বনোমহোৎসবের জন্য কিছু পরিকল্পনা! এমন গাছ লাগাতে হবে যা থেকে গড়ে উঠতে পারে কৃষি-ভিত্তিক গ্রামীণ শিল্প

ড. কল্যাণ চক্রবর্তী
আমাদের ভারত, ১৭ জুন: প্রাচীন শাস্ত্রকারেরা বলছেন, ‘একো বৃক্ষো দশঃ পুত্র সমাচরেৎ’। এক বৃক্ষ দশ পুত্রের সমতুল্য। পদ্মপুরাণে বলা হচ্ছে, যে ব্যক্তি পথের ধারে, জলাশয়ের ধারে গাছ লাগাবে তার স্বর্গবাস নিশ্চিত– যতদিন সেই বৃক্ষ ফল ও ছায়া দান করবে। অগ্নিপুরাণে বলা হয়েছে বৃক্ষচ্ছেদন করলে বজ্রশস্ত্রে পড়তে হয় — “দ্রুমচ্ছিদ্ বজ্রেশস্ত্রকে”। বৃক্ষচ্ছেদনে পাপের কথা রয়েছে মহাভারতেও। যে নির্বোধ অমাবস্যায় কোনও মহাবৃক্ষ বিনষ্ট করে অথবা তার একটি পাতাও ছেঁড়ে তাকে ব্রহ্মহত্যার পাপ গ্রাস করে।

মনুসংহিতাতে অপরিণত বৃক্ষচ্ছেদনে নিষেধাজ্ঞা দেখতে পাওয়া যায়। মনু স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন উদ্ভিদের প্রাণ আছে, সুখদুঃখ আছে, তাই অযথা উদ্ভিদ বিনাশ অনুচিত। মহাভারতের শান্তিপর্বে উদ্ভিদের চৈতন্য সম্পর্কে ঘোষণা শুনতে পাই। এই চৈতন্য-ধারণাকেই হাতে-কলমে প্রমাণ করেন আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু তাঁর স্ফিগমোগ্রাফ যন্ত্রের সাহায্যে। বৃক্ষের গুরুত্ব উপলব্ধি করেই মানুষের বৃক্ষ পূজা, উদ্ভিদ পূত-পবিত্র স্বীকৃতি। প্ল্যান্ট-টোটেম বা বৃক্ষ-কূলকেতু, উদ্ভিদ-বিবাহে রয়েছে উদ্ভিদের মধ্যে আশ্রয় লাভের লোকায়ত চেতনা।

বরাহমিহির রচিত ‘বৃহৎ সংহিতা’-য় ‘বৃক্ষায়ুর্বেদ’ অধ্যায়ে ১৩৬ টি উপকারী বৃক্ষের নাম পাওয়া যায়। বাস্তুশাস্ত্র মতে আম, জাম, সুপারি, কলা, কাঁঠাল, নারকেল ইত্যাদি যে বাড়িতে থাকে সেখানে লক্ষ্মীর অধিষ্ঠান পাকা হয়। আম গাছ রোপণে পিতৃপুরুষ প্রসন্ন হন বলে লোকবিশ্বাস। বেল, ডালিম ইত্যাদি গাছ বাড়িতে লাগানো মঙ্গলজনক। বৃহৎ বৃক্ষ লাগাতে হবে বীথিকায়, আবাস সন্নিহিত স্থানে নয়; বৃহৎ বৃক্ষের শেকড়ের বিস্তৃতি গৃহের ভিত আলগা করে দিতে সক্ষম।

জ্যোতিষশাস্ত্রে বিবিধ গ্রহ-নক্ষত্র রাশির সঙ্গে বিভিন্ন বৃক্ষের সম্পর্ক আছে, তারমধ্যে ফলের গাছগুলি এইরকম — ভরণী নক্ষত্র আমলকী, কৃত্তিকা – ডুমুর, রোহিণী – জাম, আর্দ্রা – বহেড়া, চিত্রা – বেল, উত্তরষাঢ়া – কাঁঠাল, উত্তরভাদ্রপদ – আম, রেবতী – মহুয়া গাছের প্রতীক।

