কীর্তনে-কলরবে মুখরিত খড়দা

ড. কল্যাণ চক্রবর্তী
আমাদের ভারত, ২৬ অক্টোবর: খড়দা এক প্রাচীন এবং ঐতিহ্য-মণ্ডিত জনপদ। যুগের পর যুগ তাতে পড়েছে নানান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রলেপ। সাহিত্যের মধ্যে রয়েছে তার অবশেষ, মাটি খুঁড়েও মিলেছে অসংখ্য নিদর্শন। খড়দার কীর্তন-সংস্কৃতি তার অন্যতম।

শ্রীমন্মহাপ্রভুকেই সংকীর্তনের প্রবর্তক এবং পিতা বলা হয়। শ্রীচৈতন্য-পার্ষদ নিত্যানন্দ এলেন খড়দহের মাটিতে। দুই পত্নী বসুধা ও জাহ্নবাদেবীকে নিয়ে বসবাস করতে লাগলেন এই পুণ্যভূমিতে। খড়দায় নিত্যানন্দের কুঞ্জবাড়ি, এক অমোচ্য তীর্থস্থান। তাঁর প্রয়াণের পর জাহ্নবাদেবী বৈষ্ণব-মত প্রচারের মূল দায়িত্ব সামলেছিলেন। এক বিধবা মহিলার আঁচলে বাঁধা পড়ল সমগ্র বাংলা, নিখিল ভারতের আধ্যাত্মিক-আলয়ের আরও এক চাবিরতোড়া। একটি সম্প্রদায় যখন কালো কাপড়ে ক্রমাগত ঢেকে যেতে শুরু করেছে, তারই বিপ্রতীপে নারীর ক্ষমতায়ন দিয়ে শুরু হচ্ছে নতুন ইতিহাস। এদিকে বসুধা-মাতার পুত্র বীরভদ্র, যাঁকে জাহ্নবাদেবী আপন সন্তানের মতোই মানুষ করেছিলেন, তিনি খড়দারই ভূমিপুত্র, অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান, পণ্ডিত, দিব্যজ্ঞানী। নিত্যানন্দ-পরিবার দীর্ঘদিন খড়দায় বসবাস করেছেন এবং দেশব্যাপী সংকীর্তনের বন্যা বইয়ে দিয়ে তারই একটি বান খড়দার বুকেও আছড়ে দিয়েছেন। খড়দহে শ্রীশ্রীরাধাশ্যামসুন্দর মন্দিরকে কেন্দ্র করে একদা কীর্তন-গানে মুখরিত থাকতো জনপদ। কীর্তনে অংশ নিতে আসতেন বঙ্গদেশের নানান অঞ্চলের মানুষ–ব্রাহ্মণ, মুচি, মেথর, ডোম। শ্রীহরিকে সকলের মধ্যে ভক্তিতে, ভালোবাসায় সহজেই পৌঁছে দিল কীর্তনাঙ্গের গান। গানের পর হরির লুঠের প্রচলন হল, তাতে আলাদা আলাদা বর্ণের মানুষ মিলেমিশে এক হয়ে বাতাসা কুড়িয়ে নিলেন। জন্ম নিল ধর্মীয় সাম্যবাদ।

আধুনিক রহড়ার জনক পুণ্যশ্লোক স্বামী পুণ্যানন্দজী খড়দা-রহড়ার বুকে কীর্তন সঙ্গীতকেও জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। আশ্রমের বিবিধ অনুষ্ঠান কীর্তন ছাড়া ছিল অসম্পূর্ণ। সমকালীন বাংলায় এমন কোনো বিখ্যাত কীর্তনীয়া ছিলেন না, যিনি রহড়া বালকাশ্রমের কোনো কার্যক্রমে সঙ্গীত পরিবেশন করেননি। হরিসভা এবং নানান হরিবাসরগুলিতে, অষ্টপ্রহর নামসংকীর্তনে তিনি সর্বদা সম্মানিত অতিথি হিসাবে থাকতেন এবং সপার্ষদ কিছুটা সময় অতিবাহিত করতেন। খড়দহের সমস্ত কীর্তনের দলগুলির মধ্যমণি ছিলেন তিনি। কীর্তনের সুরে গুনগুন করে তিনি গাইতেন, “আমি শুধাই ব্রজের ঘরে ঘরে/কৃষ্ণ কোথায় বল।/কেউ বলে না কথা দেখি/সবার চোখে জল।”

‘কীর্তন’ হচ্ছে ঈশ্বরের মহিমান্বিত ভক্তিরসাত্মক ভজন-সঙ্গীত, ঈশ্বরের যশোগান, ভগবানের কীর্তিগাথা। এই সঙ্গীত বাংলার নিজস্ব সম্পদ, আপনার রূপ ও ঐতিহ্য, বাংলার লোকসংস্কৃতির মূলরোমে জলের টান, চৈতন্য ধারা। ভগবানের রসলীলার সঙ্গে সাঙ্গীতিক রসলীলা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় কীর্তনে। রসসিক্ত পদসাহিত্যে সুর যোগ করেই হল কীর্তন। ‘গীতগোবিন্দ’ হয়ে ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’-এ অনুসারী হয়েই নামটি সকলের মধ্যে পৌঁছে গেলো। কীর্তনের মঞ্চ একদা হয়ে উঠল বাংলার স্পিরিচুয়াল হাসপাতাল, আধ্যাত্মিক আরোগ্যালয়।

