রানীর মামাবাড়ি এবং গ্রামবাংলার আম-মরশুম

ড. কল্যাণ চক্রবর্তী ও ড. মনাঞ্জলি বন্দ্যোপাধ্যায়
আমাদের ভারত, ১৭ জুলাই:
বর্তমান বাংলাদেশের বিক্রমপুরে ছোট্ট একটি গ্রাম গঙ্গাধর-খোলা বা গঙ্গাধরপুর; নদী-নালা গাছপালা পরিবেষ্টিত এক জলের দেশ। সেখানেই চিত্রশিল্পী, লেখিকা ও রবীন্দ্র-স্নেহধন্য, প্রাক্তন প্রয়াত কেন্দ্রীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনিল চন্দের সহধর্মিণী রানী চন্দ (১৯১২ – ১৯ জুন ১৯৯৭)-র মামাবাড়ি। কর্মসূত্রে ঢাকার গেণ্ডারিয়ায় থাকতেন তাঁর বাবা, পুলিশ কর্মী কুলচন্দ্র দে।

খুব ছোটো বয়সে পিতৃহারা হন (বয়স মাত্র চার বছর) রানী। গেণ্ডারিয়ার বাড়ি থেকে গরমের ছুটি আর পুজোর ছুটিতে নদীপথ পেরিয়ে মামাবাড়ি নিয়ে যেতেন মা (পূর্ণশশী দে)। পরে ছোটো ছেলেমেয়েদের নিয়ে পিতৃগৃহেই চলে আসেন পূর্ণশশী, সেই গ্রামেই রানীর ছেলেবেলার প্রাথমিক পর্ব কাটে। সে এক ছবির মতো গ্রাম বটে। তার প্রাকৃতিক বর্ণনা, লোকসংস্কৃতির বিবরণ অভূতপূর্ব; ‘আমার মা’র বাপের বাড়ি’ গ্রন্থের পরতে পরতে তার অনন্য অনুভূতি ছড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। ঝেড়েবেছে তা থেকে আম-সংস্কৃতির কিছু অংশ উজ্জ্বল-উদ্ধার করা হলো।

এই বিবরণগুলি থেকে জানা যাবে গ্রাম বাংলার আবাস সন্নিহিতে কীভাবে আমগাছগুলির সবুজ নৈকট্য বিস্তার করে ছায়াসুলভ হয়ে থাকে। খিড়কির দরজা পেরোলেই শুরু হয় আমের বাগিচা, তার তলায় সূর্যের রশ্মিটুকুও আসে না, তলায় নানান আগাছার ঝোপজঙ্গল, পায়ে পায়ে তাতে এ-বাড়ি ও-বাড়ি যাবার হাঁটাপথ। কোনো গাছ কলমের – যেমন টিয়াঠুঁটি, গোপালভোগ, ফজলি; কোনোটি গুটি-আমের গাছ, তাতে টকটেঁশো নিকৃষ্টতর আম। বছরের নির্দিষ্ট সময় গাছে গাছে মুকুল আসে, তা থেকে সময় নিরুপন করেন গ্রামের প্রবীণা মহিলা। ফুল ফুটলে আসে অসংখ্য মৌমাছি। মুকুল ঝরে ঝরে পড়ে, পাতায় ঝরে মধুবিন্দু। ধীরে ধীরে আমের গুটি ধরে, আম বড় হয়। ঝিনুকে খোসা ছাড়িয়ে নুন-মশলা দিয়ে কাঁচা আম-মেখে খায় গ্রামের ছেলেমেয়ে। ঝড়ে আম পড়ে, শিশুর দল কুড়িয়ে আনে সেই আম। ধীরে ধীরে আম পেকে ওঠে, খবর পায় কাকের দল, ঠুকরে ফেলে গাছপাকা আম, কুড়িয়ে নেয় গ্রামের বৃদ্ধা, আমে-চালে ফুটিয়ে তৈরি হয় জাউয়ের মতো হলুদ গলাভাত। রয়েছে আমসত্ত্ব তৈরির এক একটি উৎসবমুখর দিনের বিবরণ।

