নার্সারি তৈরি করে ‘স্বাবলম্বী’ হবার প্রশিক্ষণ দিল বিশ্ববিদ্যালয়

মিলন খামারিয়া
আমাদের ভারত, কল্যাণী, ৩০ জুন: খনার বচনে আছে, ‘মরশুমের ফল, না খেলে যায় রসাতল’। পুষ্টিবিদেরা ফল খাওয়ার কথা প্রতিনিয়তই বলেন। কিন্তু গাছ কেটে ফেলার জন্য বাজারে ফলের যোগান কমে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই সবার পক্ষে ফল কিনে খাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। বিশেষ করে গরিব মানুষের পক্ষে ফল কিনে খাওয়া বিলাসিতার সমান। তাই তাদের একমাত্র উপায় হল নিজের বাড়িতেই বিভিন্ন প্রকারের ফলের গাছ লাগানো।

ফল ভালোবাসে এমন ‘প্রান্তিক ও বিলাসী’ চাষিদের উন্নত জাতের গাছ থেকে ‘কলম’-এর মাধ্যমে চারা তৈরি করে, ফল চাষের প্রশিক্ষণ দিল বিধান চন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ‘ভারতীয় কৃষি অনুসন্ধান পরিষদ'(ICAR) দ্বারা অনুমোদিত ‘সর্ব-ভারতীয় সমন্বিত ফল গবেষণা কেন্দ্র(AICRP ON FRUITS)’।এদিন পুরুলিয়া, পূর্ব বর্ধমান, নদিয়া, উত্তর চব্বিশ পরগনা, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, হুগলি – জেলা থেকে আগত ২৬ জন ফল চাষে উৎসাহী চাষিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। একদিনের এই প্রশিক্ষণ শিবিরে প্রশিক্ষণ দেন অধ্যাপক দিলীপ কুমার মিশ্র, অধ্যাপক কল্যাণ চক্রবর্তী, অধ্যাপক ফটিক কুমার বাউরি, ডঃ অনামিকা কর ও ডঃ দেবলিনা মাঝি।

এদিন প্রশিক্ষণের শুরুতেই অধ্যাপক মিশ্র বিভিন্ন প্রকারের ফলের গুণাবলী নিয়ে আলোচনা করেন। ছোট ছোট চারাগাছকে রোগের হাত থেকে কীভাবে রক্ষা করা যায় তা নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করেন তিনি।

এরপর অধ্যাপক চক্রবর্তী বিভিন্ন প্রাকারের কলমের সাহায্যে কীভাবে উন্নত জাতের ফলের চারাগাছ তৈরি করা যায় তা বুঝিয়ে বলেন। গুটি কলম,জোর কলম,ছেদ বা কাটা কলম কীভাবে দিতে হয়, তা হাতে কলমে শেখানও তিনি।

তারপর অধ্যাপক বাউরি বিভিন্ন প্রকারের হরমোনের সাহায্যে কলমের চারার দ্রুত শ্রীবৃদ্ধি কীভাবে করা যায়, তা বুঝিয়ে বলেন।

কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপিকা কর আম, কাঁঠাল, কলা, পেয়ারা, লিচু, সবেদা প্রভৃতি ফলের গাছে কী কী পোকার আক্রমণ হতে পারে এবং সেই পোকাদের হাত থেকে কীভাবে ফসলকে রক্ষা করা যায়, তা আগত চাষিদের বুঝিয়ে বলেন।বিশেষ করে জৈব পদ্ধতিতে পোকামাকড় মারার জন্য বিভিন্ন প্রকারের ফাঁদ ব্যবহার করার পরামর্শ দেন তিনি।

এছাড়া ডঃ মাঝি উপস্থিত ফল চাষিদের ফল গাছে কখন, কী কী সার, কতটা পরিমাণে (রাসায়নিক ও জৈব সার) প্রয়োগ করা উচিত, তা বুঝিয়ে বলেন।

আজকের প্রশিক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে প্রকল্প আধিকারিক প্রফেসর দিলীপ কুমার মিশ্র জানান, “আত্মনির্ভরশীল ভারত গড়তে ও ভারতের যুব সমাজকে স্বাবলম্বী হবার পথ দেখানোর জন্যই আজকের এই প্রশিক্ষণ শিবির। আমাদের দেশে প্রায় আশি হাজার কোটি টাকার ফল আমদানি করতে হয়। তাই ফল চাষ করলে দেশের যুবসমাজ যেমন ‘স্বাবলম্বী’ হতে পারবে তেমনি দেশের ‘বৈদেশিক মুদ্রা ভান্ডার’ও সুরক্ষিত থাকবে। পাশাপাশি মানুষের শারীরিক পুষ্টির চাহিদাও মিটবে।”

বিধান চন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে চল্লিশ প্রকারের ফলের গাছ আছে। উপস্থিত চাষিরা সেই সব ‘ফল গাছের বাগান’ মাঠে ঘুরে ঘুরে দেখেন।আম, কলা, লিচু, পেয়ারা, কাঁঠাল, সবেদা, আঁশফল, কামরাঙা, চেরি, গোলাপ জামুন, মৌসম্বী, ড্রাগন, বেদানা, আলুবোখারা, ফলসা প্রভৃতি গাছকে চিনিয়ে দেন প্রফেসর মিশ্র। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৬০ প্রকারের কলা ও ১৪০ প্রকারের আম গাছের জাত আছে বলেও তিনি জানান।

ফল যে শুধু মানুষই খায় তা নয়। বিভিন্ন পশু-পাখিও ফল খেয়েই বেঁচে থাকে। তাই পৃথিবীতে বসবাসকারী পশু-পাখিদের খাদ্যের সংস্থানের জন্যও ফল চাষ করা ভীষণ প্রয়োজন।

উপস্থিত ‘ফলবিলাসী’রা পরবর্তীকালে নার্সারি তৈরি করে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে যাতে ‘স্বাবলম্বী’ হতে পারে সেই দিকে লক্ষ্য রেখেই আজকের এই প্রশিক্ষণ শিবিরের আয়োজন করা হয়। প্রশিক্ষিত চাষিদের ভবিষ্যতে বিভিন্ন প্রকারের ফলের গাছ ও ছোটো ছোটো যন্ত্রপাতি প্রদান করবেন বলেও প্রকল্প আধিকারিক অধ্যাপক মিশ্র জানান। পাশাপাশি আজই প্রত্যেক চাষিদের হাতে একটা করে ‘ফলের গাছ’ দেওয়া হয়। এছাড়া কিছু চাষিদের ‘পলি হাউস’ তৈরির জন্য আর্থিক সাহায্যও করা হয় আজকের অনুষ্ঠানে। শিবির শেষে সকলকেই ‘শংসাপত্র’ দেওয়া হয়।

আপনাদের মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here