বিজেপি হারেনি! যে জাতির কাছে শিক্ষার চেয়ে ভিক্ষা দামী, সেই সবজান্তা ৭০% বাঙালি হেরেছে

“আমি দেখতে পাচ্ছি বাঙালীর দুর্দিন পুনরায় আগতপ্রায়, দরজায় দরজায় কড়া নাড়বে, হাতছানি দিয়ে উদাত্ত কন্ঠে ডাকবে, আয় বাঙালী আয়, একটা বারের তরে বুকে আয়, যখন গঙ্গা পদ্মা মিলেমিশে একাকার হবে, জল হয়ে যাবে পানি আর আকাশটা আসমান আর ঐ আসমানে প্রকট হবে জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সাম্যবাদের এক ভুবন ভোলানো ছলনাময়ী রংধনু।”

রজত মুখার্জি

আমাদের ভারত, ৮ জুন:
না বিজেপি হারেনি, বিজেপি জিতে গেছে। মাত্র ৩ থেকে ৭৭ জন বিধায়ক জিতিয়ে আনা মোটেই পরাজয় নয়। ৩৮% এর অধিক ভোট পেয়ে একমাত্র বিরোধী শক্তি হিসেবে বিধানসভায় প্রবেশাধিকার কখনোই পরাজয়কে প্রতিফলিত করে না। এছাড়, বহু আসনে সামান্য ব্যবধানে পরাজয়ের বাস্তবতাকেই বা অস্বীকার করি কীভাবে?

এই ধর্ম যুদ্ধে যদি কারও হার হয়ে থাকে, তারা হল হিন্দু বাঙালী। ভোটের ফলাফল স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে আমরা অতীত থেকে, ইতিহাস থেকে বিন্দুমাত্র শিক্ষা গ্রহণ করিনি। বাংলাদেশ থেকে উদ্বাস্তু হয়ে এদেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেওয়া বাঙালি আজও নিজেদের হোমল্যান্ডকে রক্ষা করার ব্যাপারে আদৌ সিরিয়াস নয়, যা আশঙ্কার জন্ম দেয়। আমরা আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের সুরক্ষা নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে মোটেই আগ্রহী নই, কারণ আমরা সর্বজ্ঞ। আমরা তো সাম্যবাদের স্বঘোষিত ঠিকাদার হয়ে বসে আছি। মাত্র তিরিশ শতাংশ ঐক্যবদ্ধ সংখ্যালঘু ভোটাররা আজ পশ্চিমবঙ্গের চালিকাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, শুধুমাত্র আমাদের উদাসীনতায়। আজ তারা পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অভিমুখ নির্ধারণ করে দিচ্ছে, কোন দল ক্ষমতাসীন হবে কোন দল নয়, অথচ আমরা সত্তর শতাংশ হয়েও নিজেদের ভাগ্য, ভবিষ্যত নির্ধারণে অপারগ শুধুমাত্র আমাদের সবজান্তা গামছাওয়ালা গোছের আত্মতুষ্ট অহংকারী মনোভাবের কারণে। যারা যে ডালে বসে সেই ডাল কেটেই বিশাল প্রাপ্তির আনন্দে উদ্বাহু নৃত্য করে তাদের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সংশয় জাগে বৈকি। আঁতেল ( so called self claimed intellectuals) এবং অলস বাঙালী, যারা কার্যত জেগে ঘুমোয়, তাদের ঘুম ভাঙানো আক্ষরিক অর্থেই অসম্ভব। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য সম্প্রদায়ের সম্বিত ফেরাতে ঈশ্বর মর্ত্যে নেমে আসেন না। আজ থেকে অর্দ্ধ শতাব্দী আগে, বাংলা বিভাজনের সময়েও আসেননি, আগামীতেও আসবেন না। আজ বলতে আমার দ্বিধা দ্বন্দ্ব বা সামান্যতম জড়তা নেই যে, এই সারসত্য উপলব্ধি করার মত জ্ঞানচক্ষু আমাদের আজও উন্মীলিত হয়নি, তাই নিজেদের কৃতকর্মের ফল ভোগ করার জন্য আমাদের তৈরি থাকতে হবে এবং অসম্ভবকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত থাকতে হবে।

যে জাতির কাছে শিক্ষার চেয়ে ভিক্ষা দামী হয়, তাদের পদস্খলন অনিবার্য। অতি বাস্তব যেটা তা হল, অতিরিক্ত জাত্যাভিমানে নিমজ্জিত বাঙালি তার কৌলিণ্যের অহমিকায়, বিহার উত্তরপ্রদেশ নিবাসী তথাকথিত হিন্দীভাষী পান গুটকাখোর বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বশ্যতা স্বীকার করতে চায়নি, তাই তাদের বহিরাগত তকমা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অথচ বিহার নিবাসী প্রশান্ত কিশোরের পাতা ফাঁদে পা দিয়েই আমরা আমাদের মস্ত বড় সর্বনাশটি করে ফেললাম। আসলে আমরা ঘুরিয়ে নাক ধরায় বিশ্বাসী। সেই সঙ্গে আমরা এটাও ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছি, বিহার উত্তরপ্রদেশের unsophisticated নেতৃত্বের প্রতি আমরা যতই উন্নাসিক হই না কেন, লুঙ্গি বাহিনীর উড়ন্ত লাথি আমাদের নৈমিত্তিক অত্যন্ত পছন্দসই খাদ্য তালিকার অন্তর্ভুক্ত একটি মেনু।

এই রসনায় একটা বিশেষ ধরনের পরিতৃপ্তি আছে, কারণ লুঙ্গি বাহিনীর লাথি খেয়ে সহজে হজম করার কৌশল আমাদের করায়ত্ত্ব। এই অভ্যাস আমাদের বংশানুক্রমিক, কারণ আমাদের পূর্ব পুরুষরা বাড়ি ঘর ভিটে মাটি সব ছেড়ে রাতের অন্ধকারে এদেশে শরণার্থী হয়ে আশ্রয় নিয়েও আমাদের শিখিয়ে গিয়েছেন নজরুলের সেই বিখ্যাত গান “মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম …….”

