সাদা চামড়ার ইংরেজদের তাড়িয়ে সাদা পাঁঠা বলি দেওয়া হয়েছিল মাদুর্গাকে, আদিবাসী গ্রামে আজও সেই রীতি

আশিস মণ্ডল, রামপুরহাট, ১৩ অক্টোবর: ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে জয় এলে মা দুর্গাকে দেওয়া হবে সাদা পাঁঠা, এই প্রতিজ্ঞা ছিল বিপ্লবীদের। সেই রীতি আজও চলে আসছে আদিবাসী অধ্যুষিত ঝাড়খণ্ড সীমান্তে বীরভূমের রামপুরহাট ১ নম্বর ব্লকের সুলুঙ্গা গ্রামে। আদিবাসী রীতি মেনেই প্রায় ৯৩ বছর ধরে পুজো হয়ে আসছে ওই গ্রামে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। প্রাচীন রীতি মেনে পুজোর পুরোহিত আজও আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ। তাদের আচার মেনেই পুজো হয় সুলুঙ্গা গ্রামে।

গ্রাম সূত্রে জানা গিয়েছে, সুলুঙ্গা গ্রামে পুজো শুরু হয় ১৯২৮ সালে। গ্রামের বাসিন্দা ব্রজ মুর্মু পুজো শুরু করেছিলেন। সে সময় ব্রিটিশদের শোষণে অতিষ্ট হয়ে উঠেছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী মুখ সুলুঙ্গা গ্রামের ব্রজ মুর্মু এবং দুর্গা মুর্মু। আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষদের খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়া রুখতে দুর্গা পুজো শুরু করেছিলেন ব্রজ মুর্মু। পরে ব্রিটিশদের অত্যাচার বন্ধে মা দুর্গার শরণাপন্ন হয়েছিলেন ব্রজ মুর্মু এবং দুর্গা মুর্মু। মানত করেছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন করতে পারলে দেওয়া হবে সাদা পাঁঠা। সেই থেকে আজও অষ্টমীর দিন সাদা পাঁঠা বলি দেওয়া হয়। তবে কেউ কেউ মানত করলে বলির সংখ্যা বাড়ে।

ব্রজ মুর্মুর বংশধর তথা পুজোর পুরোহিত খোকন মুর্মু, গ্রামের বাসিন্দা হোপনা টুডু বলেন, সে সময় গ্রামের অধিকাংশ আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ খ্রিস্টান হয়ে যাচ্ছিলেন। ঝাড়খণ্ডের বেনাগড়িয়ার খ্রিস্টান মিশনারির লোকজন গ্রামে প্রলোভন দেখিয়ে আদিবাসীদের ধর্মান্তরিত করত। অন্য দিকে ছিল ব্রিটিশদের শোষণ। দু’য়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন জারি রাখতে পুজো শুরু করেছিলেন ব্রজ-দুর্গা। বৃষ্টি নির্ভর এই এলাকার পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে একটি কাঁদর। যার নাম ভুটকা কাঁদর। সেই কাঁদরে বাঁধ দিয়ে জল ধরে রাখতে পারলে বৃষ্টি নির্ভর ওই এলাকায় চাষাবাদ হত। সেই জন্যই ঝাড়খণ্ডে ভুটকা কাঁদরে একটি বাঁধ দেওয়ার পরিকল্পনা নেন ব্রজ মুর্মু ও দুর্গা মুর্মু। এই মতো ১৯২৫ সালে বাঁধ নির্মাণের আবেদন জানিয়ে ডাকযোগে চিঠি পাঠানো হয় সিউড়ি কালেক্টরের কাছে। কিন্তু ইংরেজরা তাঁদের আবেদনে সাড়া না দেওয়ায় শেষে এক প্রকার গায়ের জোরেই নুরি পাথর এবং চুন সুরকি দিয়ে বাঁধ তৈরি করেছিলেন তাঁরা। সে সময় মা দুর্গার কাছে শপথ করেছিলেন সাদা চামড়ার ইংরেজদের তাড়াতে পারলে দেবেন সাদা পাঁঠা। সেই থেকে আজও সাদা পাঁঠা বলি হয়ে আসছে”।

সুলুঙ্গা গ্রামে ১১৮ পরিবারের বাস। অধিকাংশই আদিবাসী। তাদের মধ্যে অর্ধেক ঘর এখন খ্রিষ্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে। এই পুজোর পুরোহিত আদিবাসী। আদিবাসী রীতি মেনেই এখানে পুজো হয়। কলা বউ স্নানের কোনও রীতি নেই। পাথর খাদানের পরিত্যক্ত জলাশয়ে ঘট ভরে প্রতিষ্ঠা করা হয় মণ্ডপে। এরপরেই শুরু হয় পুজো পাঠ। আদিবাসী ভাষায় মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে পুজো করা হয়। আশেপাশের বেশ কয়েকটা গ্রামের মানুষ পুজো দেখতে ছুটে যান সুলুঙ্গা গ্রামে। এক সময় অস্থায়ী মণ্ডপ গড়ে পুজো করা হত। বছর পাঁচেক আগে সেখানেই চাঁদা তুলে স্থায়ী মণ্ডপ গড়ে তোলেন।

আপনাদের মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here