সদর দরজার গা-লাগা বাইরের দিকে আছে প্রকাণ্ড এক ঝাপড়া আমগাছ। এই আমগাছ দিয়েই এ বাড়ির নিশানা দেয় লোকে, বলে ‘আমগাছওয়ালা বাড়ি’। পথজুড়ে এই আমগাছ — আমের দিনে এক শোভা! বড়ো বড়ো গোল গোল আম ধরে গাছ ভরে প্রতি বছরে। এই আম গাছেই ঝোলে, গাছেই পাকে। কি কাঁচা কি পাকা কোনো অবস্থাতেই একে ছোঁয় না কেউ — না মানুষ, না পাখি। এমনিই টকগুণ এই আমের। লোকে এই আমগাছের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে চোখ পিটপিট করে, যেন স্বাদটা এসে লাগছে জিবের ডগায় (পৃ.২)।

পশ্চিম ভিটায় মামীদের আমিষ রান্নাঘরের পিছনের খানিকটা জায়গা গাছ-গাছড়ায় ভরা, বনের মতো অনেকটা। বেশির ভাগই আমগাছ আকাশ-জোড়া, তলা বুনো ঝোপে ভরা। আলোর রশ্মি পড়ে না মাটিতে দিনের বেলাতেও। এরই ভিতর দিয়ে কিছুটা গেলে এ বাড়ির উঠোন থেকে পাশের বাড়ির উঠোনে গিয়ে পড়ি। ঝোপজঙ্গলের ভিতর দিয়ে এই যে একটুখানি পথ এ শুধু এই দুই বাড়ির লোকের পায়ে পায়ে তৈরি। বর্ষায় যে ঘাস জন্মায় পথে, পায়ের চাপে সেখানে থেঁতলে সেখানেই মাটি হয়ে থাকে (পৃ.১৪)।

উঠোনে ঘুরে ঘুরে দিদিমা তাকিয়ে দেখেন গাছের মাথা। গোপালভোগ আমগাছের মাথায় একদিন দেখা দেয় ‘বোল’। সবার আগে এই গাছটায় আগে ধরে ফুল। দেখতে দেখতে কয়েক দিনের মধ্যে ‘বোল’-এ ছেয়ে যায় সব আমগাছ। যত ‘খুয়া’ পড়ে তত ‘বোল’ ধরে গাছে। আমের বোল, কাঁঠালের ‘মুছি’র সৌরভে ভুরভুর করে আঙিনা (পৃ.৭৫)। ফল ফুল দিয়েও ছিল দিদিমার নানা কাজের হিসাব ঠিক করা। ‘টিয়াঠুটি’ গাছে আমের বোল ধরল তো শ্রীপঞ্চমী এসে গেল কাছে (পৃ.২৫)।

ঝুরঝুর ঝুরঝুর — আমগাছতলায় বোলের ফুল কত শুকিয়ে পড়ে মাটিতে, মাছি মৌমাছি কত ভিড় করে গাছে গাছে। বোলের মধু কত ঝরে পড়ে, ঘনসবুজ চওড়া আমপাতাগুলি চিকচিক করে সে মধু সেচনে (পৃ.৭৭)। বৈশাখ মাসে কাঁচা আমে আঁঠি শক্ত হবার আগেই ঝড়-তুফানের দিন শুরু হয়ে যায়। এই তুফানের দিন — বড়ো ভীষণ দিন (পৃ. ১০২)। দিনের বেলাও দু-একটা ঝোড়ো হাওয়া আসে, তা আসেই কাল-বৈশাখীতে। এই ঝড়ে আমাদের মজাই হয় — কাঁচা আম কুড়োই। কিন্তু নিয়ম করে এই যে বিকেল হতেই ঝড় আসা — এর নাম তুফান (পৃ. ১০৫)।

