ক্ষমতা দখলই লক্ষ্য, তাই ‘বিশেষ মদতে’ বিজেপির তৃণমূলায়ন হচ্ছে বলে অভিযোগ

আমাদের ভারত, কলকাতা, ২ অক্টোবর: বিজেপির লক্ষ্য রাজ্যে ক্ষমতা দখল করা। সেটা যেভাবেই হোক বা যে কৌশলেই হোক দখল করতে হবে–এই মনোভাবই পেয়ে বসেছে বিজেপির একাংশে। দলের মধ্যেই অভিযোগ উঠেছে, তাতে মদত যোগাচ্ছেন সংঘের একজন গুরুত্বপূর্ণ কার্যকর্তা। তাঁর ইচ্ছাতেই ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে ধীরে ধীরে বিজেপির তৃণমূলায়ন হচ্ছে।

বরাবরই বিজেপিকে অন্যদল থেকে আলাদা ভাবে তুলে ধরতেন কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য নেতারা। তাদের কাজেকর্ম নেতাদের জীবনযাত্রা মানুষের কাছে শ্রদ্ধার উদ্রেক করত। তাই রাজনীতিতে বিজেপি একটা আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। বহু চর্চিত সাম্প্রদায়িক তকমা সত্ত্বেও গত লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক সাফল্য তাক লাগিয়ে দিয়েছে। বিজেপির তথাকথিত সাম্প্রদায়িক তকমার তোয়াক্কা না করেই বহু মানুষ বিজেপির সঙ্গে হয়েছে। পাশাপাশি তৃণমূল সরকারের বিভিন্ন ব্যর্থতা মানুষকে আরও বিজেপি মুখি করেছে। এই জায়গায় দাঁড়িয়ে বহু তৃণমূল নেতা প্রমাদ গুনছেন। অনেক আগেই তৃণমূল ছেড়ে বিজেপির পতাকা হাতে নিয়েছেন। এখনো বহু তৃণমূল নেতা-নেত্রী বিজেপির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছেন বলে দলেরই একটা অংশ জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, তৃণমূল নেতারা আগামী দিনে ক্ষমতা হারানোর ভয়ে একসময়ের সাম্প্রদায়িক বিজেপিতে যোগ দিচ্ছেন। বিজেপির বাড়বাড়ন্ত তাদের যোগদান করতে বাধ্য করছে। এই পরিস্থিতিতে প্রাক্তন তৃণমূল নেতাদের বিজেপির রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর তীব্র বিরোধিতা করছেন বিজেপি নেতারা। তাদের যুক্তি, বিজেপি নেতা বলতে সাধারণ মানুষের কাছে যে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির ফুটে ওঠে বর্তমানে তৃণমূল থেকে আসা নেতাদের মধ্যে সে জিনিস লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। তাদের প্রশ্ন, এই বিজেপি আসলে বিজেপি নয় এটা তৃণমূলেরই আরএকটি সংস্করণ।

