আরও খবর

তীর্থে তীর্থে পথে পথে, কামাখ্যা দর্শন (অষ্টম পর্ব)

স্বামী প্রৌঢ়ানন্দ

আমাদের ভারত, ১৪ নভেম্বর : অরুনকে নিয়ে নীচে নেমে এলাম। ওকে বললাম তুমি আমার সাথে চল। তোমার যেহেতু এখন থাকার কোনও ঠিকানা নেই, তাই এখন তুমি আমার কাছেই থাকবে। অরুণ নিঃশ্চুপ হয়ে আমার সাথে চলতে লাগল।

কিছুটা এগোনোর পর চোখে পড়ল এক শ্মশান। বেশ নিরিবিলি, যেন চরম নৈঃশব্দ্য বিরাজ করছে এখানে।শ্মশানের এক কোনে দেখি পাতার ছাউনি দিয়ে এক কুটির। কৌতূহল বশত ভিতরে উঁকি মেরে দেখি জটাজুটধারি এক সন্ন্যাসী ভিতরে পদ্মাসনে বসে আছেন। আমাদের দেখে ভিতরে ডাকলেন আয় ব্যাটা আয় ভিতরে আয়। আমি সাধুবাবাকে প্রণাম করে বসলাম। অরুণ কিন্তু চুপ চাপ, সে না বসে এক কোনে দাঁড়িয়ে রইল, সাধুবাবাকে প্রণামও করল না। হতে পারে ভণ্ড তান্ত্রিকদের পাল্লায় পড়ে সাধুদের সম্পর্কে ওর একটা তিক্ত ধারনা তৈরি হয়েছে। সাধুবাবার সেদিকে কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। তিনি বললেন, দাঁড়া তোদের জন্য চা বানাই, বলেই তিনি বাইরে বেরিয়ে গেলেন। গাছের আড়ালে তাকে আর দেখতে পেলাম না। ভাবছি সাধুবাবা কোথায় চা করতে চলে গেলেন? বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। মিনিট দশেকের মধ্যেই বাবা ফিরে এলেন একটা ট্রেতে তিন ভাড় চা নিয়ে আর তার সাথে গরম সিঙ্গারা। আমি অবাক হয়ে সাধুবাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, নেনে তাড়াতাড়ি খেয়েনে ঠান্ডা হয়ে যাবে। আমি বাবার প্রসাদের সদ্ব্যবহার শুরু করে দিলাম কিন্তু অরুণ তখনও দাঁড়িয়ে। ও যেন সাধুবাবাকে বিশ্বাস করতে পারছেনা।

এবার সাধুবাবা অরুনের দিকে তাকালেন বললেন,বাবা দুটো কি তিনটে সাধুর কাছে ঠকে তুই কি সব সাধুদের ঠক, জোচ্চোর ভেবে নিয়েছিস? একটা মেয়ে তোকে ঠকিয়েছে বলে কি সমগ্র নারীজাতি খারাপ হয়ে গেল? সাধুবাবার কথা শুনে আমিতো বটেই অরুণও চমকে উঠল। এসব কথাতো সাধুবাবার জানার কথা নয়, তবু উনি জানলেন কি করে? অরুণকে দেখলাম কাঁদতে কাঁদতে সাধুবাবার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়তে। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে রইলাম। অরুণকে শান্তনা দেব নাকি সাধুবাবার কথা শুনব?

