই তাদের দিন গুজরান হয়ে যায়। দুজনেরই সংসার আছে, ধনারামের তিনটি ও ধুবলের দুটি সন্তান আছে। তারা কিছু দূরে একটা সরকারী স্কুলে পড়াশোনা করে। ধনারামের কাছেই শুনলাম এখান থেকে দক্ষিণ দিকে মাইল তিনেক দূরে একটা ছোট্ট পাহাড়ের উপর বেশ কিছুদিন ধরে এক তান্ত্রিক ডেরা বেঁধেছেন, কিন্তু তিনি অসম্ভব রাগী, কাউকে কাছে ঘেঁষতে দেন না, বেশি বিরক্ত করলে ত্রিশূল নিয়ে তাড়া করেন। এই কথা শোনা মাত্র আমার সাধুসঙ্গ করার বাসনা আবার জেগে উঠল, তাদের কাছ থেকে পথের হদিশ ভালো করে জেনে নিয়ে চললাম সেই তান্ত্রিক সাধুর সন্ধানে।

বেশি বেগ পেতে হল না। একটু জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘন্টা খানেকের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম সেই তান্ত্রিক সাধুর ডেরায়।দূর থেকে দেখলাম এক পাতার তৈরি কুটির, তার বাইরে বসে আছেন এক বিশাল দেহী সন্ন্যাসী, পরনে তার রক্তবসন, মাথার জটা মাটিতে এসে ঠেকেছে, রক্তবর্ণ চোখ আর সামনের মাটিতে গাঁথা এক বিশাল ত্রিশূল। বুঝতে পারলাম এই ত্রিশূলের ভয়েই কেউ সাধুবাবার কাছে ঘেঁষতে সাহস করে না। সাধুবাবা ধ্যানস্থ হয়ে বসে আছেন। কাছে যাব কি যাব না ভাবছি। এই সময় বিরক্ত করলে সাধুবাবা যদি রেগে যান। এই সব ভাবতে ভাবতে যা থাকে কপালে চিন্তা করে এগিয়ে চললাম সাধুবাবার দিকে।

সাধুবাবা’কে বিরক্ত না করে দূর থেকে প্রণাম করে বসলাম।কিন্তু বসতে না বসতেই সাধুবাবার হুঙ্কার– কে তুই, এখানে কী জন্য এসেছিস? এখুনি এখান থেকে চলেযা। এই বিশাল হুঙ্কার শুনে প্রথমটা আমার বুকের ভেতর ধড়াস করে উঠল, পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে করজোড়ে সাধুবাবা’কে বললাম, বাবা আপনার কাছে এসেছি পরমার্থিক কিছু প্রাপ্তির আশায়, লৌকিক কোনও কামনা, বাসনা নিয়ে আপনাকে বিরক্ত করার কোনঈ অভিপ্রায় আমার নেই।

আমার কথা শুনে সাধুবাবা থমকে গেলেন, আমার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন, তারপর কোমল সুরে আমায় বললেন, আয় বেটা আয় আমার কাছে এসে বস। আসলে কী জানিস, সারাদিন ধরে লোকেরা বিরক্ত করে, কার ছেলে বেকার, কার মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না, কার কোন শত্রুকে বশীকরণ করতে হবে এই সব। আচ্ছা তুই বল, আমি কি এইসব করার জন্য এখানে আছি? যে যার নিজের কর্ম ফল ভোগ করছে, সেখানে আমি কেন নাক গলাতে যাব? তাই বাইরের এই শক্ত খোলসটা পরে থাকতে হয়েছে।

আমি প্রশ্ন করলাম, তাহলে কি মহারাজ সাধারণ মানুষের কর্মফল থেকে কোনও নিস্তার নেই? তাকে সারা জীবন ধরে ভোগ করে যেতে হবে? সাধুবাবা হাসলেন, বললেন নেই কেন রে, নিঃশ্চয় আছে, তবে মানুষ তো, একটা ভোগ শেষ হলে আবার নতুন করে নিজেকে অসৎ কর্মের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলে, প্রতিবারই বলে ঠাকুর এ যাত্রায় উদ্ধার করে দাও আর ভুল করব না। আবার কিছু দিন পর সব ভুলে গিয়ে নতুন করে ভুল করে বসে। তাই তো সারাজীবন কর্মফল তাদের তাড়া করে, মুক্তি পায় না। সারা জীবন ধরে তাদের জ্যোতিষ, গনৎকার, ওঝা, তান্ত্রিকের শরনাপন্ন হতে হয়।
তাহলে বাবা আপনিই বলুন, এর হাত থেকে বাঁচতে গেলে আমাদের কী করা উচিত, জীবন পথে কোন আদর্শ নিয়ে চললে এই কর্মফল ভোগ থেকে আমরা মুক্তি পেতে পারি, কারন কর্ম ছাড়া আমরা কেউ থাকতে পারি না, তাই সজ্ঞানে অথবা অজ্ঞানে কিছু ফল আমাদের জমা হচ্ছেই, তা থেকে আমাদের পরিত্রাণের উপায় কি?

Leave a Comment

four × four =

Welcome To Amaderbharat. We would like to keep you updated with the Latest News.