তাদের অভিযোগ, তৃণমূল থেকে আসা নেতাদের এই বাড়বাড়ন্তের জন্য সংঘের এক প্রভাবশালী কার্যকর্তা দায়ী। তাঁর ইচ্ছাতেই রাজ্য এবং কেন্দ্রের বিভিন্ন সাংগঠনিক পদে বসছেন তৃণমূল থেকে আসা নেতারা। অভিযোগ, অন্য রাজ্য থেকে আসা এই সংঘের কার্যকর্তার জন্যেই আজ বিজেপির তৃণমূলায়ন হচ্ছে। অভিযোগ, সঙ্ঘের পদ্ধতি এবং সিদ্ধান্তকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন–যার বাংলার সংস্কৃতি সম্পর্কে কোনও ধ্যানধারনাই নেই। এমনকি কেশব ভবনে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসা নেতারা কোনও নিয়মের তোয়াক্কা করছেন না। কাউকে পাত্তা না দিয়ে সোজা তাঁর কাছে যান, আলোচনা করে আবার সোজা বেরিয়ে যান। বাংলার নেতাদের কোনও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ। তাদের সঙ্গে কোনও পরামর্শ না করেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তিনি। সংঘের এই কার্যকর্তাদের কেউ কেউ ঘনিষ্ঠ মহলে নিজেদের ক্ষোভ, হতাশা জানিয়েছেন। শুধু তাই নয়, বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ এবং সংগঠন সম্পাদক সুব্রত চ্যাটার্জিও অনেক ক্ষেত্রে এইসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা জানতে পারছেন না। অভিযোগ, সংঘের ওই প্রভাবশালী কার্যকর্তা তৃণমূল থেকে আসা নেতাদের চোখ দিয়ে পুরো বিষয়টি দেখছেন। আর তার সঙ্গে দিল্লির যোগাযোগ থাকায় বিজেপির সর্বভারতীয় সংগঠন সম্পাদক কে বুঝিয়ে একের পর এক তৃণমূল থেকে আসা নেতাদের বিজেপির বিভিন্ন পদে বসাচ্ছেন। মুকুল রায় বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি হওয়ার পর ওই দিনই চুঁচুড়ায় এক সম্বর্ধনা সভায় গিয়ে ছিলেন। একটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে মুকুল রায় কে সেই সময় ফোন করেছেন সংঘের ওই কার্যকর্তা। মুকুল রায় ফোন ধরেই তাঁকে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন এবং বলছেন যে আপনার জন্যই এটা সম্ভব হয়েছে।

এমনকি যিনি বিরোধিতা করতে পারতেন বিজেপির কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক সেই শিবপ্রকাশজি কে কৌশলে এই রাজ্যে ঢোকা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ, তৃণমূল থেকে আসা এক যুবনেতা যিনি এখনো বিজেপির কোনও সংগঠনে বড়সড় পদ পাননি তার মাধ্যমে শিবপ্রকাশজিকে রাজ্যের আসা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কৌশলে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা খুঁচিয়ে তোলা হয়েছে। ফলে তিনি রাজ্য রাজনীতি থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছেন। বাকি যারা আছেন তাদের সঙ্গে তৃণমূল থেকে আসা এই নেতা-নেত্রীদের যোগাযোগ খুবই ভালো বলে সংঘের এবং বিজেপির পুরনো কার্যকর্তাদের বক্তব্য। ফলে ধীরে ধীরে তৃণমূল থেকে আসা নেতারাই বিজেপি দখল করে নিচ্ছেন।

রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় কমিটির পর এবার খুব শিগগিরই কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ হবে বলে দলের এই ক্ষুব্ধ নেতারা জানিয়েছেন। সেক্ষেত্রেও তৃণমূল থেকে আসা নেতাদের রমরমা হতে চলেছে বলে তাঁরা মনে করছেন। তাঁদের ধারণা তৃণমূল থেকে আসা বর্তমানে দুই সাংসদ শান্তনু ঠাকুর এবং নিশীথ প্রামাণিক কে সংঘের ওই কার্যকর্তা মত্রী করার জন্য সুপারিশ করেছেন। শুধু তাই নয়, নিশীথ প্রামাণিক সম্পর্কে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে কাছে ভুরিভুরি প্রশংসা করেছেন। এমনকি রাজ্য স্তরের তাঁর তেমন পরিচিতি না থাকলেও সেই নিশীথ প্রামানিক কে ইয়ুথ আইকন বলেও তিনি বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে তুলে ধরেছেন।

পুরনো বিজেপি নেতাদের আশঙ্কা, এইভাবে সংঘের ওই কার্যকর্তার হাতেই ধীরে ধীরে বিজেপির তৃণমূলায়ন হচ্ছে। ইতিমধ্যেই রাজ্য এবং জেলা নেতৃত্বের একাংশ বলতে শুরু করেছেন এই বিজেপির সঙ্গে তৃণমূলের পার্থক্য কোথায়? তাদের বক্তব্য, আগামী দিনে সাধারণ মানুষও একই প্রশ্ন তুলতে পারে। তাদের প্রশ্ন, যে উদ্দেশ্য বিজেপির তৃণমূলায়ন করা হচ্ছে ক্ষমতা দখলের সেই লক্ষ্যে আদৌ কি পৌঁছতে পারবে বিজেপি?

আপনাদের মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here