মাথার ওপর ছাদ নেয় না মানকরের ক্ষ্যাপা কালী

জয় লাহা, দুর্গাপুর, ২৬ অক্টোবর: ভাঙ্গাচোরা ঘরবাড়িগুলো দেখলেই মনে হয় অতীতে জমিদারদের বসবাস ছিল। বর্ধমান জেলার ইতিহাস প্রসিদ্ধ গ্রাম মানকর। আজ থেকে প্রায় চারশো বছর আগে এই মানকরে ভুবনেশ্বরীদেবী মা-কালীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে পুজো শুরু করেন। শুরুতে মানকর নাককাঁটি শ্মশানের সুড়ঙ্গ পথের পাতালে পুজো করতেন। পরে ঝড় বৃষ্টিতে ভুবনেশ্বরীদেবীর শ্মশানে যেতে অসুবিধা হত। সেই জন্য তিনি দেবীকে নিজের বাড়িতে আসার অনুরোধ করেন। আজ থেকে প্রায় পাঁচ’শ বছর আগে মা-কালী সম্মত হয়ে ভুবনেশ্বরীকে স্বপ্বাদেশ দেন। এরপর ভুবনেশ্বরী দেবী মাকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে আসেন। বর্তমানে যা মানকর নায়েক পাড়া। ভুবনেশ্বরীদেবী মাকে রাখার জন্য মন্দির ও নিজের বাড়ি তৈরীর কাজ একই সঙ্গে শুরু করেছিলেন। মন্দিরের ছাদ আগে না করে, নিজের বাড়ির ছাদ ঢালাই করার জন্য মা এখনও পর্যন্ত ছাদ নেয়নি। যিনি ঢালাই করার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনিই মারা গেছেন। ১৮৮৫ সালে ভুবনেশ্বরীদেবীর এক বংশধর কালিদাস নায়েক মায়ের ছাদ তৈরীর উদ্যোগ নিলে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। আর তাই এখনও সেই ছাদহীন মন্দিরেই পুজো হন মা।

ভুবনেশ্বরী দেবী মায়ের পুজোয় ভোগে দিতেন মায়ের নামে ভাস্কর পুকুরের সাতসের এক পোয়া মাছের টক, একটা বড় রুই মাছ ভাজা, সাত রকমের সরবত, সাত রকম কলাই ভেজানো, চৌদ্দরকমের মিষ্টি, পাঁচ সের এক পোঁয়া ওজনের একটি কদমা। এক সলি করে দু-জায়গায় দু-সলি চালের নৈবিদ্য। নিজে পালন করা সাদা অথবা কাল রঙের একটি পাঁঠা বলি দেওয়া হত। এছাড়াও দিতেন মদ। আগের মত সবই ভোগে দেওয়া হলেও মদ এখন আর দেওয়া হয় না। তার পরিবর্তে কাঁসার গ্লাসে ডাবের জল কিম্বা পাঁচ রকমের সর দেওয়া হয়। এছাড়ও এখনও রীতি মেনে কল্যাণ পালের
(পুকুরের নাম) জলে মায়ের সমস্ত পুজোর কাজ ও ভোগ রান্না হয়। মা বড়ই ক্ষ্যাপা। অনাচার একেবারে পছন্দ করেন না। ভুবনেশ্বরী দেবীর দৌহত্র সুত্রে বর্তমান বংশধর সুমন্ত সারথী রায়। তিনি জানান, “একবার আমাদের এক পূর্বপুরুষ মদ খেয়ে মায়ের পুকুরে মাছ ধরতে নেমেছিলেন, সঙ্গে সঙ্গে বুকে যন্ত্রনা উঠে মারা যায়। তাছাড়াও সন্ধ্যার পর মায়ের মন্দিরের পাশ দিয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ। মায়ের বিড়ম্বনার জন্য শিকল বেঁধে রাখা হয়। মানকর বাগানপাড়ার বাউরিরা ছাড়া অন্য কেউ প্রতিমা নিরঞ্জন করতে পারবে না। পুজোর পরদিন সন্ধ্যার মধ্যে আগে মা’য়ের বিসর্জন হবে। কোনওরকম শোভাযাত্রা মা পছন্দ করে না বলে মায়ের বিসর্জনে শোভাযাত্রা হয় না।”

ভ্রাতৃদ্বিতীয়ার দিন ওই পরিবারের বউয়েরা সতীতলায় পুজো দিয়ে মাটি নিয়ে আসেন। কথিত আছে, ওই বংশের এক ডাকাত বজরায় (নৌকা) তার জামাইকে খুন করেছিল। একরাতে তার মেয়ে জামাই যখন বজরায় করে বাপের বাড়ি আসছিল ওই সময় ওই ডাকাত ডাকাতির উদ্যেশ্যে রাস্তা আটকে দাঁড়ায়। শত অনুরোধ করার পরও মেয়েকে চিনতে পারেনি ওই ডাকাত। শরীরের গয়না না দেওয়া খুন করেছিল তার জামাইকে। পরেরদিন মেয়ের জ্ঞান ফেরার পর নিজের মেয়ে জামাইকে চিনতে পারে। তখন ওই মেয়ে জামাইকে সতীতলায় এক সঙ্গে সহমরণ করেছিল। সেই থেকে পুজোর পরদিন ওই সতীতলায় পরিবারের বউ, মেয়েরা পুজো দিয়ে আসেন। এবং সেখানের মাটি নিয়ে আসেন। পুজোর দিন এখনও আশপাশের গ্রাম থেকে পুন্যার্থীদের ঢল নামে।

        

   

আপনাদের মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here