শিশু কিশোরদের ওপর অতিমারি ও লকডাউনের প্রভাব

আমাদের ভারত, ১২ জুন : অকস্মাৎ, বিশ্বব্যাপী প্রাণচঞ্চল্যকে স্তব্ধ করে দিয়েছে কোভিড। কোভিডের প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউয়ের মারাত্মক প্রভাবে নাজেহাল গোটা বিশ্ব। অনেক দেশেই ইতিমধ্যেই তৃতীয়- চতুর্থ ঢেউ দেখা গেছে। তাই ভারত সহ বিভিন্ন দেশে তৃতীয় ঢেউ আসার আগাম সতর্কবার্তা দিয়েছে বিশেষজ্ঞরা।

এখনো পর্যন্ত এই অতিমারিতে বহু মানুষকে এবং বহু কিছু খোয়াতে হয়েছে। সব হারানোর এই অধ্যায় ঠিক কবে শেষ হবে তা নির্দিষ্ট করে জানে না কেউ। তবে এই অতিমারি কি কি ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করেছে এবং ভবিষ্যতে করবে, তা অনেকেই অনেক ভাবে অনুমান করছে। মানুষের প্রাণ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, রোজগার, জীবনযাপন সবকিছুকেই এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে কোভিড। সব কিছুর মধ্যেই বিশেষজ্ঞরা দাবি করেছিল এই অতিমারির গুরুতর প্রভাব পড়বে মানসিক স্বাস্থ্যে, যা আগামী ঢেউগুলিতে আরও বেশি বাড়বে। শিশু কিশোরদের ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যঘাত ঘটবে সবচেয়ে বেশি।

কোভিড রুখতে আক্রান্ত সব দেশই শারীরিক দুরত্ব ও লকডাউনকে হাতিয়ার হিসাবে গ্রহন করেছিল। সেই লকডাউনে বন্ধ ছিল প্রায় দৈনন্দিন সব গতিবিধিই। ইউনেস্কোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী ১৮৮ দেশে শিক্ষাঙ্গন বন্ধ করা হয়। গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিয়ে যাওয়া হয় অনলাইন ব্যবস্থায়। স্কুল-কলেজ শিশু কিশোরদের শিক্ষার পাশাপাশি যে পরিবেশ তৈরী করে তা তাদের শারীরিক, মানসিক, মানবিক ও চারিত্রিক দিক কেও পরিচর্চা করে। অনলাইন ক্লাস সেই ঘাটতি পূরনে অক্ষম। গৃহবন্দী, লকডাউন, সামাজিক দুরত্ব এবং সর্বোপরি এই অতিমারি শিশু কিশোরদের মানসিক সাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলেছে।

একই ভাবে ‘দ্য লান্সেট’ পত্রিকাও শিশু কিশোরদের ওপর অতিমারি ও লকডাউনের প্রভাবগুলিকে বিস্তারে আলোচনা করেছে।গৃহবন্দী ও স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিশু কিশোররা সামাজিক ভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, সামাজিক মেলা মেশা, খোলা বাতাস, ভাব বিনিময় থেকে দূরে থেকে বিষন্ন হয়ে পড়ছে তারা। কোনও কোনও ক্ষেত্রে পারিবারিক অশান্তি ও অভিভাবকদের ক্রোধ প্রতি মুহূর্তে তাদের একাকিকত্ব বোধ ও মানসিক উদ্বেগকে বাড়িয়ে মারাত্মক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

শিক্ষা ব্যবস্থা স্মার্ট ডিভাইসে জায়গা পেলে অনলাইন ক্লাস ছাড়াও মোবাইল, কম্পিউটার, ল্যাপটপের মত ডিভাইসে তারা অত্যাধিক সময় দিচ্ছে ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে তাদের সৃজনশীলতা, বাড়ছে উত্তেজনা এবং আচরণেরও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সঙ্গে পড়াশোনায় অমনোযোগিতাও বাড়ছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়া পরিবারের শিশু কিশোররা অনলাইন পড়াশোনার সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকছে, ফলে স্কুল ছুট হয়ে তারা কোনও কর্মসংস্থানে যোগ দিচ্ছে। পারিবারিক অশান্তি , গার্হস্থ্য হিংসা তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মানসিক চাপ, হতাশা, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা তাদের মধ্যে বিষন্নতার সৃষ্টি করছে যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদী।
যে সব ছেলে মেয়ে পরবর্তী উচ্চ শিক্ষার জন্য অপেক্ষারত, পরীক্ষার অনিশ্চয়তা তাদের মধ্যে মানসিক চাপ সৃষ্টি করেছে। হতাশা, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা এদের মধ্যেও একই ভাবে কাজ করছে।

এই প্রসঙ্গে এখনও পর্যন্ত হওয়া কয়েকটি সমীক্ষায় জানা গেছে, বেশিরভাগ শিশু কিশোর ও তাদের অভিভাবকরা সন্তানের মানসিক অসুস্থতার প্রধান কারন হিসাবে অতিমারিকেই দেখছে। ঘুম এবং খিদের সমস্যা, রাগ , উত্তেজনা, ভয়, দুশ্চিন্তা, নিত্যকর্মে অনীহা, অলসতা সহজেই তাদের চোখে পড়ে। কিশোরদের মধ্যে অতিমারিতে পরীক্ষা ও ভবিষ্যত নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং নিঃসঙ্গতা তাদের মানসিক চাপের অন্যতম কারন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমীক্ষা বলছে, যে বাড়িতে কোভিডে এক বা একাধিক ব্যক্তি আক্রান্ত হয়েছে তাদের ক্ষেত্রে বাড়ির শিশু কিশোরদের এই ধরনের সমস্যা দ্বিগুন লক্ষ্য করা গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়কে চিন্তার কারন হিসাবে গন্য করে কতগুলি পরামর্শ দিয়েছে।
তবে চিকিৎসাবিদদের দাবি, সমীক্ষার সংখ্যা অনেক কম। আরও বেশি এবং সাম্প্রতিক সমীক্ষার প্রয়োজন কারন মানসিক অসুস্থতা আগামী দিনের অত্যন্ত চিন্তাজনক বিষয়। সেই বিষয়ে অবগত ও সাবধান থাকার প্রয়োজন। অতিমারি, লকডাউনে শিশু কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য যথার্থ ব্যবস্থা গ্রহনের প্রয়োজন বলেও দাবি চিকিৎসাবিদদের।

আপনাদের মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here