সাংসারিক সুখ শান্তিতে ফলের গাছ যেমন আম, জাম, জামরুল, গোলাপজাম, লিচু, ফলসা, আঁশফল, নারকেল গাছ লাগানোর পরামর্শ পাওয়া যায়। যে কোনও ফলবতী গাছ পূর্বদিকে লাগানো শুভ। লতানে লাউ, কুমড়ো, কাঁকরোল গৃহে সুখ-সমৃদ্ধি নিয়ে আসে। তুলসীগাছ লাগাতে হয় বাড়ির উত্তর-পূর্বে। ‘বিশ্বকর্মা প্রকাশ’ শাস্ত্রে বলা হয়েছে বাড়ি তৈরির পূর্বেই জমিতে বাগান করার কথা। ‘অগ্নিপুরাণ’-এ বাসগৃহের কাছে উত্তর-পশ্চিম বা উত্তর-পূর্বে বাগান করতে বলা হয়েছে। ভিটেমাটিতে বৃক্ষরোপণ বিশেষত ফল গাছ লাগানো একটি প্রাচীন প্রথা। গাছপালার জন্যই গ্রাম-বাংলার শ্যামলশোভা। ডুমুর, বেত, বেল, তেঁতুল, কালোজাম, গাব, খেজুর, তাল, কুল ইত্যাদি গাছ আপনা থেকেই জন্মায়। নারকেল, সুপারি, আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, লিচু ইত্যাদি পরিকল্পনা করে লাগিয়ে থাকেন গাঁয়ের মানুষ।

গাছপালা বৃষ্টির ক্ষয় থেকে মাটিকে রক্ষা করে, জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, মাটি সম্বৎসর আর্দ্র থাকে। সুতরাং এই সমস্ত উদ্ভিদ ভূমিক্ষয় রোধেরও অন্যতম সহায়ক। এই গাছপালা পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধ করে, পরিবেশের তাপমাত্রা কমায়, অক্সিজেন সরবরাহ করে।

সমাজভিত্তিক বনসৃজনে সুদীর্ঘ সময় যে সমস্ত গাছ লাগানো হয়েছিল তার ফল খাদ্য হিসাবে পাখি, কাঠবিড়ালি ও অন্যান্য প্রাণি পছন্দ করতো না, মানুষেরও খাদ্যযোগ্য নয়। এই ধরণের গাছ লাগিয়ে কতটুকু লাভ? গাছ লাগিয়ে মানুষের পুষ্টি নিরাপত্তার দিকটি লক্ষ্য করা উচিত, অথচ যার আসবাব-মূল্য রয়েছে। এমন গাছ যা স্বসহায়ক গ্রুপের সদস্যরা যত্নআত্তি করে স্বনির্ভর হতে পারবেন। গাছের ফল থেকে প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে গড়ে উঠতে পারে কৃষি-ভিত্তিক গ্রামীণ শিল্প।

সোশ্যাল ফরেস্ট্রি বা সমাজভিত্তিক বনসৃজন এবং আর্বান এণ্ড রুরাল রিক্রিয়েশনাল ফরেস্ট্রি বা নগর এবং গ্রামীণ এলাকার বিনোদনমূলক বনায়ন তৈরির অপরিহার্য অঙ্গ হিসাবে ফলের গাছ রোপণ করা দরকার। তাতে নানান পাখি ও পশুর নান্দনিক উপস্থিতি চোখে পড়ে, স্থানীয় গরিব মানুষও তার ফল গ্রহণ করে খানিক পুষ্টিলাভ করতে পারে।

পাহাড়ি এলাকায় সামাজিক বন সৃজণের জন্য ১০০০ মিটার পর্যন্ত উচ্চতায় সুপারি, আম, কাঁঠাল, লেবু, সজনে, পেয়ারা, জলপাই; ১০০০-২০০০ মিটার উচ্চতায় কমলালেবু, নাসপাতি, কলা, পেঁপে, পেয়ারা, অ্যাপ্রিকট; ২০০০ মিটারের বেশি উচ্চতায় কমলালেবু, আপেল, নাসপাতির মত ফলের গাছ লাগানো যায়।

উত্তরবঙ্গের সমতলভূমি ও হিমালয়ের পাদদেশ অঞ্চলে কাঁঠাল, আম, জাম, সজনে, লেবু, সুপারি, লিচু, সবেদা, নারকেল লাগানো যাবে। গাঙ্গেয় পলিমাটি অধ্যুষিত সমভূমি অঞ্চলে আম, কাঁঠাল, জাম, সুপারি, জামরুল, লিচু, পেয়ারা, নারকেল, আতা, সজনে, সবেদা লাগানো যায়। আর রাঙ্গামাটি অঞ্চলে আম, কাঁঠাল, তেঁতুল, পেয়ারা, তাল, খেজুর, জাম, কুল, লেবু, আতা, কুল, কেন্দু, পিয়াল গাছ রোপণ করা যায়। নোনামাটিতে নারকেল, সবেদা গাছ লাগানো যেতে পারে। বিবেচনা করেই নির্বাচন করতে হবে উপযুক্ত ফলের গাছ।

