তীর্থে তীর্থে পথে পথে কামাখ্যা দর্শন (দ্বাদশ পর্ব)

স্বামী প্রৌঢ়ানন্দ
আমাদের ভারত, ১২ ডিসেম্বর: আমার প্রশ্ন শুনে সাধুবাবা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, খুব ভালো বলেছিস। কাজ ছাড়া মানুষ থাকতে পারে না, আবার কাজ করলে তার জন্য উদ্ভুত ফল ভোগ করতে হবেই।

গীতায় আছে কর্ম যোগের কথা। সেখানে নিষ্কাম কর্মের কথা বলা আছে অর্থাৎ কাজ কর কিন্তু কাজের ফলের আশা কর না।এই ধরনের কর্ম হচ্ছে শ্রেষ্ঠ কর্ম। কিন্তু ফলের আশা না করে কাজ কর, বলা যতটা সোজা কাজে ততটাই কঠিন। কারন নির্দিষ্ট লক্ষ্য না রাখলে সাধারন মানুষ কাজ করার উৎসাহ পাবে না। যেমন ধর, একজন ছাত্র সে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবার লক্ষ্যে পড়াশোনা করে, সে চাইছে, তার বাবা-মাও চাইছে ছেলে বড় হয়ে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা অধ্যাপক হবে। এই ধরনের লক্ষ্য আমরা সবসময়ই স্থির করে জীবনের চলার পথ ঠিক করি। ছোট বেলা থেকেই আমরা শুনে আসছি লক্ষ্যহীন মানুষ মাঝ দরিয়ায় পাল ছাড়া নৌকার মতন, দিকভ্রষ্ট হয়ে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়। তাই সাধারণ মানুষের পক্ষে নিষ্কাম কর্ম করা অত্যন্ত দুরূহ ব্যপার।

এই পৃথিবীর সমস্ত সম্পর্কর মধ্যেই রয়েছে স্বার্থ, কোথাও একটু বেশী কোথাও বা একটু কম। এমনকি স্বামী-স্ত্রী বা মাতা-পুত্রের সম্পর্কের মধ্যেও অজান্তে ঢুকে পড়ে স্বার্থের বীজ, মনের গহন গোপন কোনে সে বাসা বেঁধে থাকে। তাই তো বিচ্ছেদ কালে আমরা এত শোকাতুর হয়ে পড়ি, আমাদের আশা পুরন না হবার জন্য। অপত্য স্নেহও এক ধরনের মায়া। এই মায়ার বশবর্তী হয়ে আমরা অনেক ভুল কাজ করে ফেলি যার ফল আমাদের ভুগতে হয়।
সাধুবাবার কথা শুনে বহুক্ষন বাকরুদ্ধ হয়ে বসে রইলাম।হাত জোড় করে জিজ্ঞাসা করলাম, তাহলে কি সাধারণ মানুষের কোনও ভাবেই মুক্তি নেই? সেই রকম কি কোনও মুক্তির রাস্তা নেই? সাধুবাবা আমার কথা শুনে বললেন, নেই কেন, অবশ্যই আছে, এইকলিযুগে ভক্তিই সার। তাই যে ইষ্ট দেবতাকে যে মানে তার উপর সম্পূর্ণ আত্মনিবেদন করতে হয়, নিত্য তাঁর পূজা ও সেবা করলে একটা সময় দেখবি তিনিই তোকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিচ্ছেন। ভক্ত নিজে যখন এটা অনুভব করতে পারবে তখন সে অন্তঃস্থল থেকে একটা ভরসার জায়গা অনুভব করবে, তার ফলে জীবনে তার সাফল্য বা ব্যর্থতা যাই আসুক না কেন, সে এটাকে ঈশ্বরের আশীর্বাদ হিসেবে ধরে নেয়, তাই তার মানসিক শান্তির জায়গাটা কোনও ভাবেই বিঘ্নিত হয় না। আর কর্মফলজনিত দোষও তাকে আর ছুতে পারে না, তার সব কাজই তখন হয় ঠাকুরের কাজ–নিজের জীবন হয় নৈবেদ্য।

