বিজেপিতে এখন নতুনদের দাপট, দায়িত্ব ছাড়তে চাইছেন মণ্ডল নেতারা

বিজেপিতে এখন নতুনদের দাপট, দায়িত্ব ছাড়তে চাইছেন মণ্ডল নেতারা

প্রদীপ কুমার দাস, আমাদের ভারত, ১৪ সেপ্টেম্বর: বিজেপিতে এখন রমরমা নতুনদের। তাঁদের চাপে কোনঠাসা পুরনো নেতৃত্ব। এই অবস্থায় তাঁরা এখন দলে গুরুত্বহীন। অনেকেই এখন কার্যত ঠুঁটো জগন্নাথ। পদ থাকলেও ক্ষমতা নেই হাতে। এই পরিস্থিতিতে দলের সাংগঠনিক পদ থেকে সরে যেতে চাইছেন মণ্ডল এবং জেলা স্তরের অনেকেই। গোটা রাজ্য রাজ্য জুড়েই এই একই চিত্র।

বেনোজল আটকাতে রাজ্য নেতৃত্ব স্ক্রিনিং কমিটি করার পর মূলত তৃণমূল থেকে প্রভাবশালীদের আসা অনেকটাই কমেছে। কিন্তু মণ্ডল এবং জেলাস্তরে যোগদান চলছেই। নিচু তোলার নেতাদের অভিযোগ কোনও প্রভাবশালী বা সমাজে প্রতিষ্ঠিত কেউ যোগ দিচ্ছেন না। এই যোগদানকারিদের মধ্যে রয়েছেন আর্থিকভাবে খুব সচ্ছল ব্যক্তিরা। অভিযোগ, এদের বেশিরভাগই প্রমোটার। অনেক ক্ষেত্রে এলাকায় ‘সাদা কাপড়ের ক্রিমিন্যাল’ বলে পরিচিতরাও বিজেপিতে যোগ দিচ্ছেন। এছাড়া আছে, জমি মাফিয়া, বড় বড় সিন্ডিকেট ব্যবসায়ী, পণ্যের ডিস্ট্রিবিউটার, ইমারতিদ্রব্যের বড় ব্যবসায়ী—এই অভিযোগ বিজেপির পুরনো নেতৃত্বের। এদের দলে নেওয়ার ক্ষেত্রে মণ্ডল সভাপতিদের আপত্তি থাকলেও তা ধোপে টিকছে না। জেলা নেতৃত্বের হাত থেকে তাঁরা বিজেপির পতাকা নিচ্ছেন। এমনকী জেলা নেতৃত্বের চাপে দলীয় সমস্ত নিয়মনীতি উপেক্ষা করে সক্রিয়কর্মী হওয়ার ফর্ম দিতেও বাধ্য হচ্ছেন বলে জানান কয়েকজন মণ্ডল সভাপতি। কারণ খাতায় কলমে সক্রিয়কর্মী হলে আগামী দিনে তাঁরা দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসতে পারবেন। বেশ কিছু মণ্ডল সভাপতির অভিযোগ, এর পিছনে রয়েছে টাকার খেলা। এই টাকা খুব একটা কম নয়। দলে এসেই তাঁরা স্থানীয় কার্যকর্তাদের কোনও গুরুত্ব দিছেন না। দেদার টাকা খরচ করে মিটিং মিছিল করে কার্যত কোণঠাসা করে দিচ্ছেন আদি নেতাদের।

এইসব নবাগতদের সম্পর্কে দীর্ঘদিনের পোড় খাওয়া এক বিজেপি নেতা জানান, তাঁদের টাকার জোর রয়েছে। টাকা খরচ করে বড় বড় মঞ্চ করে মিটিং করছে। টাকায় তাদের কাছে আমরা পেরে উঠছি না। আমাদের মত পুরনো কার্যকর্তারা যেখানে তিন হাজার টাকা খরচ করতে সমস্যায় পড়ি, সেখানে তাঁরা অনায়াসে তিরিশ চল্লিশ হাজার টাকা খরচ করে সভা করছে। বিজেপি নেতার আক্ষেপ, লোকে মনে করছে এখন বিজেপির রমরমা সময়। কিন্তু এই সময়ও আমরা চল্লিশ পঞ্চাশ জন লোক জোগাড় করতে হিমশিম খাই। অথচ নব্যরা অনায়সে তিন চারশ লোক নিয়ে মিটিং করছে। খরচের বহরও চোখে পড়ার মতো। এলাকায় মিটিং মিছিলে যে লোক দেখা যাচ্ছে তার প্রায় সবটাই এই নব্যদের হাত ধরে আসা। জেলা নেতৃত্ব এই ভিড় দেখে পুরোনোদের গুরুত্ব না দিয়ে নব্যদেরই তোল্লাই দিচ্ছেন। এই ভিড় বিজেপির আসল সমর্থক বা ভোটার নয়। এলাকাতে এর ফলে বিরূপ প্রভাবও পড়ছে।

