বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস! অতিমারীর আবহে আজকের বাস্তবতা

আমাদের ভারত, ১২ জুন : কবি নজরুলের ভাষায়, ‘তুমি নও শিশু দুর্বল, তুমি মহৎ ও মহীয়ান / জাগো দুর্বার, বিপুল বিরাট অমৃতের সন্তান’,সেই অমৃতের সন্তানরা আজ অতিমারির কবলে পড়ে জীবন থেকে খুইয়েছে অমূল্য সম্পদ ‘ শিক্ষা’, ছোট্ট হাত দুটিতে নিয়েছে শ্রমের সরঞ্জাম । বিশ্বজুড়ে শিশুশ্রমিকের সমস্যা সাম্প্রতিক নয়, এই সমস্যা বহু দিনের। কিন্তু শিশুশ্রমিক সংখ্যার এই ঊর্ধ্বগতি দেশ তথা বিশ্বের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর গুরুতর প্রভাব পড়বে বলে মন্তব্য বিশেষজ্ঞদের।
ইন্টেরন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন এবং ইউনিসেফের পক্ষ থেকেও এই দাবিকে আরও জোরাল করেছে। তাদের নতুন রিপোর্ট অনুযায়ী গত দুই দশকে বিশ্বজুড়ে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১৬ কোটি। কেবল চার বছরেই প্রায় ৮৪ লাখ শিশু এই সংখ্যায় যুক্ত হয়েছে এবং লক্ষ লক্ষ শিশু করোনার জেরে শ্রমিকে পরিনত হবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংস্থা দুটি।

২০০২ থেকে ১২ই জুন দিনটিকে বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস হিসাবে পালন করা হয়। শিশুশ্রম সম্বন্ধে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে এবং শিশুশ্রমিকের মত অবৈধ কাজকে নিবারণ করার উদ্দেশ্যে ইন্টেরন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) এই দিনটিকে বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস হিসাবে পালনের সূচনা করে। আইএলও এবং ইউনিশেফ তাদের ‘গ্লোবাল এস্টিমেট্স ২০২০, ট্রেন্ডস অ্যন্ড দ্য রোড ফরওয়ার্ড’ নামক রিপোর্টে বলেছে, ২০ বছরে এই প্রথম শিশুশ্রমিক প্রতিরোধের প্রক্রিয়া স্থগিত হয়েছে যা সংখ্যাকে ঊর্ধ্বমুখী করেছে।
তাদের মতে, এর আগে ২০০০ সাল থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে এই সংখ্যা যথেষ্ট কমিয়ে আনা গেছিল। রিপোর্ট অনুযায়ী, ৫-১১ বছরের শিশুশ্রমিকের সংখ্যা বেড়েছে অনেক গুণ, যা বিশ্বব্যাপী মোট শিশুশ্রমিকের অর্ধেক। ৫-১৭ বছরের শিশুশ্রমিক, যারা বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে কাজ করে, যা তদের স্বাস্থ্য, সুরক্ষা এবং নৈতিকতাকে ক্ষতিগ্রস্থ করতে পারে। ২০১৬ সাল থেকে ৫-১৭ বছরের শিশুশ্রমিকের সংখ্যা ৬৫ লক্ষ থেকে বেড়ে ৭ কোটি ৯০ লক্ষে পৌঁছেছে। তাদের মতে, ২০২২ সালের মধ্যে বিশ্বব্যপি অতিমারির জেরে আরও ৯ লক্ষ শিশু শ্রমিকে পরিণত হবে। আর যদি শিশুরা সামাজিক সুরক্ষা কভারেজ না পায় তাহলে এই সংখ্যা কয়েক বছরেই ৪ কোটি ৬০ লক্ষ পর্যন্ত যেতে পারে বলে তারা সতর্ক করছে।
অতিমারিতে অর্থনৈতিক সঙ্কট এবং স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়া কার্যত শিশুদের পড়াশোনা ছেড়ে কর্মসংস্থানে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পরা গরিব পরিবারে শিশুরা স্বইচ্ছায় হোক কিংবা জোড় করেই স্কুলছুট হয়ে শ্রম করতে বাধ্য হচ্ছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, শহরের তুলনায় গ্রামেই শিশুশ্রমিকের সংখ্যা ৩ গুন বেশি। শিশুশ্রমিকের প্রায় ৭০ শতাংশই কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত।
শিশুশ্রম আর্থ-সামাজিক পরিকাঠামোর সঙ্গে শিশুদের শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যকেও ক্ষতিগ্রস্থ করছে প্রতিনিয়ত। তাদের মৌলিক অধিকার, তাদের পড়াশোনা, তাদের ভবিষ্যতের সুযোগ নষ্ট করে তাদের পরবর্তি প্রজন্মকেও শিশুশ্রমিকের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে এই প্রথা রুখতে সব দেশের সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে দুই সংস্থা।
আইএলও এবং ইউনিশেফ তাদের রেপর্টের মাধ্যমে, সরকার এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ব্যাঙ্ককে সামাজিক সুরক্ষার এবং কর্মসংস্থান ছেড়ে স্কুলে ফেরার নানান উদ্যোগে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাধান্যতা দেওয়ার আর্জি জানিয়েছে। তাছাড়াও শিশুদের যাতে শ্রম করতে না হয় তার জন্য কর্মসংস্থান, শিল্প খাত, কৃষি উন্নয়ন, গ্রামীন জীবিকা ও পরিকাঠামোতে বিনিয়োগের পরামর্শ দিয়েছে।

আপনাদের মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here