অন্ধকারে প্রদীপ জ্বালালে যেসব সুফল পাওয়া যাবে

অধ্যাপক উত্তম অধিকারী, ৪ এপ্রিল: অন্ধকার অর্থাৎ বিপদ, অজ্ঞানতা, বিনাশ, হিংসা, ঈর্ষা, লোভ, উৎপীড়ন ইত্যাদি নেতিবাচক বা অসুরিক শক্তির প্রতীক। হিন্দু সংস্কৃতিতে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন অন্ধকারময় শক্তিকে পরাজিত করে। এটা অন্ধকারের উপর আলোর বিজয়, বিনাশের ওপর সৃষ্টির বিজয়, অজ্ঞানতার উপর জ্ঞানের বিজয়ের প্রতীক।

বিশ্বে ২০০টিরও বেশি দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ আজ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত, হাজার হাজার লোক মারা যাচ্ছে। মানব সভ্যতার এমন সংকটের নজির ইতিহাসে দ্বিতীয় নেই। এই সংকট মোকাবিলায় ভারতবর্ষ তথা বিশ্বের চিকিৎসা বিজ্ঞানে গবেষণার কাজ জোর কদমে চলছে। কিন্তু এই লড়াইয়ে মানুষের মানসিক এবং আর্থিক শক্তি ও মনোবল অনেকটাই বিপর্যস্ত। এমন এক সংকটময় পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ৫ এপ্রিল রাত ন’টায় ৯ মিনিটের জন্য ভারতবাসীকে প্রদীপ জ্বালাতে অনুরোধ করেছেন। অনেকেই এই উদ্যোগের সমালোচনা করছেন এবং প্রদীপ জ্বালানোর কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পাচ্ছেন না তাঁরা। প্রশ্ন করছেন প্রদীপ জ্বালিয়ে কি করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ করা যায়? করোনাভাইরাস এর মোকাবিলা করার জন্য ভারত সরকার বা বিভিন্ন রাজ্য সরকারগুলি যে পদক্ষেপ করছে চিকিৎসকরা যে ভূমিকা পালন করেছন তা প্রশংসনীয়। কিন্তু প্রদীপ জ্বালানোর বিষয়টিও মজা করার জন্য নয় বা কোনো পলিটিক্যাল গিমিক নয়, যেকোনো অন্ধকারময় সময় (দুর্যোগের সময়) ভারতীয় সংস্কৃতিতে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন বা অগ্নির উপাসনা হিন্দুদের মনে এই আস্থা এবং বিশ্বাস সঞ্চার করে যেই অন্ধকারকে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব এবং এই প্রতিকূল পরিস্থিতি দ্রুত অবলুপ্ত হবে।

এই প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যায় আসি, ভারতবর্ষের দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে এ কথার মান্যতা আছে, দেবী রাজরাজেশ্বরী প্রদীপ এর মধ্যে বিরাজ করেন। দেবী রাজরাজেশ্বরী হলেন দেবী দুর্গা–দেবী লক্ষ্মী, দেবী সরস্বতীর সম্মিলিত রূপ। দেবী দুর্গা শক্তির প্রতীক, দেবী লক্ষ্মী অন্নসংস্থানের প্রতীক, দেবী সরস্বতী জ্ঞান ও বুদ্ধির প্রতীক। আমরা আমাদের বাড়িতে পরিবারের কল্যাণে ও সুখ সমৃদ্ধির জন্য প্রতিদিন প্রদীপ জ্বালাই তুলসী তলায় বা গৃহদেবতার সামনে। কিন্তু ৫ এপ্রিল আমরা প্রদীপ জালাবো সারা দেশ তথা বিশ্ববাসীর আরোগ্য কামনায়। কারণ এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে লড়াই করার জন্য চাই মানসিক ও দৈহিক শক্তি (immunity) , লকডাউন এর বাজারে রোজগার হীন মানুষের জন্য চাই অন্য, করোনা ভাইরাসের জন্য প্রতিষেধক উৎপাদনের জন্য চাই নতুন গবেষণা, যার জন্য প্রয়োজন জ্ঞান বা বুদ্ধির। প্রদীপ বা মোমবাতি প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে আমরা এই তিন দেবীর কাছ থেকে এই তিন রকম শক্তির আরাধনা করব। এছাড়া আমরা সবাই জানি যে প্রদীপের মধ্যে পাঁচটি গুণের কথা প্রচলিত আছে যেমন স্নেহ, বুদ্ধি, স্থিরপ্রতিজ্ঞা, ধৈর্য ও সাবধানতা। বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষের মধ্যে এই পাঁচটি গুণের অবশ্যম্ভাবী প্রয়োজন, এই সংকটময় পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য। এক্ষেত্রে অবৈজ্ঞানিকতার প্রসঙ্গ কোথা থেকে উত্থাপিত হচ্ছে তা বোঝা দুরূহ কাজ। ধর্ম হল আস্থা বা বিশ্বাস এবং প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মধ্য দিয়ে চিরন্তন ভারতীয় তথা হিন্দু সভ্যতায় আমরা আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করি যেকোনো সঙ্কটজনক পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য।

