পূর্ববঙ্গে হিন্দুদের স্মৃতি (৩৮) মুছে যাচ্ছে উল্লাসকর দত্তর স্মৃতির ভিটে, মন্তব্য তথাগতর

অশোক সেনগুপ্ত
আমাদের ভারত, ২৯ নভেম্বর:
“শনিবার বেলা দশটার পরে জজকোর্টেতে লোক না ধরে মাগো
হল অভিরামের দ্বীপ চালান মা ক্ষুদিরামের ফাঁসি।”

বিপ্লবী উল্লাসকর দত্ত ‘অভিরাম’ ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। তাঁর তৈরি বোমা ছুড়েই ক্ষুদিরাম ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে বহনকারী গাড়ি ভেবে ভুল করে দুজন ইংরেজ মহিলাকে হত্যা করেছিলেন। এই অপরাধে ২ মে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ উল্লাসকরকে মুরারিপুকুর বাগান থেকে গ্রেফতার করে। পরের দিনই মোজাফফরপুরে গুলিবিদ্ধ হয়ে ইংরেজ ব্যারিস্টার কেনেডি সস্ত্রীক নিহত হন।

গোয়েন্দা রিপোর্টে প্রমাণিত হয়, ৩০ এপ্রিল ক্ষুদিরাম কর্তৃক নিক্ষিপ্ত বোমাটি ছিল উল্লাসকরের তৈরি। বিচারে ক্ষুদিরাম ও বারীন্দ্রকুমার ঘোষের সঙ্গে মানিকতলা (আলিপুর) বোমা মামলায় অভিযুক্ত হিসেবে উল্লাসকরকেও মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। ১১ আগস্ট ক্ষুদিরামের মৃত্যুদন্ডাদেশ কার্যকর হলে উল্লাসকর তাঁর আইনজীবী চিত্তরঞ্জন দাশের বিজ্ঞতায় অব্যাহতি পান। ১৯০৯ সালে বারীন ঘোষের সঙ্গে তিনি আন্দামানে দ্বীপান্তরিত হন। ১৯২০ সালে তিনি মুক্তিলাভ করেন।

সেই বিপ্লবী উল্লাসকর দত্তর স্মৃতিচিহ্ন মুছে যাচ্ছে। এ নিয়ে বাংলাদেশে প্রচারমাধ্যমে লেখালেখি হচ্ছে। মেঘালয় ও ত্রিপুরার প্রাক্তন রাজ্যপাল তথাগত রায় টুইটারে লিখেছেন, “বাংলার অগ্নিযুগের বিপ্লবীরা (বেশিরভাগ পূর্ববাংলার, সবাই হিন্দু) আজকের বাংলাদেশে বিস্মৃত বলেই জানতাম। শুনেছি মাস্টারদা সূর্য সেনের পরিচয় ডাকাত হিসাবে। কালীকচ্ছ আমার মামার বাড়ির গ্রাম, সেখানে উল্লাসকর দত্তের বাড়ি নিয়ে আন্দোলন হচ্ছে শুনে ভালো লাগছে।“

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটলে জন্মভূমি কালীকচ্ছের বাঘবাড়িতে উল্লাসকর ফিরে আসেন। দীর্ঘ দশ বছর সেখানে তিনি নিঃসঙ্গ জীবন কাটান। জীবনের শেষ দিনগুলি বিপ্লবীদের আখড়ায় কাটানোর বাসনায় তিনি কলকাতায় চলে আসেন। ১৯৬৫ সালের ১৭ মে কলকাতায় তাঁর জীবনাবসান ঘটে।

কী লিখছে বাংলাদেশের প্রচারমাধ্যম? আরটিভি অনলাইনডটকম সম্প্রতি লিখেছে, “ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের কালিকচ্ছে ব্রিটিশবিরোধী স্বদেশি আন্দোলনের আপসহীন বিপ্লবী উল্লাসকর দত্তের বাড়ির স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলার প্রতিবাদে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়।অগ্নিযুগের এই অগ্নিপুরুষের আত্মত্যাগের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে তার জরাজীর্ণ বাড়ির স্মৃতি সংরক্ষণ জরুরি বলে মনে করেন জেলার সংস্কৃতিসেবীরা।

