নল দময়ন্তী কথা! ধীতিম্ দাস‍্যামি তে পরাম্

ডাক্তার রঘুপতি সারেংগী, কোচবিহার, ১৩ সেপ্টেম্বর:
মহাভারতের মহত্ব, গভীরতা ও বিশালতা বুঝাতে বলা হয়ঃ—
” মহত্ত্বাদ্ ভারতবত্ত্বাচ্চ মহাভারতমুচ‍্যতে।”
বাংলাতে ভাবানুবাদ করলে দাঁড়ায়,” যা নেই ভারতে, তা নেই মহাভারতে”….অর্থাৎ ভারতবর্ষের অধ্যাত্ম সত্বার নামই মহাভারত। একে বলে ভারতের “৫ম বেদ”।ইলিয়ার্ড-ওডিসি’র মতোই এক ‘মহাকাব্য’…মানে অতি-উন্নত মানের এক শ্রেষ্ঠ রচনা। কিন্তু Internet এ গিয়ে search করলে যে মৎস্য-দেশ, বিদর্ভ, গান্ধার, নিষদ, কাশী….. এ সবই পাওয়া যায়! তাই, আমার মনে হয়, প্রকৃত অর্থে মহাভারতকে শুধুই মহাকাব‍্য না বলে,
ইতিহাস-পুরাণ বলা অধিক যুক্তিযুক্ত।

তা যাই হোক, সেই তিন হাজার বা চার হাজার বছর আগের রচনা-শৈলী অনুসারে একই ধরণের ছোট ছোট অসংখ্য ঘটনার ঘন-ঘটা সারাটি কাব্য জুড়েই, ঘুরেফিরে।
আর এই প্রত্যেকটি ঘটনার পিছনে রাখা আছে ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ এই “চতুর্বর্গ-ফল” দানকারী কোনো না কোনো জীবনমুখী শিক্ষা।

Higher Geometry তে একটা জিনিস শেখানো হয়….’Fractal’. Fractal
হচ্ছে ” a geometric shape that has a fractional dimension exactly similar to it’s origin”…… যেমন মনে করুন মেঘ, বরফ, আরও সরল উদাহরণ হবে ফুলকপি। এদের যেকোনো অংশ থেকে, যত ছোট করেই কাটুন, একই রকম জিনিস পাবেন।
ঠিক তেমনি, পরাশর মুনি আর সত্যবতী(মৎস‍্যগন্ধা),
সান্তনু আর গঙ্গা, সাবিত্রী-সত্যবান, অর্জুন-
সুভদ্রা, কচ ও দেবযানী, দুষ্মন্ত-শকুন্তলা বা নল ও দময়ন্তী কিংবা ভীম ও হিড়িম্বা ইত্যাদি….. যেন সেই একই ধরণের অসংখ্য প্রেমের ঘটনা’র ‘Fractal’ সারা মহাভারত জুড়েই।
আজ আমরা, “নল ও দময়ন্তী”* র আখ্যান নিয়ে একটু আলোচনা করবো।

