‘পান’-এর জন্য দুনিয়া তোলপাড়

মিলন খামারিয়া
আমাদের ভারত, কলকাতা, ২ জুলাই: সে বহু যুগ আগের কথা! রাজার নির্দেশে ধনপতিকে যেতে হবে সিংহলে। বহুদিন ওদেশ থেকে কোনও সওদাগর আসেনি। দেশে তাই গুয়া-র বড় অভাব! রাজা চিন্তিত! কীসে সাজা হবে তাম্বুল, কী দিয়ে রাখবে অতিথিদের মান? কাজেই, রাজ-নির্দেশে ধনপতি নৌকা ভাসালেন নোনাজলে। হাত পেতে নিতে হল রাজার দেওয়া তাম্বুল। সেইসঙ্গে শালবস্ত্র, লক্ষ মুদ্রা, তুরঙ্গ, বর্ম ও ফলা কাটারি। যথাসময়ে যাত্রা শুরু হল। পিছনে পরে রইল উজানিনগর, দুই স্ত্রী – লহনা আর খুল্লনা।

তা হলেই ভাবুন, কেমন ছিল পানের কদর! আজও কিছু কমেনি! চব্য, চষ্য, লেহ্য, পেয় যতই উদরস্ত হোক, যতক্ষণ না মুখে পানটি পড়ছে, মন খুশ হয় না! পুজোপার্বন থকে শান্তিস্বস্ত্যয়ন…বাঙালির যে-কোনও অনুষ্ঠান তাকে ছাড়া অসম্পূর্ণ! বাঙালির বড় প্রিয় বন্ধু এই পান! বাঙালিরা মনে করেন, ব্রহ্মা তুষ্ট সুপারিতে, বিষ্ণু পানে এবং মহাদেব চুনে। পানের খিলিতেই বাস করেন ত্রিদেব।

কিন্তু কোথা থেকে এল পান? পন্ডিতদের মতে, পান অস্ট্রো-এশিয়াটিক, ইন্দো-এরিয়ান নয়। আদি ঠিকানা ফিলিপিন্স, সেবিস কিংবা জাভা, বোর্নিও। তবে, ভারতীয়দের ধারণা, পান একান্ত স্বদেশি। যদিও আদিকালে পৃথিবীতে পান ছিল না!

অশ্বমেধ যজ্ঞের সময় পানের জন্য দুনিয়া তোলপাড় করেন পঞ্চপাণ্ডব। হস্তিনাপুর ছাড়িয়ে নানা দিকে খোঁজ পড়ে যায়। কিন্তু কোথাও পান নেই! খুঁজতে খুঁজতে সন্ধানীরা পৌঁছান পাতালপুরীতে। সাপের রানীর ঘরে। তখন বাসুকী তাঁদের খোঁজে সন্তুষ্ট হয়ে উপহার দেন হাতের কনিষ্ঠ আঙুল। সেই আঙুল মাটিতে পুঁতলে জন্মায় পানের বল্লরী। সে গাছের ফুল নেই, ফল নেই। কেবল কচি সবুজ পাতা। সংস্কৃতে তাই পানের আর এক নাম ‘নাগবল্লরী’।

অনেকে আবার মনে করেন, অর্জুন স্বর্গ থেকে চুরি করে এনেছিল পানের চারা। পুঁতেছিল রাজবাড়ির বাগানে। সেখান থেকেই মর্তে পানের প্রচলন।

প্রচলন যেভাবেই হোক না কেন, পান ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে রয়েছে। তাই পান চাষের গুরুত্ব উপলব্ধি করে ‘পান চাষের বিভিন্ন রোগ ও তার প্রতিকার’ বিষয়ে ওয়েবিনার করল ভারতীয় কিষাণ সঙ্ঘ।

এদিন শুরুতেই উদ্বোধনী সঙ্গীত পরিবেশন করেন সঙ্ঘমিত্রা মিশ্র। সঙ্গীত শেষে ‘স্বাগত ভাষণ’ দেন ভারতীয় কিষাণ সঙ্ঘের সহ-সভাপতি আশিস সরকার(পশ্চিমবঙ্গ প্রান্ত)। এই ‘ওয়েবিনার’-এ মূল বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক গৌতম মন্ডল(বিধান চন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়)।

