জন্মাষ্টমী কেন পালন করা হয়

ডাক্তার রঘুপতি সারেঙ্গী, কোচবিহার,১১ আগস্ট:

ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিৎ
নায়ং ভুত্ত্বা ভবিতা বা ভূয়।
………গীতা’র স্পষ্ট উদঘোষ।
আত্মা’র কখনো জন্ম হয় না, মৃত্যুও হয় না। তাই, জন্মের পরেই কেবল এনার অস্তিত্ব ভাবাটা আমাদের অজ্ঞতা-প্রসূত এক কল্পনা মাত্র।
“অজো নিত্য: শাশ্বত অয়ং..।”
ভারতীয় সনাতন সংস্কৃতির চেতনার নাম শ্রীকৃষ্ণ। ইনি আত্মা স্বরূপ। তাই যদি হয়, তবে প্রতিবছর শ্রাবণ মাসের কৃষ্ণা অষ্টমী তিথিতে এই জন্মাষ্টমী পালনের প্রহসন কেন ? জন্মই যাঁর হয় না তাঁর জন্মদিন-পালন হয় কী করে ?
আসুন বিষয়ের একটু গভীরে গিয়ে আমরা নিজেরাই নিজের বোধ দিয়ে এই মার্মিক প্রশ্নের সমাধান খোঁজার একটা চেষ্টা করি।

ভারতীয় সনাতন-শাস্ত্র মূলতঃ ৩ প্রকারের

“শ্রুতি-স্মৃতি- পুরানাঃ”
“শ্রুতি-শাস্ত্র” বলা হয় বেদকে। (মূলতঃ ঋগ্বেদ যা ৫০০০ খ্রিস্ট-পূর্ব কালে রচিত)। স্মৃতি-শাস্ত্র বলে পরিচিত পুস্তকগুলির রচনাকাল ১৪০০ থেকে ৯০০ খ্রিস্ট পূর্বের মধ্যে।
পরবর্তী ব্রহ্ম-পুরান, বিষ্ণু- পুরান, হরিবংশ এবং ভগবৎ আদি ভক্তি-শাস্ত্রের প্রকাশ।
ভক্তি শাস্ত্রের দৃষ্টিভঙ্গিতে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম কৃষ্ণ পক্ষের অষ্টমী তিথি।
জন্মাষ্টমী তিথি পালন মূলতঃ বৈষ্ণব পরম্পরার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হলেও স্মার্তরাও (স্মৃতি শাস্ত্রের অনুযায়ী) পালন করেন।
বেদের সর্বব্যাপক চৈতন্য বা পরম-পুরুষ ( *ওঁ*)নিরাকার হলেও সাকার ঈশ্বরের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতও পাওয়া যায়।
যাক ভক্তিপথের পথিকদের প্রসঙ্গে আসা যাক। তাঁরা বিশ্বাস করেন, কংসের কারাগারে বন্দি অবস্থাতেই রোহিনী নক্ষত্রের এই বিশেষ লগ্নে বাসুদেব–দেবকি’র কোল আলো করে তিনি জন্ম নেন গোপাল ।
দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ডি.ডি.কোসম্বি
তাঁর The dark history of Jodues বইতে প্রাচীন ভারতেই কৃষ্ণের অস্তিত্ব প্রমান করতে চেয়েছিলেন। পরে, গুজরাটের উপকূলে সমুদ্রগর্ভে এক অনুপম রাজপ্রাসাদের আদলে তৈরি এক নির্মাণ খুঁজে পাওয়া গেলে বৈষ্ণবরা একে শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকা বলে দাবি করেন। শতপথ ব্রাহ্মণ এবং ঐত্তেরীয় আরণ্যকেও বৃষ্ণি বংশের উল্লেখ পাই। কথিত, এই বংশেই কৃষ্ণ ঠাকুরের জন্ম। বারাণসীর জগদগুরু শংকরাচার্য্য মঠের প্রধান স্বামী গোবিন্দ সরস্বতী বিষ্ণু-পুরাণ এবং ভাগবদ পুরাণ থেকে প্রমান দেন, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের ৩৬ বছর পরে শ্রীকৃষ্ণ দ্বারকা ত্যাগ করেন। আর কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় তাঁর বয়স ছিল ৮৯ বছর। অর্থাৎ তাঁর প্রয়াণ হয়েছিল ৮৯+৩৬=১২৫ বছর বয়সে, ৩১০২ খ্রিস্টাপূর্বাব্দের ১৮ই ফেব্রুয়ারি, প্রবাস তীর্থে।
ঠিকই তো। “জাতস্য হি ধ্রুব: মৃত্য: …. ধ্রুবং জন্ম মৃতস্যচ।”
নিরাকার ব্রহ্ম যখন স্বগুণ-সাকার রূপে আমাদের মধ্যে বিরাজমান হন তখন তো তিনি আমাদের মতোই সাধারণ জন্ম-যন্ত্রনা-মৃত্যু সবই তাঁকে লোকশিক্ষার জন্য ভোগ করতেই হয়।
আজকের এই পবিত্র মুহূর্ত নিষ্ঠার সাথে পালিত হচ্ছে বিশ্বের প্রায় প্রতি প্রান্তে। ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, পাকিস্তান, আরিজোনা, আমেরিকা, ত্রিনিদাদ, জ্যামাইকা’র মন্দিরে। এমনকি আরবের দেশগুলিতেও। আর আমাদের
বৃন্দাবন-মথুরা-দ্বারকা সহ সারা ভারতবর্ষ জুড়ে ভক্তরা বিগ্রহ বা মূর্তিকে স্নান করিয়ে নববস্ত্র পরিয়ে, ফুল-চন্দন আর আলোর রোশনাই দিয়ে সাজিয়ে, মায়েদের নিজের হাতে বানানো ক্ষীর-ননী-নাড়ু খাইয়ে, কৃষ্ণের অষ্টোত্তর-শতনাম গেয়ে, আনন্দ-উছ্বাসের মধ্য দিয়ে সারাদিন কাটান।

