রূপং দেহি জয়ং দেহি

ডাঃ রঘুপতি সারেঙ্গী, কোচবিহার, ৮ নভেম্বর:
শিবানী এতদিনে কৈলাসে পৌঁছে আবারও নিশ্চই আনন্দে শিবের দুর্গ সামাল দিতে শুরু করেছেন।
নৈলে, এই দিন কয়েক আগে, একা মেয়ে, কমলা’কে আবার পাঠালেন কী করে!
আর তার পনেরোটা দিন কাটতে না কাটতে সেই উনিই আসছেন….. সামান্য একটু
শাড়ি-চুড়ি-গয়না বদলে!
মেয়েরা বাপের বাড়ি এলে তো এমনটা করেই থাকে তাই না !
শ্বশুড়বাড়ির হাজারো কষ্ট বুকে চেপে চকচক-করা হাসি মুখে থাকে ক’টা দিন। ভাবখানা এমন, কী দারুন সুখের এক সংসারে বিয়ে দিয়েছেন তার বাবা! বরের জন্য কতোই না তার অহঙ্কার !
কল্পনা-প্রবন বাঙালী বা ভাববাদী ভারতীয়ের মনে এ কথা মনে হোতেই পারে। দোষের কিছু নেই। কিন্তু এটাই শেষ নয়। আর ও কিছু
হয়তো বা আছে।
আসলে দুর্গা-লক্মী-তারা-সারদা-
ষষ্ঠী-সন্তোষী করতে করতে ভারতীয়দের মধ্যে মাতৃ-পূজার
পরম্পরা টা যে বড়োই দীর্ঘ্য। গণেশ-নারায়ণ আর মহাদেব ছাড়া কে আর তেমন কোথায় পুরুষ দেবতাকে পূজা করে?
সেই ধারাবাহিকতা রক্ষায় এবার আসতে চলেছেন কালী।
কালী নামটি মনে পড়লেই মনের অজানতেই কেমন একটা গা ছমছমে ভাব জেগে ওঠে না?
আসলে ‘কাল’ বলতে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ এই তিন কালকে বোঝানো হয়। ‘ঈ’ কার সাকার ব্রহ্মের প্রকাশ। (“ঈশাবাস্যমিদং সর্বং”..…ঈশোপনিষদ) তাহলে, “কালী” অর্থে সেই ঈশ্বরী শক্তি যা নিত্য, যা শাশ্বত। ইনিই জীবের মায়া।
মায়া আর মোহো নামের ‘প্রেয়’ বস্তু দিয়ে ভুলিয়ে রেখেছেন তাঁর সারা সৃষ্টিকে।
(“মমত্বগর্তে অতি মহান্ধকারে বিভ্রাময়তি এতৎ অতীব বিশ্বম্”
….. একাদশ অধ্যায়, সপ্তশতী।)
ইনি থাকেন কোথায় ?
যূগ যুগ ধরে চলে আসা অন্ধ- গতানুগতিক বিশ্বাস আমাদের শিখিয়েছে, ইনি থাকেন শ্মশানে।
হয়তো বা শ্মশান এর বৈরাগ্যকে সুকৌশলে ঘোর সংসারীদের মনে একটু স্থান করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। পাশাপাশি, শ্মশান এর মতো একটা নিষিদ্ধ-স্থলকেও পবিত্রতা দান করা হয়েছে, এমনটা ভাবার পিছনে কিছু যুক্তি থাকতেই পারে।
সে না হয় নিজস্ব যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে কিছুটা বুঝা গেল। কিন্তু খোদ দেবী’র স্তুতি আমাদের অন্য কথা জানাচ্ছে, “সর্বস্য বুদ্ধিরূপেণ জনস্য হৃদি সংস্থিতে,”…মানে, দেবী শুভ-বুদ্ধি হিসাবে আমাদের সমাহিত চিত্তে সদাই বাস করেন।
বাস করে তিনি করেন টাই বা কী ?
” কালী করালবদনা বিনিষ্ক্রান্তসিপাশিনী”
……জীবের মনে জন্ম-জন্মান্তর ধরে জমে থাকা ‘মহিষাসুর’রূপী কালিমাকে সাফ করতে উদ্যত হন। দৈত্য সেনাপতি ধুম্রাসুর (দৃষ্টিশক্তির সামনে জমে থাকা মিথ্যা মায়া ও অহংকার এর ধোঁয়াকে সরিয়ে স্বচ্ছ-শুভ দৃষ্টি দান করেন।) কে বধ করেন। ক্রোধ-ঈর্ষা-লোভরূপী (তমগুণ গুলি) চন্ড-মুণ্ড-প্রচণ্ড কে বধ করেন। এইখানে দেবী অম্বিকা
(মায়েরই আর এক নাম) কিন্তু থেমে যাননি। আরও এক ধাপ এগিয়ে ‘রক্তবীজ’ ( যা’কে হত্যাকালে রক্তবিন্দূ মাটি স্পর্শ করা মাত্রই শত-সহস্র দানব জন্মাতো) কে ঐন্দ্রীরূপে হত্যা করে সেই শোনিতের ধারাকে নিজের বিশাল বিদীর্ণ মুখে ধারণ করে পরে, তা দিয়ে নিজ পার্ষদ, ডাকিনী-যোগিনী – পিশাচিনীদের তৃপ্ত করলেন অর্থাৎ এই পবিত্র ভূমি থেকে চিরতরে পাপকে ভ্রুণেই বিনাশ করতে চাইলেন।
আবার সেই দেবীই স্তুতি-প্রার্থনাতে প্রীত হয়ে নিজেই সহাস্যে বলে ওঠেনঃ
“যৎ প্রার্থ্যতে ত্বয়া ভূপ ত্বয়া চ কুলনন্দন।
মত্তস্তৎ প্রাপ্যতাং সর্বং পরিতূষ্টা
দদামি তে।।”
আসলে, মা কী না! এরা নিজের মৃত্যুর পূর্বেও মাতৃহন্তা সন্তানকে একটিবার জিজ্ঞ্যেস করে..” বাছা,
তোর হাতে লাগেনি, তো?”
ঠিক সে কারনেই হয়তো বা……..
” শ্যামা কখনো শ্বেত, কখনো পীত লোহিত রে”… “সত্য-রজ-তম” গুণে গুণান্বিত হয়েও নির্গুন তত্ব।
করুণাময়ী মা যে আমাদের ” রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষং জহি” প্রার্থনায় সাড়া দেন।
তাই তো বছরে বছরে আমরা ওঁনাকে সাদরে অহ্বানই করি না…মাতৃভক্ত কন্ঠশিল্পীর মুখে শুনি,
” কালী ছাড়া মোর জীবনে কী আছে আজ ধাম?
আমার সর্ব অঙ্গে লিখে দিও কালী কালী নাম।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here