অধ্যাপক মন্ডল জানান, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, অসম, অন্ধ্রপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ প্রভৃতি রাজ্যে পান চাষ হয়ে থাকে। তবে ভারতের এক-তৃতীয়াংশ পানের চাষ হয় আমাদের রাজ্যেই।

পানের কয়েকটি উন্নত জাতের মধ্যে রয়েছে – বাংলা (কালীঢল, বেনারসী, ভবানী, আইমাল, কোরে বাঙাল বা গেঁঠে বাঙাল ), সাঁচী (বনলতা, সোনালি) এবং মিঠাপাতা (থাকপালা, গাঁটপালা ও পালামুক্ত হাইব্রিড)। বিভিন্ন এলাকা ভিত্তিক এই নাম হয়ে থাকে। সাধারণ ‘বাংলা’ ও ‘মিঠা’ পানের চাষ হয় পশ্চিমবঙ্গে।

উঁচু, উর্বর, জল নিকাশীযুক্ত দোঁয়াশ, এঁটেল–দোঁয়াশ মাটিই পান চাষের জন্য উপযুক্ত। মাটির পি. এইচ. (অম্লত্ব বা ক্ষারত্ব) এর মান ‘৭’ এর কাছাকাছি হওয়া বাঞ্ছনীয়। বরজের জমির তল বা প্লেট চারপাশের জমির তল থেকে কমপক্ষে ১০-১৫ সেমি উঁচু হতে হবে বলেও অধ্যাপক মন্ডল জানান।

পানের চারা লাগানোর জন্য দুটি ভাটি বা পিলির মধ্যে দূরত্ব থাকা উচিত ৫০-৫৫ সেমি এবং দুটি চারার মধ্যে দূরত্ব থাকা উচিত ১০-১৫ সেমি এবং বরজের উচ্চতা ২ মিটার অর্থাৎ ৬ ফুট এর কাছাকাছি হতে হবে। সেইসাথে প্রখর রোদ যাতে না লাগে তার জন্য প্রয়োজনীয় ছাউনির ব্যবস্থা করতে হবে, অন্যথায় পাতা ফ্যাকাসে, সাদাটে হয়ে যাবে।

বর্ষাকাল ও শীতকালে ছাউনি কমাতে হবে যাতে হাল্কা রোদ লাগে। কিন্তু ঠাণ্ডা বাতাস, কুয়াশা, ঝোড়ো হাওয়া যাতে গাছে না লাগে এবং এতে যাতে গাছ নষ্ট না হয় তার জন্য চারপাশের বেড়া ভাল করে দিতে হবে।

পরিমিত জল দিতে হবে। ভাসিয়ে সেচ দেওয়া যাবে না, কলসি বা টিন বা সরু পাইপ দিয়ে ভাটিতে ধীরে ধীরে হাল্কা সেচ দিতে হবে। গরমের সময় প্রায় প্রতি দিনই হাল্কা সেচ দিতে হবে। জল দেওয়ার সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন মাটি পাতাতে ছিটকে না লাগে, নতুবা পাতায় রোগাক্রমণ হতে পারে।

নাইট্রোজেন, ফসফেট, পটাশ, ম্যাঙ্গানিজ, বোরন, জিঙ্ক, মলিবডেনাম প্রভৃতি রাসায়নিক এবং নিম খইল, কেঁচোসার, তিল খইল – জৈব সার দেবার কথাও তিনি জানান।

পান গাছের পাতা পচা, গোড়া পচা, পাতায় দাগ প্রভৃতি রোগ হয়ে থাকে। কীটশত্রু হিসেবে সাদা মাছি, কালো মাছি, দয়ে পোকা, হলুদ ও লাল মাকড়, চিরুনী পোকা, জাব পোকা, মাটির কৃমি – এরা পানের ক্ষতি করে থাকে।

