করোনা নিয়ে এরাজ্যের কয়েকটা রহস্যের উত্তর মেলেনি

ড. রাজলক্ষ্মী বসু
আমাদের ভারত, ২৭ এপ্রিল: এখন সারা পশ্চিমবঙ্গই কমলা। না না, রাজনৈতিক রঙ নয়। এ হলো করোনার রঙ। করোনার প্রকোপে যেখানে আতঙ্ক সব থেকে বেশি সেগুলি হল লাল- কলকাতা, হাওড়া, উত্তর চব্বিশ পরগনা এবং পূর্ব মেদিনীপুর। আপাত করোনা মুক্ত অর্থাৎ সবুজ জেলা কেবল পশ্চিম মেদিনীপুর আর পূর্ব বর্ধমান। বাকি সব জেলা কমলা। হঠাৎ রঙ নিয়ে কেন ? কমলা আর লাল যে পরিমানে, স্বাস্থ্য চিত্র কি সত্যিই সেই অনুপাতে! সঠিক তথ্য পাওয়ার জন্য কেন নানান দিক থেকে এতো তর্কবিতর্ক? সত্যি বলুন তো মৃত্যু ও রোগী পরিষেবাতে স্বচ্ছতায় সহমত ক’জন রাজ্যবাসী? রাজনৈতিক কলহে যারা রাজ্য ব্যবস্থাকে ফুলমার্কস দিচ্ছেন তারাও কি ভিতরে ভিতরে আতঙ্কিত না!

প্রথমেই দেখাগেল কেন্দ্রীয় দল, অর্থাৎ Inter Ministerial Central Team ( IMCT) লাল চিহ্নিত অঞ্চল পরিদর্শনের জন্য আসতে চাইলে কি অসহযোগিতা, বিরক্তি। কিন্তু কেন? গত ২০/০৪/২০২০ সকালে IMCT হলে রাজ্য সরকার কার্যত দেখেও না দেখার ভান করে থাকে। সন্ধ্যা ছটার পরে রাজ্যের মুখ্যসচিব লকডাউন বিষয়ে সংক্ষিপ্ত বিবরন দেন। কেন্দ্রীয় দলটিকে পুণরায় ২১/০৪/২০২০ সকাল এগারোটা নাগাদ নবান্নে আসতে বলা হয়। বিস্তারিত আলোচনার উদ্দেশ্যে। কিন্তু এবারেও ফল ফললো না। কথা আর কাজে এ কি ভীষণ বৈপরীত্য। কিন্তু কেন্দ্রীয় দলকে সবরকম সহযোগিতা আর স্বাস্থ্য বৃতান্ত দেবে এমনটাই বলেছিল। বলতে যে হবেই। কারণ তাহলে ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট ২০০৫ এর ৩৫ ধারা সরাসরি লঙ্ঘিত হতো। যে রাজ্যে এতগুলো কমলা চিহ্নিত জেলা তাদের কেন কেন্দ্রীয় সহযোগিতা বা পরামর্শ নিতে এতো ঢিলেঢালা বা আপত্তি?

এবার দেখা যাক কেন্দ্রীয় দলের জিজ্ঞাসায় কি উত্তর দিয়েছিল রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তর। অসঙ্গতিতে ভরা সে তথ্য। CNCI এবং বাঙ্গুর হাসপাতাল পরিদর্শনের পর প্রথম জিজ্ঞাসা, পরীক্ষা ও তার ফল আসতে সময় লাগছে গড়ে পাঁচদিন। স্বাভাবিক নিয়মে অনেকেরই ফল ( রিপোর্ট) নেগেটিভ আসছে। এমন মারাত্মক সংক্রমণ রোগের ক্ষেত্রে এই সময়টা কি মানানসই? বড় জিজ্ঞাসা তাদের জন্য যাদের রিপোর্ট নেগেটিভ আসছে, তারা তো চার পাঁচ দিন ঐ হাসপাতালে প্রতীক্ষারত। এ যে আশঙ্কা বাড়া বই কমায় না। দ্বিতীয় জিজ্ঞাসা, অন্য হাসপাতাল থেকে রোগীকে বাঙ্গুর আসতে হয়। স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি কেন নিজের দায়িত্বে আসছেন? এ যে COVID 19, ডায়রিয়া নয়। এস্কর্ট করে এই রোগীকে নিয়ে আসা উচিৎ। পরের জিজ্ঞাসা, বাঙ্গুরের রোগী প্রতিক্ষালয়ে কি সামাজিক দূরত্ব রক্ষার ব্যবস্থা আছে? হিতে বিপরীত এর আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বাঙ্গুর হাসপাতালে এই মুহূর্তে ৩৫৪ টি COVID 19 রোগীকে অতি জরুরী পরিসেবা দিতে পারে। কিন্তু ভেন্টিলেশন মাত্র ১২টা। অনুপাত কি সত্যিই সবার কপালে ভাঁজ ফেলছে না? ডেথ সার্টিফিকেট বুঝি চার ঘণ্টা অতিক্রম করলে তবেই মিলছে। ততক্ষণ শবদেহ কি সত্যিই ওয়ার্ডে শায়িত থাকছে? এ বিষয় নিয়ে জলঘোলা জিজ্ঞাসা দুই’ ই গাঢ়।