 আসলে ঐক্যবদ্ধতার একটা নিজস্ব ব্যাপকতা আছে, আছে এক সুসংহত শক্তি, আর  ঠিক সেই জায়গাতেই আমরা পরাজিত, পরাজিত হলাম চাকচিক্যে মোড়া আপাত নিষ্পাপ মিথ্যাচার, প্রবঞ্চনার কাছে, পরাজিত হলাম দ্বিজাতিতত্ত্বের কপটতার কাছে, পরাজিত হলাম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় মেরুকরণের ধনুর্ভঙ্গ পনের কাছে।

আমরা ইতিমধ্যেই বঙ্গভঙ্গের কারণে বাংলার ৬৬% অংশ হাতছাড়া করেছি এবং অবশিষ্ট ৩৪% ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গরাজ্য হিসেবে ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছি বিজেপির প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বদান্যতায়। দুর্ভাগ্য, এই ৩৪% ভুখন্ড আমরা ক’দিন নিজেদের আয়ত্বে রাখতে পারব তা নিয়ে ঘোর সংশয় আছে। আমি দেখতে পাচ্ছি বাঙালীর দুর্দিন পুনরায় আগতপ্রায়, দরজায় দরজায় কড়া নাড়বে, হাতছানি দিয়ে উদাত্ত কন্ঠে ডাকবে, আয় বাঙালী আয়, একটা বারের তরে বুকে আয়, যখন গঙ্গা পদ্মা মিলেমিশে একাকার হবে, জল হয়ে যাবে পানি আর আকাশটা আসমান আর ঐ আসমানে প্রকট হবে জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সাম্যবাদের এক ভুবন ভোলানো ছলনাময়ী রংধনু। 

২ রা মে ২০২১ আসলে বাংলার ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক দিন যা গভীর বেদনার সাথে স্মরণ করবে আমাদের শোকাতুর পরবর্তী প্রজন্ম, অন্তত আগামী কয়েকটা শতাব্দী। অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার এই লড়াইয়ে, কারা জিতল কারাই বা হারল তার উত্তর কিন্ত ভবিষ্যতের গর্ভেই রয়ে গেল, অধীর আগ্রহের সাথে উত্তরের প্রতীক্ষায় রইলাম।   

এত আঁধারের মধ্যেও আমি রীতিমত আশাবাদী যে অনতিবিলম্বেই আমাদের সুমতি ফিরবে, হতে পারে সেটা বিলম্বিত বোধোদয় কিন্ত চেতনা আমাদের ফিরবেই। আর তা যদি হয়, সেটা হবে সব দিক থেকেই মঙ্গল। আমার এতটা আশাবাদী হওয়ার নেপথ্যে কারণ হল, যে ২ কোটি ২৮ লক্ষ ভোট বিজেপি পেয়েছে তা শুধুমাত্র হিন্দুদের প্রদত্ত ভোট। অতএব ২০২৬ সালে আমরা সকলে সমবেত কন্ঠে গাইতেই পারি, “ঐ দেখো প্রভাত উদয়”।
(তথ্য এবং বক্তব্য লেখকের নিজস্ব, এজন্য আমাদের ভারত দায়ি নয়।)

4 মন্তব্যসমূহ

  1. অনেক সাহসী বিশ্লেষণ পাচ্ছি এখানে, লেখার মানও প্রথম সারির ! তাই http://www.amaderbharat.com কে শ্রদ্ধা জানাই !হতে পারে অনেক কথা আমি মানতে পারিনা, সেটা একজন পাঠকের চিন্তার ভিন্নতা, কিন্তু এই wabesite পত্রিকা মুক্ত কণ্ঠের ভাষাকে গ্রহণ করতে চায়!

    এই বিপন্নতার যুগে পাঠক মিউ মিউ বিড়ালের ডাকের ভাষায় কিছু নেবে না, এই পত্রিকা সেই দিক থেকে আলাদা দেখছি যতটা পড়েছি, দেখছি !

    আসলে সাহস ছাড়া জ্ঞানের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়, এটা আমি বিশ্বাস করি

    তবে, ধর্ম নিয়ে রেষারেষি উক্তির বিরোধী আমি, আবার এটাও ঠিক, অধার্মিকদের ধর্ম সুবিধেবাদীতা ও সব রকমের ইতরিয়তা !

    তার ফলাফল সমাজে এতো কায়দায় ঠগবাজি ও সেটাকেই গণতন্ত্র বলে চালানো হচ্ছে!

    সব রকম দুর্যোগ কাটিয়ে কবে যে দেশ পৃথিবী সুস্থ হবে, সেটাই ভাবি আর মন খারাপ হয়ে যায় !

    ধন্যবাদ সহ,
    ঋদেনদিক মিত্রো
    Ridendick Mitro

আপনাদের মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here