এই সব রোগ-পোকার হাত থেকে গাছকে রক্ষা করার জন্য বোর্দু মিশ্রণ, ব্লাইটক্স-৫০, ট্রাইকোগার্ড, ফ্লাইটোলান প্রভৃতি কীটনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে বলেও প্রফেসর মন্ডল জানান।

আজকের ওয়েবিনারের গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে ভারতীয় কিষাণ সঙ্ঘের প্রচারপ্রমুখ ডঃ কল্যাণ জানা বলেন, “পান ভীষণ অর্থকরী ফসল। দশ কাঠা জমিতে পান চাষ করলে একটি পরিবারের গ্রাসাচ্ছাদন খুব ভালোভাবে হতে পারে। বিদেশেও পানের চাহিদা রয়েছে। তাই পান রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা যেতে পারে। পানের উত্তরোত্তর চাহিদার কথা মাথায় রেখে চাষিভাইদের পানচাষে আগ্রহী করে তোলার জন্যই এই ওয়েবিনারের আয়োজন করা হয়েছে।”

যে কোনও ভুরিভােজের পরে শেষপাতে পান না হলে বাঙালির ঠিক জমে না। রাংতায় মােড়া মশলাসমৃদ্ধ সবুজ পাতা ছাড়া যে কোনও আয়ােজনই ব্যর্থ। শুধু এদেশে নয়, পানের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে বিদেশেও এর কদর সেই প্রাচীন আমল থেকেই। ফিলিপিন্স, মায়ানমার, নেপাল, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম সহ একাধিক দেশে রয়েছে পানের প্রচলন। তবে যাঁরা পান খেতে ভালােবাসেন, তাঁদের কাছে অবশ্য কোনও অনুষ্ঠানের প্রয়ােজন হয় না। বিয়েবাড়ি বা অন্য কোনও আয়ােজনের অপেক্ষায় না থেকেই তাঁরা পান নিয়ে বিলাসিতা পছন্দ করেন।

বােধহয় এঁদের কথা মাথায় রেখেই শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে শতশত পানের দোকান। আর সেসব দোকানে চিরাচরিত মিঠে পাতার পান ছাড়াও শােভা পাচ্ছে হাল আমলের একাধিক নানা স্বাদের পান। আমাদের এখানে মূলত মিষ্টি পানের কদরই বেশি। আগেকার চিরাচরিত পানের জায়গায় এখন আকছার বিক্রি হচ্ছে চকোলেট পান, ফার্স্ট নাইট পান, মশলা পান।

হাজার হাজার বছরের পুরনো ভারতীয় সভ্যতার সাথে পানের সম্পর্ক রয়েছে। পান নিয়ে শুধু পুরাণেরই কাহিনী নেই বাস্তবেও রয়েছে পানের ঝুড়ি ঝুড়ি গল্প! আরবি হেকিম আতা ইবন আহামদ বলেছিলেন, ‘পানের অনেক গুণ। দোষ একটাই – আরব মুলুকে আনতে না আনতেই পান শুকিয়ে যায়।’ উপায়? ইয়েমেন-এর লোকজন তাই এদেশ থেকে ওদেশে খাঁটি মধুতে ভিজিয়ে নিয়ে যেত পানপাতা। এতে পাতা শুকিয়ে তো যেতই না, উলটে হল আরও মিঠে।

ইংরেজ ভারত ছাড়ল! দেশভাগ হল । চারদিকে হাহাকার, রক্তারক্তি! সেই দুঃসময়েও পাকিস্তান কিন্তু পানের কথা ভোলেনি। পান ছাড়া নাকী তাদের খাবার হজম হবে না! কাজেই, ভারত থেকে ওদেশে গেল পান!

মার্কণ্ডেও পুরাণে রয়েছে,
পানের অগ্রভাগে পরমায়ু, মূলভাগে যশ এবং মধ্যে লক্ষীর অবস্থান। সেইজন্যই এই তিন ভাগ ফেলে পান খেতে হয়। সুপারি ছাড়া পান খেলে রেহাই নেই। দোষ কাটাতে যেতে হবে গঙ্গাস্নানে। না হলে পরের জন্মে জন্ম হবে চণ্ডালের ঘরে! পানের এমনই প্রভাব!

আপনাদের মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here