জরাজীর্ণ কাচারি ঘরটিই বিপ্লবী উল্লাস কর দত্তের সর্বশেষ স্মৃতি। সরাইল উপজেলার কালিকচ্ছ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আহমেদুর রহমান ক্রয় সূত্রে বাড়িটি তার বলে দাবি করে নব্বই দশকের শুরু থেকে বাড়িটি তার দখলে রেখেছেন। উল্লাসকরের কাছারি ঘর ঘেষা উত্তর দিকের ভবনটিতে সাবেক এই চেয়ারম্যান পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। প্রাচীন এই বাড়িটি অনেকবার ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে সম্প্রতি বাড়িটির সামনের অংশে বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য গর্ত করে ঢালাই কাজ শুরু করেন চেয়ারম্যান।“

উল্লাসকর দত্ত ১৯০৩ সালে এন্ট্রান্স পাশ করার পর ভর্তি হন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের রসায়ন বিভাগে। বিত্তশালী, শিক্ষিত, অভিজাত পরিবারের সন্তান হলেও প্রেসিডেন্সি কলেজের বনেদী আলো-বাতাসে গা ভাসিয়ে দেননি তিনি। দেশে ব্রিটিশ শাসন মেনে নিতে পারতেন না। কলেজের এক শিক্ষক প্রফেসর রাসেল বাঙালি জাতি সম্পর্কে অপমানসূচক কথাবার্তা বলতেন। একদিন সহ্য করতে না পেরে ওই প্রফেসরের ‘গায়ে হাত তোলেন’ উল্লাসকর দত্ত। ফলশ্রুতিতে তাঁকে কলেজ থেকে বহিস্কার করা হয়। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার ইতি ঘটলে তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে পূর্ণ মনোনিবেশ করেন।

বাংলাদেশের ’আজকের পত্রিকা’ ২৫ নভেম্বর লিখেছে, “ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা বিপ্লবী উল্লাসকর দত্তের জন্মভিটা সংরক্ষণের দাবিতে প্রতিবাদ সভা হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে সরাইল ইতিহাস সংরক্ষণ পরিষদের উদ্যোগে এ প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

উল্লাসকর দত্তের বাড়ি উপজেলার কালীকচ্ছে অবস্থিত। সেখানে তাঁর যে পৈত্রিক বাড়ি রয়েছে তাঁর বয়স ১৫০ থেকে ২০০ বছর। পুরো বাড়ির দৈর্ঘ্য প্রায় ৭০ ফুট ও প্রস্থ ২০ ফুট। এই বাড়িটি এখন ইতিহাসের অংশ। এ বাড়ি ধ্বংস করতে দখলদাররা নতুন ভবন নির্মাণ করছেন। তাই বিপ্লবী উল্লাসকর দত্তের জন্মভিটা সংরক্ষণ ও নতুন ভবন নির্মাণকাজ বন্ধের দাবি জানান বক্তারা। 

একই দাবিতে গত ২১ ও ১৬ নভেম্বর উল্লাসকর দত্তের বাড়ির সামনে মানববন্ধন ও ১৭ নভেম্বর জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।“

‘দি ডেলি স্টার’ পত্রিকায় মাসুক হৃদয় ২৫ নভেম্বর লিখেছেন, “ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার কালিকচ্ছ গ্রামে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী উল্লাসকর দত্তের ঐতিহাসিক বাড়ির সামনের অংশে পাকা ভবন তৈরি করে ঢেকে ফেলা হচ্ছে। ফলে, বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে অবিভক্ত ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে অগ্নিগর্ভ বাংলার অন্যতম বিপ্লবী উল্লাসকর দত্তের সর্বশেষ স্মৃতি।‌

