আরও খবর

তীর্থে তীর্থে পথে পথে, কামাখ্যা দর্শন (সপ্তম পর্ব)

স্বামী প্রৌঢ়ানন্দ

আমাদের ভারত, ৭ নভেম্বর: কামাখ্যা মায়ের দর্শনে বহু দিন ধরে আসব আসব করেও আসা হয়নি মা না ডাকার জন্য। আবার মা যখন তাঁর কাছে যাবার সুযোগ করে দিলেন তখন তাঁর করুনাপাত্র কানায় কানায় পূর্ণ করে আমায় করুনা রসে সিক্ত করলেন। কখনও ভাবিনি মায়ের দর্শনে এসে এই রকম বিরল সব অভিজ্ঞতা হবে, মনের সমস্ত দ্বন্দ্ব, সন্দেহের অবসান ঘটিয়ে মা আমাকে আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে বিশ্বাসের চরম শিখরে নিয়ে যাবেন! বেশ বুঝতে পারছি সম্পূর্ণ শরনাগত হতে পারলে ভক্তের বোঝা ভগবানই টানেন। তাই, কলিযুগে ভক্তিই সার, চাই সম্পূর্ণ বিশ্বাস, ইষ্টের চরণে সম্পূর্ণ আত্মনিবেদন ।

আজ আমি যাব এখানকার আর এক বিখ্যাত মন্দির হয়গ্রীব মাধব দর্শন করতে। হয় কথার অর্থ ঘোড়া, এখানে প্রভু বিষ্ণু পূজিত হন ঘোড়ার মুখ সহ গ্রীবা অংশে। কথিত আছে ব্রহ্মা যখন বেদ সৃষ্টি করেন তখন দৈত্যরা সেটি চুরি করে পাতালে চলে যান। ব্রহ্মা তখন প্রভু বিষ্ণুর শরনাপন্ন হন। তখন বিষ্ণু ঘোড়ার রূপ ধরে দৈত্যদের কাছ থেকে বেদ উদ্ধার করেন। আর এক মতে ভগবান বিষ্ণু ঔর্ব ঋষির তপস্যা ভঙ্গকারী জরাসুর, হয়াসুর সহ পাঁচ জন অসুরকে বধ করেন এবং হয়গ্রীব মাধব নামক পর্বতে অবস্থান করেন। কালিকা পুরাণ মতে এই তীর্থ স্থানের প্রতিষ্ঠাতা ঔর্ব ঋষি।

হয়গ্রীব মাধব মন্দির অসমের কামরূপ জেলার হাজোতে অবস্থিত এক দেবালয়। হাজোর মণিপর্বত নামের একটি টিলার উপর এই দেবালয় অবস্থিত। প্রভুকে প্রনাম জানালাম –
“হতাসুর হয়গ্রীব মুরারে মধুসূদন।
মনিকূটকৃতাবাস হতাসুর নমোহস্তুতে।।”

মন্দির থেকে নেমে আসছি এমন সময় চোখে পড়ল দূরে একটি গাছের তলায় এক যুবক বসে রয়েছে, অস্থির চোখ এদিক ওদিক ঘোরা ফেরা করছে, উস্কখুস্ক চুল অনেক দিন তেল না পেলে যেমন হয়। পরনের বস্ত্রও মলিন হয়ে গেছে অথচ চেহারার মধ্যে একটা বুদ্ধি মত্তার ছাপ রয়েছে।থাকতে না পেরে উৎসুক হয়ে তার কাছে গেলাম। জিজ্ঞাসা করলাম তোমার নাম কি? এখানে ওইভাবে বসে আছ কেন?সে আমার দিকে তাকিয়ে আবার অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। কাছের থেকে দেখে মনে হল সে অভুক্ত। যুবকটির পিঠে হাত রেখে জিজ্ঞাসা করলাম বাবা তোমার কি খুব খিদে পেয়েছে? যুবক আমার হাতের মুঠোয় মাথা রেখে কেঁদে ফেলল। তাকে বললাম চল চল আগে কিছু খেয়ে নিই, তারপর তোমার সঙ্গে আলাপ হবে। দুজনে কিছু দূরে একটা খাবার দোকনে ঢুকলাম। আমারও সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি তাই খুব তৃপ্তি সহকারে খাওয়া সারলাম। খাওয়া শেষে দুজনে হাত মুখ ধুয়ে বসলাম। যুবককে জিজ্ঞাসা করলাম তোমাকে দেখেতো শিক্ষিত রুচিশীল বলে মনে হচ্ছে, তাহলে তুমি এই রকম ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছ কেন? যুবক আমার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল, তারপর বলল আপনি শুনতে চান আমার কথা তবে শুনুন।