“ঝিনুক আমাদের সকল সময়ে সঙ্গে থাকে — কাঁচা আমের দিনে। ঘাটের সিঁড়িতে ঝিনুকটা ঘষে ঘষে মাঝখানটায় একটা ফুটো করে নিই। এই ফুটো দিয়ে চেঁচে কাঁচা আমের গায়ের খোসা তুলি, কাঁচা আম পাতলা পাতলা করে কাটি। খুব তাড়াতাড়ি কাটা হয়ে যায় এইরকম ঝিনুক দিয়ে। ঝিনুকই আমাদের হাতের ছুরি। যত্রতত্র ঘুরি, এই ছুরি দিয়ে কাঁচা আম কাটি, নুন মিশিয়ে খাই। একটা ঝিনুক খারাপ হয়, কি, হারিয়ে যায় — আর-একটা তৈরি করে নিই (পৃ.৮৬)।

কাগজে মোড়া কিছুটা নুন আমাদের সকলের সঙ্গেই,থাকে। নুন সঙ্গে রাখা আমাদের একটা অভ্যেস। জাম, বড়ই, তেঁতুল, কামরাঙা, কাঁচা আম — সব-কিছু খেতেই নুন লাগে। আর ঐ-সমস্ত তো যখন-তখন খাই। পথ চলতে চলতে খাই, খেলতে খেলতে খাই; গাছের ছায়ায় সাথীরা একসঙ্গে বসে গল্প করতে করতে খাই। নুন সঙ্গে না থাকলে চলে না।….. ঝড় উঠল — কাঁচা আম কত-না জানি তলায় পড়ল। ‘গুণে’র বাড়ির আমবাগানটা আমাদের বাড়ির পিছনেই। ‘ও দিদিমা, দিদিমা গো’ — টানতে টানতে দিদিমাকে নিয়ে ছুটি। ঝুড়ি ঝুড়ি আম কুড়োই। একদিন এমনি ঝড়ের মুখে যেতে যেতে আরো জোরে ঝড় এল, আরো জোরে হাওয়া ছুটল। বিজন পথ। ঝড় আমাদের উড়িয়ে নিতে চায়। সামনে একটা মোটা চালতে গাছ, দিদিমার থান ধুতির পাতলা আঁচলটা হাওয়ায় তোলপাড় করতে লাগল। বাড়ি ফিরে এলে পর দেখা গেল দিদিমার আঁচলের খানিকটা নেই। ঝড়ে ছিঁড়ে নিয়েছে… (পৃ.৮৭)।

গরমের দিন, লম্বা বেলা। দুপুরে মেঝেতে পাটি বিছিয়ে শুয়ে তালপাতার হাতপাখা দিয়ে হাওয়া খেতে খেতে গা এলিয়ে খানিক গড়িয়ে উঠেও বেলা থেকে যায় অনেকখানি। এই সময়টায় আম, জাম, চালতা, বড়ই — এক-একদিন এক-একটা ‘মাখা’ খেতে বড়ো আরাম। এই ‘মাখা’ই কত রকমের! এক-একটা মাখার এক এক পদ্ধতি। কাঁচা আম পাতলা পাতলা করে কেটে নুন লঙ্কা লেবুপাতা কাসুন্দি দিয়ে চটকে মাখা — এর যেন একটা অপার্থিব স্বাদ। পাথরের খাদা ভরা আম মাখা ঘুরে ঘুরে বাড়ির সবাইকে বিলোই। মা’ও হাত পেতে নেন খানিকটা। ঘরে বাইরে দাওয়ায় উঠোনে তখন সর্বত্র নুন-ঝাল-টক মেশানো স্বাদের একটা শব্দ ওঠে সবার মুখ থেকে… (পৃ.৮৭)।

টকটকে দুই বুড়োবুড়ি — যেন এক বোঁটায় সিঁদুর-পাকা ফল দুটি। কিছুকাল বাদে বুড়ো মারা গেলেন। বুড়ি একা পড়লেন।… আমের দিনে বনে বাগানে ঘুরঘুর করেন, কাকে ঠুকরে একটা আম তলায় ফেলল কি তাড়াতাড়ি তুলে ঘটিতে রাখেন। মামীদের দেওয়া গোটা আম মনে ধরে না বুড়ির। বলেন, ‘কাকে খাওয়া আম বেশি মিষ্টি। পাখিরা তো বুঝেই ঠোকর মারে ফলে?’ … আমের দিনে শাকসবজিটুকও লাগে না বুড়ির। আম দিয়ে খুদের ‘জাউ’ রান্না করেন। খুদটা বোখ্নায় ফুটতে থাকে, তাতেই ঐ কাকে-খাওয়া আম কয়েকটা খোসা ছাড়িয়ে ফেলে দেন, একটু নুন দেন, এক দলা গুড়ও দেন। আমে খুদে গুড়ে নুনে মিলে থকথকে একটা হলদেটে রঙের পদার্থ হয় (পৃ.২৮)।