বাড়িটির সামনের অংশ ঢেকে বহুতল ভবন গড়ে তুলছেন ক্রয়-সূত্রে বাড়িটির মালিক কালিকচ্ছ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আহমেদুর রহমান। যদিও বিপ্লবী উল্লাসকর দত্তের উত্তরসূরি নেই। পূর্বসূরি যারা ছিলেন তারা মহান মুক্তিযুদ্ধের অনেক আগেই ভারতে পাড়ি জমিয়েছেন। তবুও এই সাবেক চেয়ারম্যান দাবি করেন, উল্লাসকর দত্তের জ্ঞাতি ভ্রাতুষ্পুত্র শিবেন্দ্র কুমার দত্তের কাছ থেকে বাড়ি ও পুকুরসহ ৮০ শতাংশ জায়গা তিনি ১৯৯০ সালে কিনেছেন।”

প্রসঙ্গত, “বিপ্লবী উল্লাসকর দত্ত আন্দামান সেলুলার জেলে থাকাকালে সরষে পেষার ঘানিতে কাজ করা, প্রচণ্ড রোদে মাটি কেটে ইট বানানো, গাছ কেটে লাকড়ি বানানোসহ অনেক কাজ তাকে করতে হতো। ইত্যাদির কাজ করার পরও তাঁর উপর চলতো নানাধরনের নির্যাতন। চলত দু’ হাত ওপরের দিকে তুলে দেওয়ালে বেঁধে দাঁড় করিয়ে রাখা মতো জঘন্য অত্যাচার। এসমস্ত কারণে উল্লাসকর দত্ত অসুস্থ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে তাঁকে মাদ্রাজের পাগলা গারদে নিয়ে আসা হয়। সুস্থ হয়ে উঠার পর সেখানেও শাস্তির মাত্রা আরও বেড়ে যায়। প্রতিদিন সকালে তাঁর মাথা চট দিয়ে ঢেকে লোহার দণ্ড দিয়ে আঘাত করা হত। এই আঘাতের কারণে তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন। ১৯২০ সালে তিনি মুক্তি পান।“ (‘প্রহর‘, ১৫ আগস্ট, ২০১৯)।

অনলাইন পত্রিকা ‘সববাংলায়’লিখেছে, “দেশভাগকে তিনি সমর্থন করতে পারেননি। এই সময়ে তিনি কারাবন্দী জীবনের কাহিনী ‘কারাজীবন’ ও ‘দ্বীপান্তরের কথা’ নামক দুটি গ্রন্থে লেখেন। স্বাধীনতার দশ বছর পরে ১৯৫৭ সালে প্রথমবারের জন্য কলকাতায় এসে তিনি জানতে পারেন তাঁর বাল্যকালের বান্ধবী এবং তাঁর গুরু স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপিনচন্দ্র পালের কন্যা লীলা বিধবা হয়েছেন এবং তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত। তখন উল্লাসের বয়স ৬৩ বছর। সারাজীবন নিঃসঙ্গ থাকার পরে প্রৌঢ় বয়সে তিনি লীলাকে বিবাহ করেন। বিয়ের পরে তাঁরা প্রথমে ওঠেন রামমোহন লাইব্রেরির বারান্দায়, তারপর টালিগঞ্জ ট্রাম ডিপোর কাছে একটা ছোট্ট বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। এমনকি এর মধ্যে কিছুদিন বৌবাজারের একটা ভাড়াবাড়িতেও থেকেছেন তাঁরা। ভয়ানক আর্থিক কষ্টের মধ্যে থেকেও পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্ত্রীর চিকিৎসায় কোনও ত্রুটি রাখেননি উল্লাস। এরপরে তাঁর সহৃদয় বন্ধুদের সহযোগিতায় তিনি সস্ত্রীক শিলচরে চলে আসেন। এখানে আসার পরে শিলচরের বাসিন্দারাই তাঁদের দেখাশোনা ও ভরণপোষণের দায়িত্ব নেন। ১৯৬২ সালে তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুর পরে তিনি বছর তিনেক নিঃসঙ্গ জীবন কাটান।“

ব্রিটিশদের মোকাবিলায় বাংলায় প্রথম বোমা তৈরি করেছিলেন উল্লাসকর দত্ত। বাংলার বিপ্লববাদের সেই ট্রাজিক নায়কের কথা থেকে যাবে কেবলই কি বিস্মৃতির চাদরে ঢাকা বইয়ের পাতায়?

আপনাদের মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here