একই চিত্র উত্তর বঙ্গেও। উত্তর বঙ্গের একটি জেলায় বিজেপির সমস্ত শাখা সংগঠনেই দায়িত্বে রয়েছেন সংঘ ঘনিষ্ঠ পুরনোরা। কিন্তু মূল সংগঠনের সভাপতির অন্যদল থেকে আসা ব্যক্তি। এক্ষেত্রে শাখা সংগঠনের নেতারা অন্য দল থেকে আসা ‘আবর্জনা’ আটকাতে পারছেন না বলে জানান। এই নিয়ে তাঁরা রাজ্য নেতৃত্বকে চিঠিও দিয়েছেন। নব্যদের প্রভাব এতটাই যে অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা সমান্তরাল সংগঠন করে ফেলেছেন। বিভিন্ন সময় তাঁর অনুগামীরা বিভিন্ন নামের অনুষ্ঠান বা সভা করছেন। এলাকার বিজেপি নেতৃত্ব জানেন না যে এরকম একটা সভা হচ্ছে। তাতে বিজেপির জেলা নেতৃত্বের অনেককেই হাজির থাকতে দেখা যাচ্ছে। দলে যোগ দিয়েই অর্থ এবং নিজেদের সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে পুরোনদের কোণঠাসা করে দিচ্ছেন বলে মণ্ডল এবং কোনও কোনও ক্ষেত্রে জেলাতেও একই অভিযোগ।

কলকাতা সংলগ্ন একটি জেলার ক্ষেত্রেও একই অভিযোগ তুলেছেন বিজেপির দীর্ঘদিনের পুরোনো নেতারা। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির কাট আউট পোড়ানো এক সিপিএম কর্মী এখন বিজেপির নেতা। এক সময় সুইমিং পুলে মদের গ্লাস হাতে তাঁর সঙ্গিনীকে পাশে নিয়ে ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করেছিলেন তিনি। লিখেছিলেন, ‘লাইফ ইজ লাইক সেক্স…যদি একবার একে ভয় পেয়ে যাও তাহলে আর কোনও দিন একে উপভোগ করতে পারবে না।’ বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর অবশ্য এই পোস্ট তিনি ডিলিট করে দিয়েছেন। দলে যোগ দিয়েই মণ্ডল সভাপতির দায়িত্ব পেয়ে যান। কিন্তু স্থানীয় স্তরে তীব্র প্রতিবাদ হওয়ায় তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ওই ব্যক্তিকেই পরে আবার জেলাসভাপতি করে দেওয়া হয়। অভিযোগ, এর পিছনে সঙ্ঘ ঘনিষ্ঠ এক প্রভাবশালী ব্যক্তির হাত রয়েছে।

এক বিজেপি নেতার অভিযোগ তাঁকে অন্ধকারে রেখে এলাকার এক মহিলাকে রাজ্য নেতৃত্বের হাত থেকে পতাকা নিয়ে বিজেপিতে যোগদান করানো হয়েছে। গোটা কাজটাই করেছেন জেলার দুই প্রভাবশালী নেতা। শুধু অর্থ আছে বলেই তিনি রাজ্য নেতার হাত থেকে পতাকা নিতে পেরেছেন বলে অভিযোগ ওই বিজেপি নেতার। অভিযোগ, নব্য সেই বিজেপির সদস্যার গাড়ি চেপে ঘুরছেন দুই নেতা। যোগ দেওয়ার এক মাসের মধ্যেই এখন ওই সদস্যা প্রভাব বিস্তার করছেন ওই জেলায়। এমনকি তাঁকে পুরসভায় প্রার্থী করা হবে বলে প্রচারও শুরু হয়ে গেছে।
…………………………………………………………………………….

আরও জানতে নজর রাখুন
অফিস হোয়াটসঅ্যাপ ৯৪৩৩৭৯২৫৫৭
……………………………………………………………………………

বিভিন্ন মণ্ডল সভাপতিদের অভিযোগ, দলে এখন অন্যদল থেকে আসা প্রোমোটার, সমাজ বিরোধীদেরই রমরমা। এরা আর আমাদেরই সন্মান দিচ্ছেন না। আর আমরাও চাই না এদের সঙ্গে ঘর করতে। এক সময় বামপন্থীদের চাপ, অন্যদিকে ঘরের অশান্তি সহ্য করে বিজেপির দায়িত্ব নিয়ে কাজ করেছি। আজ সেই দল চলে গেছে অন্যদের হাতে। তাঁর কথা, ’বিজেপি তো ছাড়তে পারবো না তাই ভাবছি পদ থেকেই সরে যাব।’ এই একই কথা প্রকাশ করেছেন জেলার বিভিন্ন পদে দায়িত্বে থাকা নিচু তোলার নেতারা। কয়েকজন নেতা তো তাঁদের ভয়ের কথাও জানিয়েছেন। তাঁরা আশংকা করছেন এই নতুনদের হাতে হয়ত একদিন মারধরও খেতে হবে। তাই আগে থেকেই সরে যেতে চাইছেন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

15 + sixteen =

amaderbharat.com

Welcome To Amaderbharat.com, Get Latest Updated News. Please click I accept.