৩৯৬ বছরের প্রাচীন রথযাত্রায় এবারে হবে নিয়ম-রক্ষার পুজো

অমরজিৎ দে, ঝাড়গ্রাম, ২১ জুন: করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রুখতে সমস্ত জায়গার রথের দড়িতে টান পড়বে না, রথের দড়িতে টান পড়বে না গোপীবল্লভপুরেও। তবে এখানে রথের দড়িতে টান পড়বে নিয়ম-রক্ষার। ৩৯৬ বছর ধরে গোপীবল্লভপুরের রথযাত্রা মাহেশের পরেই সর্ববৃহৎ এই রথযাত্রা কিন্তু এবারে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে রথযাত্রার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্দির কমিটি।

মন্দিরের মহন্ত শ্রীশ্রী কৃষ্ণ কেশবানন্দ দেব গোস্বামী জানান, এবছর কাপাসিয়া মাসির বাড়ি পর্যন্ত যাবে না রথ। তবে নিয়ম রক্ষার জন্য মন্দির থেকে ১০০ মিটারের মধ্যে একটা অস্থায়ী মাসির বাড়ি তৈরি হয়েছে সেখানে সামাজিক সরকারি সমস্ত নিয়ম মেনেই ৯ দিন ধরে চলবে সমস্ত পূজা-পার্বণ। শ্রীচৈতন্য দেবের অবতার রূপে বন্দিত রোহিণীর যুবরাজ যুগপুরুষ রসিকানন্দ প্রভু ১৬২৫ খ্রিস্টাব্দে সিপাহী বল্লভপুরের রথযাত্রার প্রবর্তন করেন। জগদগুরু শ্যামানন্দ প্রভুর পৌরহিত্যে শ্রীজগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রার জন্য তিনটি বড় রথে রথ যাত্রার সূচনা হয়। তৎকালীন ময়ূরভঞ্জের মহারাজা প্রতিবছর তিনটি রথ নির্মাণের প্রতিজ্ঞা করেন, সেই থেকেই হয়ে আসছে রথযাত্রা। পুরীর শ্রী জগন্নাথের স্বপ্নাদেশে শ্রী রসিকানন্দ প্রভুর শিষ্য পুরীর রাজা গজপতি লাঙ্গুলা নৃসিংহদেবে নব কলেবরের সময় পুরীর জগন্নাথের চারটি বিগ্রহ (জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা ও সুদর্শন) ও গোপীবল্লভপুরে শ্রীজগন্নাথ বলরাম সুভদ্রার বিগ্রহ একটি বৃক্ষের দ্বারা নির্মাণ করান। এক বিগ্রহ পুরীর মন্দিরের বিরাজিত হয় এবং অন্য বিগ্রহ গোপীবল্লভপুর শ্রীগোবিন্দ মন্দিরে বিরাজিত হয়। সেই বছর থেকে দিল্লির মোগল রাজদরবার থেকে প্রতিবছর রথ যাত্রার উৎসবে ভেট আসতো।

ধর্মজগতে গোপীবল্লবপুর রথ যাত্রার গুরুত্ব অপরিসীম হওয়ার কারণ প্রায় ৩৫০০–এর বেশি মঠ মন্দির আশ্রম সমূহের প্রধান কার্যালয় হওয়ায় শ্রীপাট গোপীবল্লভপুরের রথযাত্রার বাংলা দ্বিতীয় প্রাচীনতম রথযাত্রা। প্রান্তিক বাংলার নানা দুর্দশার আরণ্যিক জীবনের মধ্যেও পারম্পরিক নিষ্ঠা ও মর্যাদায় আজও অমলিন গোপীবল্লভপুর। গোপীবল্লভপুর এককালে ছিল কাশিপুর। শ্যামানন্দ ও রসিক আনন্দের বদান্যতায় সমৃদ্ধ জনপদে পরিণত হয়। গোপীবল্লভপুরের নানা উত্থান-পতনের সাক্ষী মানব সভ্যতার অন্ধকারাচ্ছন্ন অধ্যায় সবই দেখা সুবর্ণরেখা নদীর তীরের এই জনপদটির। মাঝখানে ময়ূরভঞ্জ মহারাজ জমিদারি প্রথার বিলোপের জন্য রথের কাঠ দিতে না পারায় তৎকালীন মোহন্ত মহারাজ শ্রীশ্রী গোপাল গোবিন্দ দেব গোস্বামী সুদৃশ্য নতুন রথ বানিয়ে দেন। এই যাত্রার প্রবর্তক রসিকানন্দের ত্রয়োদশ পুরুশ শ্রীকৃষ্ণ কেশবানন্দ দেব গোস্বী। তাঁর ৩৬ হাজার একর সম্পত্তির জমিদারি আজ ইতিহাসের পাতায়। তাঁর প্রবর্তিত রথযাত্রায় এখনো হাজার হাজার ভক্তের সমাগম হয়ে আসছে।

আপনাদের মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here