নিষাদ দেশ ছিল বল-শৌর্য‍্য সৌন্দর্য-ঐশ্বর্যে বিখ্যাত নল রাজার রাজপাঠ। আর, বিদর্ভ দেশের রাজা ছিলেন ভীম (এই ভীম পঞ্চ-পাণ্ডব নয়)। তাঁর ৩ পুত্র আর ১ কন্যা…. দময়ন্তী।
” দময়ন্তী তু রূপেণ তেজসা যশসা শ্রিয়ঃ।”
…..রূপ-যশ-সৌন্দর্যে অতুলনীয়া। অতীব গুণবতী ও ভাগ্যবতী রাজকন্যা। পাশাপাশি দুই রাজ্যের যুবক-রাজা এবং যুবতী রাজকন্যার কথা লোকমুখে। দিনের পর দিন, একে অন্যের প্রশংসা শুনে-শুনে পরস্পর পরস্পরকে না দেখেই মনে-মনে গভীর ভাবে ভালোবেসে ফেলে। শেষে, ধুমধাম করে গান্ধর্ব মতে সয়ম্বর সভার আয়োজন করা হয়। অগনিত রাজা উপস্থিত হন। নারদের মুখে খবর পেয়ে, স্বর্গ থেকে ইন্দ্র, অগ্নি, যম, বরূণ এই চার দেবতাও দময়ন্তীর পানিগ্রহন এর জন‍্য আসেন। এসেই, তারা নল রাজা’র রূপ-লালিমা দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে তাঁর কাছেই সাহায‍্য চান।
নল সবই শুনলেন কিন্তূ দেবতাদের কাছে তাঁর অক্ষমতার কথাও জানালেন……….”কথম্ তু জাতসংকল্প নারীম্ উৎসৃজতে পুমান্”…… অর্থাৎ নিজের সংকল্পে অটুট না থেকে অন‍্য কারুর অনুরোধে তা থেকে সরে আসা তো এক্ষেত্রে ঠিক নয়।
আর এদিকে পতিব্রতা দময়ন্তী নলকেই পতি হিসাবে পাওয়ার উদ্দেশ‍্যে ইন্দ্র আদি দেবতাদের সামনে করজোড়ে বলেন,
” দেবেভ‍্যোহম্ নমস্কৃত‍্য সর্বেভ‍্যো পৃথিবীপতে।
বৃণোতাম্ এব ভর্তারম্ সত‍্যম্ এতৎ ব্রবীমিতে।।”…
হে দেবগন! আপনারা প্রসন্ন হয়ে নলকেই স্বামীরূপে বরণ করতে আমাকে সাহায‍্য করুন।
এতে দেবতারা অতি সন্তুষ্ট হয়ে, বর প্রদান করে, যাওয়ার মূহূর্তেই কলি এবং দ্বাপর এসে হাজির হয়। তারা যেই শুনলো, দময়ন্তী দেবতাদের উপেক্ষা করে সাধারণ একজন রাজার গলায় বরমালা পরিয়েছে– রাগে-ক্ষোভে ফুঁসতে ফুঁসতে তখন কলি নলের দেহে প্রবেশ করলো।
রাজা নল আগে থেকেই অতিমাত্রায় দ‍্যূতক্রীড়ায় (দাবা)আশক্ত ছিলেন। তারপর, কলি’র প্রভাবে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েন। রাজ-কর্মচারী মন্ত্রী,পরামর্শদাতা, শেষে দময়ন্তীর শত আবেদন নিবেদনকেও উপেক্ষা করে দাবা খেলতে খেলতে তিনি একসময় সর্বস্ব হারিয়ে একফালি ছেঁড়া কাপড়েই নিজের রাজ‍্য ছেড়ে বনে-জঙ্গলে চলে যেতে বাধ‍্য হন। তখন, ছেলে, ‘সর্বদমন’কে বাপের বাড়িতে রেখে, স্বামী-সোহাগিনী দময়ন্তী নলকেই অনুসরণ করেন। ক্ষুধার্ত-তৃষ্ণার্ত সস্ত্রীক নল একসময়ে বনের ভিতরেই একটু নিরাপদ আশ্রয় পেয়ে দুজনেই ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। মধ‍্যরাতে অনুশোচনা-দগ্ধ নল এর মনে হয়, পরম সৌভাগ‍্যবতী দময়ন্তী তারই জন‍্য এতো কষ্ট পাচ্ছে। তাই আর এ মুখ না দেখিয়ে যে দিকে খুশি চলে যাওয়া ভালো। ওর রূপ আছে, বুদ্ধি আছে, সে তার মতো নিশ্চই গুছিয়ে নিবে। সুযোগ পেলে, বাবার বাড়িতেও ফিরে যেতে পারবে। এই ভেবে, শেষ রাতেই নল দময়ন্তীকে ত‍্যাগ করে বনের পথ ধরেই হাঁটতে হাঁটতে, ‘কারকোটক’ এর ছোবল খেয়ে জ্বালা সইতে সইতে, একসময়ে দূরে ঋতুপর্ণ রাজার দরবারে পৌঁছে ‘বাহুক’ নাম নিয়ে বাৎসরিক দশ হাজার স্বর্ণ মূদ্রার বিনিময়ে অশ্বচালক নিযুক্ত হন।
এদিকে দময়ন্তী ঘুরতে ঘুরতে একসময়ে চেদিরাজ সুবাহু’র আশ্রয়ে ‘সৈরন্ধ্রী’র (যারা রাজবাড়ি’র রাণী ও রাজ-কণ‍্যাদের ফুল সহ চুলের বিন‍্যাশ করে) ভূমিকা পালন করেন,হৃদয়ে থাকেন নল।

তিনি জানেন,” ভর্তানাম্ পরম নার্য‍্যা ভূষণম্ ভূষণৈর্বৃতা”…… নারীর পরম সৌন্দর্য্য তার স্বামী।
ঘটনাটা অনেক দীর্ঘ‍। যাক, শেষে রাজা ভীম মেধাবান ব্রাহ্মণদের সহায়তায় কন‍্যাকে ফিরে পান।
দময়ন্তী এসেই মা’কে জানায়, সে যে কোনো মূল‍্যেই নলকে ফিরে পেতে ঢায়। তা না হলে, জীবন ত‍্যাগ করাই ভালো। পিতার কানে গেলে উতলা দময়ন্তীর কথা ভেবে, তিনি আবার ও সেই ব্রাহ্মণশ্রেষ্ট সুদেব এর সাহায‍্য প্রার্থনা করেন এবং সফল হন।
নল ঋতুপর্ণ রাজাকে অশ্ববিদ‍্যা শিখিয়ে দেন। বিনিময়ে তাঁর কাছ থেকে দ‍্যূতক্রীড়া’র খুঁটিনাটি জ্ঞান জেনে নেন।
একে তো কারকোটক এর দংশনে সর্বাঙ্গ তখনও নীল হয়ে থাকায় কলিও জ্বলে-পুড়ে মরছিল; তারপর এবার আসল জ্ঞানের প্রাপ্তি হয়ে গেল।
কলি আর এখন যায় কোথা? “ন হি জ্ঞানেন সদৃশম্ পবিত্রমিহ বিদ‍্যতে”। ছড়ছড় করতে কলি বিদায় নিল। যাওয়ার সময়ে হাত-জোড় করে নলকেই বলে গেল………
” ধীতিম্ দাস‍্যামি তে পরাম্”।
নলরাজের এবার শুভ বুদ্ধির উদয় হোল। পুনরায় দ‍্যুত ক্রীড়ায় মনোনিবেশ করে হারানো সব সম্পত্তি একে একে ফিরে পেয়ে নল-দময়ন্তী মহা আনন্দে তাদের বাকি জীবন কাটালেন।
🌹😀🥰🌹

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here