সামাজিক বনসৃজনের জন্য চারা তৈরির নার্সারী গড়তে হবে। এখানে চারাকুশলীরা নানান ফলের গ্রাফটিং (জোড়কলম), বাডিং (কলিকলম), লেয়ারিং (গুটিকলম), কাটিং (ডালকলম) করে চারা তৈরি করবেন এবং তা বিতরিত হবে সবুজায়নের জন্য। কৃষক নিজের বাগিচাভিত্তিক কৃষি-বন বা বন-বাগান তৈরির জন্য চারা বানিয়ে নিতে পারেন। উঁচু জমি, খামারের বেড়া, জমি-জিরেতের আল, পতিত জমি, অনুর্বর জমি, ফালিজমি, আবাস সন্নিহিত আঙ্গিনায় লাগাতে পারেন ফলের চারা।

সারিবন বা সারিবদ্ধ-বন সামাজিক বনসৃজনের উল্লেখযোগ্য অঙ্গ। পথের পাশে, সেচনালার পাড়ে, নদীর ধারে, বন্যারোধী নদীপাড়ের বাঁধে রচনা করা যাবে সমাজভিত্তিক বন। জাতীয় সড়ক, রাজ্য সড়ক, জেলা সড়ক এবং অন্য সড়কের ধারে সারিবন গড়ে তোলা যায়। পথের পাশে আম্রবিথী কেন গড়ে তোলা যাবে না? কেন পুরুলিয়া, বাঁকুড়ার মত রাঙ্গামাটির সড়কের ধারে সারিবন হবে না তেঁতুলের, কিংবা আমলকী-বিথী, কেন্দু-পিয়াল-মহুয়া গাছ?

গ্রামীণ পথের ধারেও লাগানো যাবে ফলের চারা। স্বসহায়ক দলের কর্মীরা তার রক্ষণাবেক্ষণ করবেন, কিছু আয় হবে, গাঁয়ের ছেলে-ছোকড়ারা পেড়ে খাবে ফল। এমন ফল লাগানো উচিত যার খানিক খেয়ে বাঁচে পাখপাখালি, হনুমান, কাঠবেড়ালি, ভাম-খটাস। আর পোষক গাছের পাতা খেতে আসে অসংখ্য প্রজাপতির শুঁয়োপোকাও, তারপর দেখা মেলে ইন্দ্রধনুর পাখা।

গ্রামীণ বৃক্ষপুঞ্জ রচনা করা যায় পঞ্চায়েতের অধীনে থাকা জমিতে, এজমালী জমিতে। আদর্শ কৃষিবন হিসাবে এখানে ফলের গাছ লাগিয়ে গ্রামের মানুষের সামনে তুলে ধরা যেতে পারে। এখানে মিশ্র ফলের বাগান করতে হবে, প্রধান ফলের সঙ্গে গৌণ ফলের সংগ্রহও থাকবে। ঘন করে দ্বিবেড়া সারিতে বেঁটে জাতের ফলের গাছ লাগালে তা থেকে বেশি আয় করা সম্ভব। এই বৃক্ষপুঞ্জের চারপাশে বেড়াগাছ হিসাবে লাগানো যায় করমচা, সজনের গাছ। বাগানের উত্তর সীমায় লাগানো যায় সারি সারি তালের গাছ, তালের রস থেকে তৈরি করা যায় তালপাটালি। সঙ্গবদ্ধ রস-খেজুর চারা লাগানোর প্রথা চালু হলে আগামীদিনে রস-খেজুর গাছের ঘন বাগানে সিউলিদের বসিয়ে শীতকালে খেজুরগুড় তৈরি করানো যায়। খেজুরের পাতায় তৈরি হতে পারে নানান লোকশিল্প।

পার্ক, স্কুল ও অফিস চত্বরে ফলের গাছ লাগানো যায়। রাস্তার ধারে ফলের গাছের মাঝে দূরত্ব খানিক কমালেও চলবে। প্রয়োজনে সেই ফলগাছের ডালপালা ছেঁটে দিতে হবে। গাছের শাখার বিস্তার অনুযায়ী মধ্যবর্তী দূরত্ব নির্ধারণ করতে হয়। গাছ লাগানোর পর বেড়া দিতে হয়, গাছকে খাড়া রাখতে দিতে হয় বাঁশের ঠেকনা। গাছ লাগাতে হবে জুন-জুলাই মাসে বর্ষার শুরুতে, নির্দিষ্ট দূরত্বে গর্ত আগেই খুঁড়ে রাখতে হবে। গর্তে গাছ লাগানোর আগে প্রয়োগ করতে হবে পরিমাণ মত জৈব (কম্পোস্ট বা গোবর সার এবং হাড়ের গুঁড়ো) ও অজৈব সার (সিঙ্গল সুপার ফসফেট ও মিউরিয়েট অব পটাশ)। চারা বসানোর সময় জৈব কীটনাশক কিংবা দানাদার কেমিক্যাল কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে। গাছ মাটিতে বসানোর সময় খেয়াল রাখতে হবে মাটির বলটি যেন জমির লেবেলের নিচে থাকে। লাগানোর সময় গোড়ার মাটি ভালোভাবে চেপে দিতে হবে।

আপনাদের মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here