অনেকক্ষণ ধরে অরুণ সাধুবাবার পা ধরে কাঁদতে লাগল। আমি থামাতে গেলে সাধুবাবা ইশারায় নিষেধ করলেন। বহুক্ষন পর অরুণ শান্ত হলে সাধুবাবা জিজ্ঞাসা করলেন, কিরে মন ঠান্ডা হল? অরুণ উত্তর দিল, মাঝে মাঝেই ঐ চিন্তা আমায় পাগল করে দিচ্ছে বাবা। মনে হচ্ছে ঈশ্বর একবার মনালীর সাথে দেখা করিয়ে দাও, তাকে জিজ্ঞেস করব সে এমনভাবে আমাকে ঠকাল কেন? সাধুবাবা স্মিত হেসে বললেন ওরে জীবনে কেউ ঠকে না,আর কেউ জেতে না। তুই আজ যেটাকে ঠকা ভাবছিস সেটাই তোকে ভবিষ্যতে বিজয়ীর বরমাল্য পরাবে, আবার যেটাকে বর্তমানে জেতা ভাবছিস সেটাই তোকে গহন অন্ধকার কূপে নিক্ষেপ করবে। তাই ঠকা জেতাটা বড় কথা নয়, সকল পরিস্থিতিতে তুই সৎ পথকে ধরে আছিস কিনা সেটাই বড় কথা। এই যে তুই মনালীকে বস করতে চেয়েছিলি এতে তার প্রচন্ড কষ্ট হত এমনকি মারা পর্যন্ত যেতে পারত। ভগবান দয়া করে তোকে সেই পাপ থেকে রক্ষা করেছেন, কিন্তু তোকে কিছু আর্থিক দণ্ড দিয়ে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিয়ে দিয়েছেন। আবার ভোগ শেষ হলে পৌঢ়ানন্দের সাথে তোর দেখা করিয়ে দিলেন। কিন্তু বাবা মনালীকে আমি কিছুতেই ভুলতে পারছি না। যখনই ওর কথা মনে পড়ছে আমি উন্মাদের মতো হয়ে যাচ্ছি। আপনি আমায় কৃপা করুন, নইলে আমি পাগল হয়ে যাব।

সাধুবাবা হাসলেন, বললেন পাগল হবি কিরে, তোর যে এখন অনেক কাজ বাকি। বলেই সাধুবাবা তার ধুনি থেকে ছাই নিয়ে অরুনের কপালে বাম হাতের মধ্যমা দিয়ে স্পর্শ করলেন। অরুণ অস্ফুট স্বরে আঃ বলে গভীর নিদ্রায় ঢলে পড়ল। আমি সাধুবাবার মুখের দিকে তাকাতেই উনি বললেন অরুণ এখন অনেকক্ষণ ঘুমাবে, তুই এখন চলেযা। কাল সকালে এসে ওকে নিয়ে যাবি।