আচ্ছা বাবা, আমরা যে শুনি তন্ত্রের মাধ্যমে বশীকরণ করা যায়, এটা কি ঠিক? বাবা বললেন, তন্ত্রের কাজ বশীকরণ করা নয়, এটা অত্যন্ত নিম্ন মার্গের কাজ, প্রকৃত তান্ত্রিকরা এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। তন্ত্র বিদ্যার প্রধান উদ্দেশ্য হল ইষ্ট দর্শন, ইষ্টের সাথে মিলন। তার জন্য সাধনার অনেক স্তর অতিক্রম করতে হয়। সাধনার প্রতিটি স্তরে সাধক এক একটি ক্ষমতার অধিকারী হয়। সে যদি সেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে তবে সে সেখানে আটকে যায়, তার অধঃপতন ঘটে। যে ব্যক্তি প্রতিনিয়ত ইষ্ট অথবা গুরুমন্ত্র জপ করে তাঁকে বশীকরণ করা সোজা নয়, আর কোনও ব্যক্তি এই কাজ করতে গিয়ে অসফল হলে উল্টে এই কাজ তারই ক্ষতি করে। তাই দেখবি যারা এই সব নিয়ে থাকে তাদের নিজেদের বিপদের শেষ নেই–রোগ, শোক, জরা, ব্যধি তাকে অথবা তার নিকট জনকে আক্রান্ত করে।
কিন্তু তুইত অনেকক্ষন এখানে এসেছিস, তোর নিঃশ্চয় ক্ষিধে পেয়েছে? কি খাবি বল–সাধুবাবা আমায় জিজ্ঞাসা করলেন। আমি বললাম বাবা, এই জনমানবহীন প্রান্তরে কি পাওয়া যাবে? আর আপনার সাথে তো কোনও কিছুই নেই।সাধুবাবা হেসে উঠলেন, বললেন তুই বলেই দেখ না, দেখি মা জোটায় কি না? সাধুবাবার আশ্বাস বানী শুনে আমি বললাম, বাবা এই সময় গরম জিলিপি খেতে পারলে বেশ হতো। সাধুবাবা খানিকক্ষণ চোখ বুজে বসে রইলেন তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন তোর কাঁধ থেকে ঝোলাটা নামা। আমি ঝোলাটা নামিয়ে রাখতে সাধুবাবা জিজ্ঞাসা করলেন এর মধ্যে কী আছে? আমি বললাম, বাবা এর মধ্যে একটা গামছা আর একটা ধুতি আছে।

ঠিক বলছিস, আর কিছু নেই। হ্যাঁ বাবা আর কিছু নেই?

কই ঝোলাটার মধ্যে হাত গলা। হাত গলাতেই অনুভব করলাম গরম কিছু একটা হাতে ঠেকছে, বার করে দেখি এক ঠোঙা গরম জিলিপি।
সাধুবাবা হেসে বললেন, নে খেয়েনে।
বললাম, বাবা আপনি নিন।
বাবা বললেন, আমি ওই সব খাই না, আমার খাবার কোনো প্রয়োজন পড়ে না।
তাহলে বাবা আপনি কি খান?
বাবা বললেন এই বায়ুর মধ্যেই খাদ্যের সমস্ত উপাদান রয়েছে, এই বায়ু সেবনের দ্বারাই আমরা আমাদের শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি সংগ্রহ করে থাকি।

এও কি সম্ভব! অবাক বিস্ময়ে সাধুবাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। সাধুবাবা হাসছেন, বললেন নে নে খেয়ে নে।খাওয়া হয়ে গেলে সাধুবাবা বললেন, এবার ফিরে যা,ভঅনেক বেলা হয়ে গেল, তোর সঙ্গী সাথিরা চিন্তা করছে। সাধুবাবা’কে প্রনাম করে উঠে দাঁড়ালাম। সাধুবাবা হাত তুলে আশীর্বাদ করলেন।

আপনাদের মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here