রাজ্য করোনা পরীক্ষা ও পরিস্থিতির যে রিপোর্ট/ প্রেজেন্টেশান স্বাস্থ্য দপ্তর করেছে তাও যেন একটু জিজ্ঞাসা বা কিন্তু কিন্তু ভাবনা উস্কে দেবে। IMCT কে রাজ্য এই তথ্য দেয় যে এই মুহূর্তে ( রিপোর্টের গত চারদিন) গড়ে ৪০০ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৯০০ COVID 19 টেস্ট হচ্ছে। কিন্তু জিজ্ঞাসা, এর মধ্যে রিপিট টেস্ট এবং প্রথম টেস্ট কত জনের হচ্ছে? আরো একটি আংশিক নন টেকনিক্যাল রিপোর্ট উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয়, দৈনিক জেলাপ্রতি বুঝি দু’ লাখের কাছাকাছি ব্যক্তির ‘ স্ক্রিনিং ‘ করা হচ্ছে। কিন্তু তাতে ক’জনের COVID 19 পরীক্ষা হচ্ছে এবং পজিটিভই বা ক’জন তার কোনও উল্লেখ নেই। যে পরিমাণে টেস্টের হিসেব দেওয়া হচ্ছে তাতে তো থিওরেটিকালি টেস্টের শিখরে রাজ্য। কিন্তু সত্যিই কি তাই? কারণ সংক্রমণের দিক থেকে তো রাজ্য গ্রাফের শুরুর দিকে। অন্ততঃ অন্যান্য রাজ্যের তুলনায়।

কেমন আছেন সেই যোদ্ধারা? ডাক্তার নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্য কর্মীরা। তাঁদের দৈনিক পদ্ধতিতে পরীক্ষা করা হচ্ছে তো? কেন তবে তারাও সন্তুষ্ট নয়? সামাজিক ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা কেন তাঁদের উপরে খাঁড়ার মতো বিদ্যমান।

কেন্দ্রীয় দল এ রাজ্যে আসার পর এই আশ্চর্য রিপোর্ট সামনে আসে, স্বাস্থ্য দপ্তরের COVID19 অডিট বলছে ০৩/০৪/২০২০ পর্যন্ত ৫৭ জন COVID19 পজিটিভ ও মৃত। তাহলে কেন ১৮টাই করোনা মৃত্যু? কো- মরবিডিটি তত্ত্ব। এই রিপোর্ট পেশ হয় ২ ৪/০৪/২০২০ তে। কেন্দ্রীয় দলের উপস্থিতিতে কার্যত বাধ্য হয়ে।

এখনো দুটো সংখ্যা সহাবস্থান করছে ৫৭ এবং ১৮। বিচার না হয় সচেতন পাঠকরা করুক। আরো একটা তথ্য দিই, তাহলে বিচার করা সহজ হবে। ১২ এপ্রিল বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সুপার আইএএস মহুয়া ব্যানার্জি’কে চিঠিতে জানান দু’ জন রোগীর সাত দিন শ্বাসকষ্টে ভুগে মৃত্যু হয়েছে। এবার কি হবে সেই মৃতদেহ? অন্য সময় বুঝি কো- মরবিডিটিতে রোগীর মৃত্যু হলে চিঠি এভাবেই করতে হতো? কি বলবেন সবাই?

আপনাদের মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here