আমার নাম অরুণ কুমার। আমার বাবা আনন্দ কুমার, রাজস্থানের এক বিশিষ্ট মার্বেল ব্যবসায়ী। সেই অর্থে টাকা পয়সা, সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য কোনও কিছুরই অভাব নেই। আমার মা বাবার আমি এক মাত্র সন্তান হওয়ায় তারা আমার চাহিদা পূরণ করতে কোনও দিন কার্পণ্য করেননি। আমি ওখানকারই এক নামকরা কলেজে পড়তাম, আর আমার থেকে এক ক্লাস নীচে পড়ত মনালী। আমার আর মনালীর মধ্যে ছিল গভীর প্রেমের সম্পর্ক। আমরা দুজনে দুজনকে না দেখে এক দিনও থাকতে পারতাম না। আমার গাড়ি করে মনালীকে নিয়ে কত জায়গায় ঘুরেছি, ওকে কিছু দিতে পারলে, ওকে খুশি করতে পারলে আমার মনে হত আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছি। এই জন্য আমার প্রচুর খরচ হলেও আমার বাবা মা কোনও দিনও আমাকে বাঁধা দেননি। আমাদের এই সম্পর্কটাকে তারাও মেনে নিয়ে ছিলেন। মনে মনে তারা মনালীকে নিজেদের বৌমা বলে মেনে নিয়ে ছিলেন। মনালীকে নিয়ে আমিও মনে মনে সুখের নীড় বানিয়ে বসেছি। কত রঙিন কল্পনা তখন আমার দুচোখ জুড়ে। মনে হত এই পৃথিবীতে আমার থেকে সুখী বোধহয় আর কেউ নেই। কিন্তু বিধাতা পুরুষ অলক্ষ্যে বাঁকা হাসি হাসছিলেন।

হঠাৎ করে দিনকতক মনালী আর কলেজে আসছে না, ওকে আমি একটা একটা দামী মোবাইল ফোন উপহার দিয়েছিলাম সেটাও সুইচ অফ। পাগলের মত তখন আমি মনালীর খোঁজ করছি। ও যে লেডিস হোস্টেলে থাকত সেখান থেকে ওর বাড়ির ঠিকানা জোগাড় করে এক দিন চলে গেলাম ওর গ্রামের বাড়িতে। ওখানে ওর বাবা মায়ের সাথে দেখা করে আমাদের সম্পর্কের কথা বলতে তারা অবাক হয়ে গেলেন। বেশ বুঝতে পারলাম মনালী আমাদের সম্পর্কের কথা এখানে কিছুই জানায়নি। মনালী কোথায় জানতে চাইলে তারা বললেন পাশের গ্রামের একটি ছেলের সঙ্গে মনালীর দীর্ঘ দিনের প্রেম। সম্প্রতি ছেলেটি একটি বিদেশি কোম্পানিতে চাকরি পেয়ে আমেরিকা চলে গেছে আর সাথে করে নিয়ে গেছে মনালীকে– অগ্নি সাক্ষ্য রেখে বিবাহ করে। শেষ কথাগুলো শোনার পর আমি যেন কেমন টাল খেতে লাগলাম। পৃথিবী যেন আমারই চারপাশে ঘুরছে, পায়ের তলার মাটি যেন সরে যাচ্ছে। বেশ বুঝতে পারছি মনালী আমার সঙ্গে এতদিন অভিনয় করে এসেছে, সে আমাকে কোনদিনও ভালো বাসেনি কেবল আমাকে এতকাল ব্যবহার করে এসেছে নিজের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য আর চাহিদা মিটিয়েছে আমায় দিয়ে। এতো ভালো অভিনয় কি কেউ করতে পারে? একেবারের জন্যও আমি বুঝতে পারিনি তার মনের কথা। এই ঘটনার পর আমি দিশেহারা হয়ে পড়ি, কেমন যেন উদভ্রান্তের মতন দিন কাটতে থাকে।মনালীর উপর তৈরি হয় এক চাপা আক্রোশ, প্রতিশোধ নেবার এক উদগ্র বাসনা। লোকমুখে শুনতে পাই কামাখ্যা ধামে বড় বড় তান্ত্রিকরা থাকেন তারা বশীকরণ বিদ্যা জানেন, তাই এখানে এসেছিলাম মনালীকে বস করে আমার কাছে নিয়ে আসব বলে। কিন্তু এখানে কয়েকজন ভণ্ড তান্ত্রিকের পাল্লায় পড়ে কাজ তো আমার কিছু হয়নি উপরন্তু আমার কাছে যা টাকা পয়সা ছিল সব তারা কেড়ে নিয়েছে, এখন আমি কর্পদকহীন, সম্পূর্ণ নিঃস্ব, সহায় সম্বলহীন।

অরুনের কথা শুনে বহুক্ষণ বাকরুদ্ধ হয়ে বসেরইলাম।হায়রে নিয়তি, মানুষের জীবনকে কখন কোন মোড়ে এসে দাঁড় করিয়ে দেবে তা কেউ জানে না। এই মাত্র সুখের জোয়ার তো পরক্ষণেই দুঃখের ভাটা। জোয়ার ভাটার জীবনে হাবুডুবু খেতে খেতে কখন কোন ঘাটে তরি ভেরে তা কে বলতে পারে? অরুণ যাকে তার সর্বস্ব দিয়ে ভালো বেসেছিল, সেই তাকে ভাসিয়ে দিয়ে চলে গেল। অত বড় বাড়ির ছেলে আজ সহায় সম্বলহীন হয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।
কিন্তু অরুণকে বাঁচাতে হবে, এত সুন্দর প্রাণোচ্ছল এক যুবককে কিছুতেই জীবনের গোলকধাঁধায় হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না।

Leave a Comment

twenty − seven =

Welcome To Amaderbharat. We would like to keep you updated with the Latest News.