যে প্রশ্নটি উস্কে দিয়ে লেখার শুরু করেছি, “যিনি জন্ম-মৃত্যুর কাল চক্রের উর্ধে তাঁর জন্ম-দিন পালনের যৌক্তিকতা কোথায়?
দেখুন, বেদ একটি স্থিতি’র নাম। তপস্যা এবং যজ্ঞই এর একমাত্র মত ও পথ। অত্যন্ত সুমেধা ও ক্ষুরধার বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের পক্ষেই সম্ভব।
স্মৃতি-শাস্ত্র বোঝা অপেক্ষাকৃত সহজ। মধ্যম মেধা-বুদ্ধির মানুষজনও এর অনুশীলন করতে পারেন। মূলতঃ দর্শনকে বুঝতে হয়। কর্ম-কান্ডও রয়েছে। কোনো ঋষি-তুল্য ব্যক্তির সান্নিধ্য পেলে শেখা সহজ হয়। আর, ভাগবত ধর্মের এই প্রচার এবং প্রসার এর যুগে ঈশ্বর সত্বা কেমন?
উত্তরঃ “ভাবগ্রাহী জনার্দন”।
ভাব দিয়েই শুরু, ভাবেরই আধিক্য, ভাবেই সাধনার পরিসমাপ্তি। আমাদের মতো অতি সাধারণজনও এই পথের পথিক হতেই পারেন। এখানে না প্রয়োজন পড়ে দর্শনের গভীরে যাওয়ার, না জানতে হয় পানিনী’র অষ্টাধ্যায়ীর মতো আপাত রুক্ষ বিষয়।
শুধু আমাদের খেয়াল রাখতে হয়, বিধি আর নিয়মের বেড়াজালে বা অজ্ঞতার অহঙ্কারে এই পথ অনুশীলন করতে করতেই মন যেন এটা ভুলে না যায় যে “উসকে আগে ঔর ভী কুছ পানা যায়।”
জয় শ্রী-কৃষ্ণ। জয় গোপাল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here