ছাত্রী মায়েরা আর শিক্ষিকার ভূমিকায় তাদেরই মেয়েরা

ছাত্রী মায়েরা আর শিক্ষিকার ভূমিকায় তাদেরই মেয়েরা

আমাদের ভারত, উত্তর দিনাজপুর, ২০ জুলাই: জীবনে একদিন যাঁর হাত ধরে প্রথম শিক্ষাঙ্গনে পা রেখে শিক্ষালাভ করেছে, আজ তাঁকেই অক্ষর চিনিয়ে স্বাক্ষরতার পাঠ দিচ্ছে সুনীতা, নিকিতা ও ফারহাত বানুরা। বিদ্যালয়ে নিজেদের লেখাপড়ার শেষে বা অফ পিরিয়ডে শ্রেণিকক্ষে মায়েদের পড়াশুনা শিখিয়ে স্বাক্ষর করে তুলছে খুদে ছাত্রছাত্রীরা। রীতিমতো দক্ষ শিক্ষিকার মতো হাতে ধরে অক্ষর চেনানো থেকে পাঠদান করছে খুদে পড়ুয়ারা। উত্তর দিনাজপুর জেলার গোয়ালপোখর ব্লকের প্রত্যন্ত গ্রাম হরিপুর জুনিয়র হাই স্কুলে চলছে এমনই এক অনন্য সাক্ষরতা অভিযান। ছাত্রী রূপে মায়েরা আর শিক্ষিকার ভূমিকায় তাদেরই মেয়েরা পুরো উদ্যোমে গড়ে তুলতে চাইছে সাক্ষর হরিপুর গ্রাম।

এরা কেউ মাঠে ঘাটে কাজ করেন, কেউবা আবার দিনমজুরের কিংবা শ্রমিকের কাজ করেন। অনেকে আবার শুধুই গৃহস্থালির কাজ নিয়েই ব্যাস্ত থাকেন। এরা কোনওদিন স্কুলের মুখ দেখেননি হয়তো বা দারিদ্রতার কারনে নয়তো তাদের পরিবারের উদাসীনতার কারনে। লেখাপড়া শেখা বা নিজের নামটুকুও সই করতে পারেন না তারা৷ এরা উত্তর দিনাজপুর জেলার গোয়ালপোখর ব্লকের প্রত্যন্ত গ্রাম হরিপুর জুনিয়র হাইস্কুলের ছাত্রছাত্রীদের মায়েরা৷ এরা আজ শুধু স্বাক্ষর হওয়াই নয় রীতিমতো পড়াশুনা শিখছেন তাদেরই সন্তানদের কাছে, যারা এই স্কুলের কেউবা পঞ্চম, কেউবা ষষ্ঠ অথবা সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী।

হরিপুর জুনিয়র হাইস্কুলের ছাত্রীরা তাদের অফ পিরিয়ডে বা নিজেদের পড়াশুনার শেষে স্কুলের শ্রেণিকক্ষেই তাদের মায়েদের স্বাক্ষর করার কাজ করে চলেছে৷ বিপুল উৎসাহ আর উদ্দীপনা নিয়ে মায়েরাও রোজ নিয়ম করে হাতে স্লেট পেন্সিল বা বই খাতা নিয়ে চলে আসছেন বিদ্যালয়ে সন্তানদের কাছে পড়াশুনা শিখতে। দক্ষ শিক্ষিকার মতো মায়েদের ছবির মাধ্যমে অক্ষর চেনানো বা বই থেকে পাঠদান দিচ্ছে খুদে পড়ুয়ারা।

শিক্ষিকার মতো মাকে পড়াশুনা শেখাতে খুবই ভালো লাগছে বলে জানালো হরিপুর জুনিয়র হাইস্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী নিকিতা দাস। তাদের কথায় মা পড়াশুনাটা শিখলে বাড়িতে অন্তত শিক্ষার চর্চাটা হবে। মেয়েদের কাছ থেকে পড়াশুনাটা শিখতে পেরে নিজেরা খুবই উপকৃত বলে জানালেন মায়েরা। এখন আর ব্যাঙ্কে গিয়ে টিপসই দিতে হবে না, সাক্ষর করেই টাকা তুলতে পারবেন তাঁরা। পাশাপাশি এখন তাদের আর কেউ ঠকাতে পারবে না।

অভাব অনটন বা সংসারের চাপে কিংবা পরিবারের উদাসীনতায় তাঁরা লেখাপড়া শিখতে পারেননি, আজ মেয়েদের কাছ থেকেই পড়াশুনা শিখে স্বাক্ষর হতে পেরেছেন তারা। তাঁরা শিখতে চান কীভাবে সমাজে চলাফেরা করতে হয় তার শিক্ষাও। হরিপুর জুনিয়র হাইস্কুলের খুদে ছাত্রছাত্রীদের এক অনন্য শিক্ষা অভিযানে একদিন পুরো হরিপুর গ্রামটাই স্বাক্ষর হয়ে উঠবে এটা অনস্বীকার্য। আর গ্রামের নিরক্ষর মায়েদের এখন মুখে একটাই স্লোগান, “এসো লেখাপড়া শিখি আর ডানা মেলে উড়ি।”

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five + seven =