খাদের ধারে সংবাদপত্র

অশোক সেনগুপ্ত

আমাদের ভারত, ২২ জুন:
“ছেলেবেলা থেকেই কাগজ পড়তাম। এখন বাড়িতে আর কাগজ রাখিনা।“ কথাটা দীর্ঘদিনের সাংবাদিক নিমাই দে-র। “আগে একাধিক কাগজ রাখতাম। এখন একটি ইংরেজি দৈনিক রাখি। ফোর্থ এস্টেট শেষ হয়ে গিয়েছে“। এই মন্তব্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রাক্তন উপাচার্যর। 

কয়েক বছর আগে পর্যন্ত অনেকে সকালে অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতেন কাগজওয়ালার জন্য। দিনের প্রথম এবং অন্যতম প্রধান কাজ ছিল গোগ্রাসে কাগজ পড়া। আর এখন পশ্চিমবঙ্গ-সহ গোটা দেশে পাঠকের সংখ্যা দ্রুত কমছে। কারও জবাব, “অত সময় নেই কাগজ পড়ার“। কারও উত্তর, “যেভাবে খবর প্রকাশিত হচ্ছে, কাগজ পড়া ছেড়ে দিয়েছি’। কেউ বা বলছেন “অনলাইনই ভালো“। 

সংবাদপত্র শিল্পের সঙ্কোচন নিয়ে অ্যান্টো টি জোসেফ লিখেছেন, “India’s fourth estate is staring at imminent danger. Several newspapers across the country are gasping for breath. Shrinking readership and ad revenues, rising costs, waning credibility, and an onslaught of digital and social media have taken a huge toll on their financial health. Recently published data collected by the Indian Readership Survey shows that their future is pretty bleak“ (ইজ নিউজপেপার ডাইং, নিউজলন্ড্রি, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০)। 

অথচ আনন্দবাজার পত্রিকা ক’বছর আগে যখন অনলাইন সংস্করণ বার করে, সাধারণ পাঠক তো দূরের কথা, আমরা মূল ধারার সাংবাদিকরাও ভাবতে পারিনি ওই অনলাইন ধারা অচিরে এভাবে পুষ্ট হয়ে উঠবে। প্রধান সম্পাদক অভীক সরকার অবশ্য ঘনিষ্ঠ মহলে বলেছিলেন, এটাই হবে ভবিষ্যৎ। 

এই অবস্থার কারণ কী? এক প্রাক্তন উপাচার্যর কথায়, “একটা ছোট কারণ মুঠোফোনে কাগজ দেখে নেওয়ার সুবিধা। কিন্তু বড় কারণ ফোর্থ এস্টেটের ওপর সেই বিশ্বাসযোগ্যতা একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে। সত্য খবরের জন্য প্রাণ বিসর্জন দিতে কুন্ঠা করেননি জেমস লঙ, হরিশ মুখার্জিরা। ওয়াটার গেট স্ক্যান্ডাল-এর সময় আমি আমেরিকায়। কাগজের খবর নিয়ে সে কী উন্মাদনা! তার পর প্রায় পাঁচ দশক কাটতে চলল। ১৯৯৩ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত দু’দফায় মার্কিন প্রেসিডেন্টের পদে ছিলেন বিল ক্লিনটন। হোয়াইট হাউসের ইতিহাসে কলঙ্কিত একটি অধ্যায় তাঁর ও মনিকা লিউয়েনস্কির গোপন অভিসার। তাঁর হোয়াইট হাউসে ইন্টার্ণ হিসেবে যোগ দেওয়া মনিকার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সে খবরের জন্যও কাগজ বিক্রি হয়েছে হুহু করে। কারণ, বিষয় যাই হোক, প্রকাশিত খবর লোকে বিশ্বাস করতেন। এখন আর করেন না।“