কামারপুকুরের মাঠে-ময়দান কীর্তন-গানে সিক্ত, পবিত্র, ‘চৈতন্য’ হয়েছিলেন পরমপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণ। তাই কীর্তন গানে তাঁর সমাধি হত, বাহ্যজ্ঞানশূণ্য হয়ে যেতেন তিনি। যেমন কীর্তনের মধ্যেই অষ্টসাত্ত্বিক বিকার প্রকাশিত হত গৌরহরির, বাহ্যদশা বিলুপ্ত হয়ে প্রেমানন্দ-সাগরে তখন তাঁর বৃদ্ধি! শ্রীরামকৃষ্ণ কীর্তন-সম্রাট গোবিন্দ অধিকারীর সুরে গান গাইছেন, “বৃন্দাবন-বিলাসিনী রাই আমাদের — রাই আমাদের, আমরা রাইয়ের, রায় আমাদের” আর ক্রমশ ডুবে যাচ্ছেন সচ্চিদানন্দে। বাগবাজারে বলরামবাবুর বাড়িতে কীর্তনীয়া বৈষ্ণবচরণ ঠাকুরকে কীর্তনে আবিষ্ট করছেন, “দুর্গানাম জপ সদা রসনা আমার। দুর্গমে শ্রীদুর্গা বিনা কে করে নিস্তার।” বাংলার শ্রেষ্ঠ কীর্তনীয়ারা গানের ছাপানো কাগজ ঠাকুরের কাছে রেখে প্রণাম করতেন। ঠাকুরও পানিহাটির চিঁড়ে-দধি মহোৎসবে যতবার এসেছেন কীর্তনের আবহাওয়ার মধ্যে সাক্ষাৎ-সামিল হয়েছিলেন। ঠাকুরের শরীর যাবার পর বরানগর মঠের পোড়োবাড়িতে নরেন্দ্রনাথ গুরুভাইদের সঙ্গে কীর্তনের সঙ্গে উদ্দাম নৃত্য পরিবেশন করছেন। শ্রীরামকৃষ্ণ ও তাঁর পার্ষদ-পরিকরবৃন্দ ছিলেন কীর্তনের অকুণ্ঠ সমর্থক ও প্রচারক।

এ প্রসঙ্গে ভানুসিংহ-রবীন্দ্রনাথের কথাও আমরা মনে করতে পারি। “গহন কুসুম কুঞ্জ মাঝে” গানটি দিয়ে কীর্তনের সুরে নিমজ্জিত হলেন ষোল বছরের কিশোর; সে পদাবলীর সাগর, তা থেকে আর উঠলেন কই! এরপর জমিদারীর কাজে পূর্ববঙ্গে তাঁর চিন্তা-চেতনায় আরও গভীরে প্রবেশ করল কীর্তনের শান্তিবারি, লিখলেন কীর্তনাঙ্গের বহু গান। এমনকি জাতীয় সঙ্গীতের মধ্যেও একটি স্থানে প্রবেশ করিয়ে দিলেন কীর্তনের সুর, সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের মধ্যে ধরা রইলো কীর্তনের পরশ, “জয় হে জয় হে জয় হে”, হরি বোল, হরি বোল, হরি বোল।

যে সঙ্গীতের বিশুদ্ধরূপ এখনও শোনার জন্য মানুষ উদগ্রীব, পারলৌকিক কাজের অঙ্গ হিসাবে শান্তিস্বস্ত্যয়নে যে সঙ্গীতের তুলনা নেই, সহজ সরলমতি মানুষের কাছে যে সঙ্গীতের মধ্যে দিয়ে ঐশীবাণী পৌঁছানো সু-সম্ভব, তার আদর বর্তমান সঙ্গীত-পরিচালকেরা করেন না। কীর্তন গাইয়েদের চটুল গান গাইতেই উৎসাহ দেওয়া হয়, গীতিকারদেরও সাত্ত্বিক জীবনের অভাব।

কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পারফর্মিক আর্ট হিসাবে ‘কীর্তন’, কেবল এই বিষয়টাই পুরোপুরি শিখবেন, শিখবেন তার ইতিহাস-ভূগোল-সমাজবিদ্যা এমন সুযোগ কখনোই নেই। পাঁচমিশালি সঙ্গীত শেখার মাঝে ‘কীর্তন’ নিতান্তই একটি অবহেলিত পাঠক্রম। যেহেতু হিন্দুধর্মের মাহাত্ম্য কীর্তনীয়ার মধ্যে কীর্তনের উজ্জ্বল আয়োজন, তাই তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের কাছে এ এক অপ্রয়োজনীয় বালাই। বিবেক-বিকৃতি, অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ, অন্যায়-অবহেলা কীর্তনকে তাই শেষ করে দিচ্ছে। প্রবীণ শিল্পী, যারা এই সংস্কৃতির যথার্থ ধারক ও বাহক ছিলেন, তাঁরা এক এক করে চলে যাচ্ছেন, আর পড়ে থাকছে শূণ্য মরুভূমির সংস্কৃতি। অনতিবিলম্ব বাংলার প্রবুদ্ধ মানুষ কীর্তন-সংস্কৃতিকে মান্যে ও মর্যাদায় উড্ডীন করে তুলবেন, এটাই আজকের স্বাভিমান, এটাই আজকের দাবি। খড়দার মন্দির, দেবালয় ও হরিবাসরগুলি আবারও কীর্তনে কলরবে মুখরিত হয়ে উঠুক, এই শুধু কামনা। জয় ভগবান চক্রপাণি পুরুষোত্তমের জয়। জয় গৌর ভক্তবৃন্দের জয়।

আপনাদের মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here