তিন বছরের আইনি লড়াইয়ে প্রথম পর্বে জয়, ববিতার ভাবনা রায়ের কার্যকারিতা নিয়ে

অশোক সেনগুপ্ত, আমাদের ভারত, ২০ মে: শুক্রবার দিনভর ব্যস্ততা, টানটান উত্তেজনায় অনেকটাই ক্লান্ত ববিতা সরকার। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিলিগুড়িতে দিদির হেফাজতে রেখে আসা দুটি বাচ্চার চিন্তা, বৃহস্পতিবার ট্রেন থেকে ববিতা ও তাঁর স্বামীকে নামিয়ে দেওয়ার মানসিক চাপ, মালদা থেকে কলকাতায় গাড়ি ভাড়া করে আসার আর্থিক ধাক্কা এবং শারীরিক ধকল। তবে সব চাপ যেন উপশম হয়ে উঠল বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের মানবিক এবং যুক্তিসঙ্গত রায়ে।

লড়াই ছিল খোদ শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী পরেশ অধিকারী এবং তাঁর মেয়ে অঙ্কিতা অধিকারীর বিরুদ্ধে। রীতিমত প্রতিকূলতার মধ্যে লড়াই করতে হয়েছে শিলিগুড়ির মেয়ে ববিতাকে। যে লড়াইয়ের জেরে অঙ্কিতার চাকরি বাতিল এবং গত ক’বছরের অর্জিত অর্থ ফেরতের নির্দেশ দিল আদালত। শুক্রবার সন্ধ্যায় এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে ববিতা বারবার ইতস্তত করছেন। বলছেন, “বুঝতেই পারছেন কী চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি।”

ববিতা জানান, “শৈশবে কেটেছে অনেকটা গন্ডগ্রামেই। রেগুলার বিএডে চান্স পেয়েছিলাম। ২০১৬ সালের ৪ ডিসেম্বর স্কুলশিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষায় বসি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে একাদশ দ্বাদশ শ্রেণির জন্য। মেধাতালিকা প্রকাশ হয়েছিল ২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বর। সেই তালিকায় নাম প্রথম ২০তেই ছিল।”

কিন্তু পরে সেই তালিকা বাতিল করে দেয় এসএসসি। নতুন তালিকায় এক ঘর পিছিয়ে যায় ববিতার নাম। ববিতার থেকে ১৬ নম্বর কম পেয়েও মেধা তালিকার শীর্ষে ওঠে পরেশ-কন্যা অঙ্কিতার নাম। নতুন তালিকায় ববিতার নাম চলে যায় ওয়েটিং লিস্টে। তার পরই শুরু হয় তাঁর দৌড়ঝাঁপ।

ট্রেনের ভোগান্তির কথা বললেন! কেন হল? ববিতা জানান, বৃহস্পতিবার তাঁকে হাইকোর্টে ডেকে পাঠিয়েছিলেন বিচারপতি। কলকাতা পর্যন্ত ট্রেনের টিকিট ছিল না। টিটিই জোর করে মালদায় নামিয়ে দেন। ববিতারা বারবার অনুরোধ করেন হাইকোর্টে জরুরি কাজ আছে। তাতেও লাভ হয়নি। বাড়তি খরচ আর সময় গুণাগার দিয়ে মালদা থেকে গাড়িতে এসে আজ দরকারি কাজ সারেন ববিতা।

গত পাঁচ বছর ধরে সংসার সামলে ‘প্রভাবশালী’ মন্ত্রীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়েছেন ববিতা। পাশে পেয়েছিলেন স্বামী সঞ্জয় কর্মকারকে। ২০১৯-এ আদালতের দ্বারস্থ হয়ে মামলা করেন ববিতা। অঙ্কিতার বাবা যে মন্ত্রী, তখনও জানতেন না ববিতা বা সঞ্জয়। পরে জানতে পারেন। কিন্তু তখনও ‘ক্ষমতার ঝড়ে’ উড়ে যাবেন, এই ভেবে পিছিয়ে যাননি তাঁরা। লড়াই কঠিন হবে জেনেও হাল ছাড়েননি ববিতা এবং তাঁর স্বামী সঞ্জয়।

সঞ্জয় বলেন, ‘‘আমি ববিতার জন্য গর্ববোধ করছি। সত্যের জয় হল। আমরা ন্যায্য দাবি করেছিলাম। আজ আমার পরিবার খুবই খুশি। আমরা কারও বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত লড়াই করিনি। কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে এই লড়াই ছিল না। আমরা ন্যায়ের অধিকারের জন্য লড়েছি। অবশ্যই এই লড়াই কষ্টের ছিল। আমরা বিভিন্ন অফিসে ঘোরাঘুরি করেছি। স্থানীয় নেতা-মন্ত্রীদেরও জানিয়েছি। কিন্তু কোথাও কোনও উত্তর পাইনি। তাই অবশেষে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।’’

অবশেষে সেই লড়াই মর্যাদা পেল শুক্রবার, কলকাতা হাইকোর্টের রায়ে। উচ্চ ন্যায়ালয় রায় দিয়েছে ববিতাকে শিক্ষিকার চাকরি দেওয়ার। কিন্তু কতটা কার্যকর হবে সেই রায়, রীতিমত সেই সংশয়ে ভুগছেন ববিতা। অর্থাৎ, চিন্তা আদালতের রায়ের কার্যকারিতা নিয়ে। সেই সঙ্গে তাঁর নিজের কথায় ‘নিরাপত্তাহীনতা’।

আপনাদের মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here