একটি নামী সংস্থায় সংবাদপত্র সার্কুলেশনে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আর্যকমল মিত্রর মতে, খবরের কাগজের এই সঙ্কটের মূল কারণ করোনা। গোড়াতেই কাগজ থেকে সংক্রমণের আশঙ্কায় কেনাবেচা সঙ্কুচিত হয়ে গেল। ট্রেন-বিমান বন্ধে আরও ধাক্কা খেল বিপনন। একটি নামী বাংলা দৈনিকের সার্কুলেশন ২০১১, ’১২, ’১৩, ’১৪-তে দৈনিক ১৩ লক্ষ হয়েছিল। রবিবার তা হত প্রায় ১৬ লক্ষ। এর পর কিছুটা কমে। কিন্তু গত বছর করোনার পর তা প্রায় অর্দ্ধেক হয়ে যায়। তার ওপর কাগজে বিজ্ঞাপন নেই। জলের দরে বিজ্ঞাপন টানার চেষ্টা করতে লাগল কর্তৃপক্ষ। তাতেও সুফল মিলল না। কারণ, করোনার দাপটে বিজ্ঞাপনদাতারাও সঙ্কটে। নানা স্তরের বিভিন্ন কর্মীর কাজ যায়। একই ছবি অন্যান্য সংবাদপত্রে। 
যদিও সেভন্তি নিনন লিখেছেন সঙ্কটটা শুরু হয়েছে আরও আগে থেকে। তাঁর কথায়, “The India-Ratings analysis of revenue growth in print showed that print media growth halved between FY15 and FY19 from 8% to 4% and turned negative (estimated) in FY20, though the lockdown came only in the last week of FY20. In FY20, according to the same analysis, key listed print media players— Jagran Prakashan Ltd (publisher of Dainik Jagran), DB Corp Ltd, (Dainik Bhaskar), Hindustan Media Ventures Ltd (Hindustan) and HT Media Limited (Hindustan Times)—showed declines in advertisement, circulation and overall revenue, with a negative growth in total income that increased steadily to -19% from -3% over four quarters. (Three of the four quarters were pre-Covid-19).“

২০২০-র আগস্ট পর্যন্ত একটি নামী দৈনিকের চিফ রিপোর্টার ছিলেন নিমাই দে। তাঁর কথায়, “১০ বছর ৮ মাস ছিলাম ওই দায়িত্বে। বাড়িতে আনন্দবাজার, বর্তমান, আর অফিসে গিয়ে অন্য কাগজ পড়তাম। এখন একটা সংবাদ চ্যানেলের ডেস্কে আছি। আগের মত কাগজ পড়ার প্রয়োজন নেই। দুঃখের সঙ্গে বলছি, কাগজ পড়তেও ইচ্ছে করে না।“

ছয় দশকের ওপর সাংবাদিকতা করেছেন মিহির গঙ্গোপাধ্যায়। এখন বয়স ৮২। কাজের সুবাদে এবং নেশার টানে সক্কালে উঠে কাগজ পড়তেন। তাঁর কথায়, “এখন দুটো কাগজ রাখি। পুরনো অভ্যেসমত একটু প্রথম আর শেষ পৃষ্ঠা ওল্টাই। বাড়িতে কন্যা আর ক্লাশ ইলেভেনে পড়া মেয়ে। ওরা তো কাগজ ছোঁয়ই না।“ 

সংবাদপত্রের সোনালি দিনের স্মৃতিচারণ  করছিলেন মিহিরদা। বললেন, ভোরের কলকাতায় কাগজ বার হয়েছে, এমন সময়ে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে আসতেন ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা অশোক ঘোষ। তাঁর চোখে সমস্যা ছিল। তাঁর এক সঙ্গী তাঁকে কাগজ পড়ে শোনাতেন। ডায়মন্ডহারবারের সিপিএম সাংসদ জ্যোতির্ময় বসু গোটা সাত কাগজ রাখতেন। তিনি দু’জন রিসার্চ স্কলার রেখেছিলেন যাঁরা ঠিক করে দিতেন কোন খবরের ওপর সংসদে কী আলোচনা করতে হবে। 