কিছু নিদর্শন দিলে বিষয়টি আরো পরিস্কার হবে। উত্তর ভারত ও পশ্চিম ভারতের রাজ্যগুলিতে ভাই দুজ, সমগ্র ভারতে রাখি পূর্ণিমা, পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরাতে ভাইফোঁটা তিথিতে বাড়ির দিদি ও বোনেরা ভাইয়ের মঙ্গলকামনায় ভাইকে রাখি পরায় বসন্ত বাঁধে এবং প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করে এই কারণে যে তাদের ভাইকে যাতে যম অর্থাৎ মৃত্যু স্পর্শ করতে না পারে। যেমন ভাইফোঁটার দিন হিন্দু বাঙালি বোনেরা এই মন্ত্র উচ্চারণ করে যে যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা অর্থাৎ তার ভাই সুস্থ সবল থাক মৃত্যু যাতে স্পর্শ করতে না পারে। সমগ্র বিশ্ব জুড়ে মৃত্যুমিছিল ভারতীয় সংস্কৃতি অনুযায়ী প্রতিটা গৃহে মা-বোনেরা প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করে বিশ্বের কোনও ভাইকেই যাতে যমে স্পর্শ না করতে পারে এই প্রার্থনাই করবে। এর চেয়ে বড় বিশ্বভ্রাতৃত্বের নিদর্শন আর কি হতে পারে? ভারতীয় সংস্কৃতিতে এটা সম্ভব।

সূর্য দেবতার আলো যেমন কৃষ্ণ ভক্ত, খ্রিস্ট ভক্ত ,আল্লাহ ভক্ত সবার উপর সমভাবে বন্টিত হয়, তেমনি এই প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে আরোগ্য কামনা যেমন রাম ভক্তের জন্য তেমন বাম ভক্তের জন্যও। সারাদেশ জুড়ে একই দিনে একই সময়ে প্রদীপ, মোমবাতি, টর্চ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে আমরা এক দেশ, এক প্রাণ এই অনুভূতি অর্থাৎ জাতীয়ঐক্য প্রতিফলিত হবে এবং সবাই একসাথে আছি, একসাথে লড়ছি করোনার বিরুদ্ধে এই মানসিক শক্তি সবার মধ্যে সঞ্চারিত হবে। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে এই প্রার্থনা সেই সকল ডাক্তার নার্স পুলিশ সাফাই কর্মী সাংবাদিকদের জন্য যারা তাদের পরিবার-পরিজনের চিন্তা না করে লড়াই করে চলেছেন। ট্রেন ও বাস জ্বালানোর সময় তাদের মুখে একটাও বিরোধিতার কথা শোনা যায়নি অথচ প্রদীপ জ্বালানোর কথা বললে ফেসবুক-টুইটারে তাদের এত আপত্তি কোথায় সত্যিই চিন্তার বিষয়, এই সব ব্যক্তি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ভারতবর্ষের ঐক্য এবং সংহতির প্রতীক ও প্রদর্শন কে কি ভয় পাচ্ছেন?

আপনাদের মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here