পশ্চিমভিটায় রান্নাঘরের পিছনে আছে নন্দীদের একটা প্রকাণ্ড ফজলি আমের গাছ। সব আমের শেষে আম হয় এই গাছে। বড়ো বড়ো আম, আর তেমনি টক। একদিন একটা পাকা আম কাকে খাচ্ছিল, বোঁটা খসে পড়ে গেল তলায়। এমনিতরোই পড়ে আম যখন-তখন। আমের দিনে কান খাড়া করে থাকি — কোথায় একটা আম পড়ল কি ছুটে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ি — কে আগে কুড়িয়ে নেব সেটা। আড়াআড়ি কাড়াকাড়ি পড়ে যায় এ নিয়ে। আমটা যে পায় তার উল্লাস, আর যে পায় না ‘বেচারা বেচারা’ মুখখানা হয়ে যায় দুঃখে। পাকা আম তলায় পড়ার শব্দই আলাদা (পৃ.৬০)।

আমসত্ত্বের দিনে উঠোন ছেয়ে আমসত্ত্বের ছাঁচ পড়ে; ছোটো বড়ো কত রকমের পাথরের ছাঁচ। তাতে কুলোয় না; কাঁসারি, রেকাবি, বগি-থালাগুলিও পড়ে। আর এ-সব ছাড়া পড়ে পাটি, চাটাই, চিকনাই — উঠোন জুড়ে।

শৌখিন আমসত্ত্বগুলি ওঠে ছাঁচে। ছাঁচের আমসত্ত্ব মা নিজে দেন। অন্য কারো হাতে ছাড়েন না। পাথরের খাদা ভরা ভরা আমের গোলা করেন মিহি কাপড়ে ছেঁকে। কোনো গোলায় ক্ষীর চিনি মেশান, কোনো গোলায় শুধু চিনি। সোনার বর্ণ আমগুলি মা আগে বেছে নেন; ঝড়তি-পড়তিগুলি থাকে দিদিমার ভাগে। দিদিমার হল ঢালা কাজ। থালায় থালায় গোলা ঢেলে দিলেন, আরো রইলো — পাটিতে ঢাললেন। আমের-খোসা চাঁছা পদার্থটা চাটাই চিকনাইতে ঢেলে ঘর লেপার মতো হাত দিয়ে লেপে দিলেন; মোটা আমসত্ত্ব হয় — তা হোক। বর্ষাকালে টক রেঁধে খাবে বউরা। তখন এই খোসা-চাঁছা আমসত্ত্বই কত মধুর লাগবে। আমসত্ত্বের দিনে আমসত্ত্ব নিয়েই মেতে থাকেন দিদিমা মা মামীরা উঠোনে (পৃ.৭০-৭১)। আচার-আমসত্ত্বের দিনে.. কাক শালিখ তাড়াবার জন্য কঞ্চি হাতে আমাদের বসিয়ে রাখেন কাছে (পৃ.৭৩)।

আমসত্ত্বের ছাঁচ হয় সব পাথর কেটে। পাখি পদ্ম গাছ মাছ — নানা নমুনার ছাঁচ। ছোটো ছোটো বাটালি দিয়ে মা ছাঁচ কুরে কুরে কাটেন। আমসত্ত্বের ছাঁচ কাটার ধরন আলাদা, প্রতিটি পাপড়ি, পাতার মাঝখানটায় পদ্ম তুলে কাটতে হয়। তবেই ছাঁচের আমসত্ত্বখানি উঠবে যখন — পদ্ম পাখি পাতা লতা — কাটে কাটে প্রতিটি ফুটে উঠবে উপর দিকে। মিষ্টির ছাঁচে এটার দরকার হয় না (পৃ.৯৭)।
(ছবিগুলি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত।)

আপনাদের মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here