উত্তরপাড়ার ফ্ল্যাটে প্রায় কাগজের অরন্যেই থাকেন ওয়েস্ট বেঙ্গল ইউনিয়ন অফ জার্নালিস্টের রাজ্য সম্পাদক দীপক রায়। ঘরে প্রায় ১০ বছর ধরে জমানো ছিল বিভিন্ন দৈনিকের স্তূপ আর বইয়ের পাহাড়। কাগজের মান নেমেছে, পক্ষপাতদুষ্ট হয়েছে— এ কথা স্বীকার করেন তিনিও। এই প্রতিবেদককে বলেন, “তা সত্বেও কাগজ পড়ব না, এটা আমি ভাবতেই পারিনা। আমার পরিচিত অনেকে নানা কারণেই বাড়িতে কাগজ রাখা বা পড়া বন্ধ করেছেন। ই–কাগজ বা টিভি চানেলের নিউজ কখনও খবরের কাগজের পরিপূরক নয়। তবে, একাই থাকি। আগে রোজ চারটি দৈনিক বাড়িতে রাখতাম। এখন দুটি রাখছি। রবিবার অতিরিক্ত। ঘর ফাঁকা করতে হবে বলে ’১১ থেকে ‘১৬-র কাগজগুলো বিক্রি করে দিয়েছি। ৩০০ কিলো ওজন হয়েছিল। গত সাড়ে তিন দশকে বার হওয়া কাগজগুলোর প্রথম দিনের সংস্করণগুলো রেখে দিয়েছি। 

করোনা কমলে কি সংবাদপত্রের হাল ফিরতে পারে? দীপক রায়ের কথায়, কাগজের একটা বড় খদ্দের গণপরিবহণে, যেটাকে বলে ফ্লোটিং সেল। ’২০-র মার্চ থেকে সেটা বন্ধ। সেটা স্বাভাবিক হলে ট্রেনে-বাসে আবার অনেকে কাগজ কিনতেও পারেন।“ এ ব্যাপারে সেভন্তি নিনন লিখেছেন, “India’s newspapers are unlikely to regain their numbers anytime soon, if ever. Of readers lost to online editions, many will not return to print. It is also doubtful if print will gain new readers since the millennials are getting their news and information online. (‘দি ইন্ডিয়া ফোরাম’, ১৫/১/২০২১)। একই সুর আর্যকমল মিত্রর। তাঁর মতে, “সেই সম্ভাবনা খুব কম। কারণ, খবরের কাগজে নতুন পাঠক তৈরি হচ্ছে না। পুরনো পাঠকরা অনেকেই অনলাইন বা বৈদ্যুতিক সংস্করণে নিজেদের মানিয়ে বা অভ্যস্ত করে নিয়েছেন। কাজ হারিয়ে বা বেতন কমে যাওয়ায় অনেকে আর্থিক চাপে আছেন। মনে হয় না তাঁরা কাগজ কিনবেন। আর একটা বড় সংখ্যক পাঠক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রনোদিত সংবাদ পরিবেশনের জন্য বিরক্ত হয়ে কাগজ পড়া বন্ধ করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ।“ 

অ্যান্টো টি জোসেফ লিখেছেন, “Consider this. The country’s most widely circulated newspaper, Dainik Jagran, had an average issue readership of 1.75 crore in the third quarter of 2019, a drop of 3.6 percent from the second quarter and 13.6 percent from the first. Average issue readership is the number of readers who have read the newspaper the previous day, while total readership is the number of those who have read it at least once in the previous 30 days.

It is a similar story with other newspapers. According to the IRS data, Hindustan’s average issue readership fell 21 percent over the first two quarters of last year to 1.46 crore, Amar Ujala’s dropped by 4.8 percent in the same period, Malayala Manorama’s by eight percent, Rajasthan Patrika’s by 10 percent, and Eenadu’s 21 percent.

In spite of the steep decline in its readership, however, Dainik Jagran remains India’s most widely read daily while Malayala Manorama is the most widely read regional daily with an average issue readership of 89.81 lakh.” (‘ইজ নিউজপেপার ডাইং’, ‘নিউজলন্ড্রি’, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০)। 

সন্দেহ নেই, সমীক্ষার সর্বশেষ রিপোর্ট প্রকাশিত হলে আরও কত গভীর ভাঁজ পড়বে এই শিল্পের সঙ্গে যাঁরা যুক্ত, তাঁদের কপালে। 

আপনাদের মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here