উত্তেজনায় সারারাত ঘুম এল না। অপেক্ষার রজনী বড় দীর্ঘ মনে হতে লাগল। কি জানি অরুণ কেমন আছে, ছেলেটার উপর ব্ড্ড মায়া পড়ে গেছে। এত বড় বাড়ীর ছেলে কিভাবে পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে? তবে মনে আমার আশা সাধুবাবা যখন অরুণকে নিজের কাছে রেখেছেন, তখন এর পিছনে নিঃশ্চয় গূঢ় কোন রহস্য আছে। ভোরের আলো ফুটতেই বেরিয়ে পড়লাম। সাধুবাবার আস্তানায় পৌঁছে দেখলাম অরুণ একলা বসে আছে। আমাকে দেখেই জড়িয়ে ধরল, মুখে তার হাসি। আগের দিনের চিন্তা, হতাশার লেশ মাত্র তার মুখে নেই। আমি অবাক, এই এক রাতে কি এমন ঘটনা ঘটল যে, অরুণ একেবারে পাল্টে গেল? জিজ্ঞাসা করলাম, সাধুবাবা কোথায়? তুমিই বা কেমন আছ? সব বলছি আগে আপনি বসুন। আমি বসে পড়লাম। অরুনের কাছ থেকে সব কিছু না শোনা পর্যন্ত আমার কৌতূহল মিটবে না, তাই বললাম হ্যাঁ অরুণ বল আমাকে সব খুলে বল।
অরুণ শুরু করল, কাল সাধুবাবা আমার কপালে স্পর্শ করা মাত্র আমি জ্ঞান হারালাম। নিজেকে মনে হতে লাগল চরম অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছি, কেউ কোথাও নেই, সম্পূর্ণ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে আমি একা। আমার চিন্তা শক্তি লোপ পেয়েছে। ধীরে ধীরে অন্ধকার লোপ পেয়ে শুরু হল আলোর রোশনাই, রঙ বেরঙের আলো, মনে হতে লাগল আমারই দুই ভ্রুর মাঝখান থেকে ঐ আলোর ছটা বেরিয়ে আসছে। মনের মধ্যে এক অপরিসীম আনন্দ, এই অবস্থায় যেন আমি চিরকাল থাকতে পারি। ধীরে ধীরে মানস চক্ষে ফুটে উঠল এক শহর, তার মাঝে এক প্রাসাদোপম বাড়ি। বাড়ির ভিতরে আমি, আর একি?– মনালী আমার পায়ের উপর পড়ে কাঁদছে। কিছুটা দূরে খাটের উপর শুয়ে রয়েছে একটি ফুটফুটে শিশু। মনালী আমাকে বারবার কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু আমি কিছু না শুনেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে চলে যাচ্ছি। এরপর আমার আর কিছু মনে নেই। ঘুম ভাঙলে দেখি সাধুবাবা আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছেন। আমায় জিজ্ঞাসা করলেন, কিরে ঘুম হল? দর্শনের কথা বলতেই উনি বললেন, এটা তোর পূর্ব জন্মের স্মৃতি। গত জন্মে তুই তোর স্ত্রী পুত্রকে অসহায় অবস্থায় ত্যাগ করে চলে গিয়েছিলি, সেই জন্মে যে ব্যথা তুই মনালীকে দিয়েছিলি, এই জন্মে সেই ব্যথা কর্মফল হিসেবে তোর কাছে ফিরে এল। কিন্তু আগের জন্মের কিছু সাধনা লব্ধ ফল তুই অর্জন করেছিলি, তাই তুই এই নব জন্ম লাভ করলি। পৃথিবীতে কোনও সম্পর্কই চিরস্থায়ী নয়, আপন কর্ম অনুযায়ী তারা আসবে যাবে। তাই সম্পর্ককে চিরন্তন সত্য না ধরে সৎ কর্ম করে যা, তাতেই হবে সত্যিকারের আত্মিক উন্নতি।

আমি সাধুবাবার পায়ে লুটিয়ে পড়লাম। বললাম, বাবা আমাকে আপনার সাথে নিয়ে চলুন, আমাকে আপনি দীক্ষা দিন। বাবা বললেন তোর এখনও দীক্ষার সময় হয়নি। এখন তুই বাড়ি ফিরে যা, বাবা মায়ের সেবা কর, ক্ষমতা অনুযায়ী মানুষের সেবা কর, ঠিক সময় হলেই প্রভু তোকে ডাক দেবেন। যাক, এখন আমি এই স্থান ত্যাগ করব, প্রৌঢ়ানন্দকে বলিস ঠিক সময়ে তার সাথে আমার আবার দেখা হবে, আর তাকে বলবি তোর বাড়ি যাবার ব্যবস্থা করে দেবে।
বাবার কুটির থেকে দুজনে বেরিয়ে এলাম। অরুনের হাতে কিছু টাকা দিয়ে বললাম তুমি বাড়ি ফিরে যাও। অরুণ আমাকে প্রণাম করে বলল, আমি আমার জীবনের দীশা পেয়ে গেছি, আজ থেকে এ জীবন আমার নয়, সাধারণ মানুষের জন্য আমি নিজেকে উৎসর্গ করলাম, নিজেকে যেন নতুন করে বুঝলাম। এখন কোনও ব্যক্তিগত দুঃখ আর আমাকে পীড়া দিচ্ছে না, কিন্তু আমি জানি কত দুঃখী মানুষ সংসারে আছে, তাদের সেই দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার জন্য আমি আকুল হয়ে আছি, আমি চললাম। আপনার কাছেও আমি ঋণী হয়ে রইলাম, তাই কোনও না কোনো জন্মে আবার আপনার সাথে আমার সাক্ষাত হবে, আপনাকে হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে জানাই প্রণাম।

Leave a Comment

three × five =

Welcome To Amaderbharat. We would like to keep you updated with the Latest News.