এক বিস্মৃত ইতিহাসের সন্ধানে! পশ্চিমবঙ্গের নির্মাণ ও ভারতকেশরী ডঃ শ‍্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ‍্যায়

সৌমক পোদ্দার
আমাদের ভারত, ১৯ জুন:
“বাঙ্গালা ভাগ করল কে? শ‍্যামাপ্রসাদ আবার কে?” – একসময় বামপন্থীরা, বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানে যেসব বাঙ্গালী হিন্দু মুসলমানদের অত‍্যাচারে জর্জরিত হয়ে, অপহৃতা স্ত্রী, কন‍্যা, ভগিনীদের মুসলমানদের কবল থেকে উদ্ধার করতে না পেরে নিজেদের সাতপুরুষের ভিটেমাটি ‘চাঁটি’ করে পশ্চিমবঙ্গে পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং পরবর্তীকালে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে বামপন্থা অবলম্বন করেছিলেন, সেইসব বামপন্থীরা শ্লোগানটি বানিয়েছিলেন এবং ব‍্যবহার করেছিলেন। সেদিন পশ্চিমবঙ্গ না থাকলে তারা এসে কোথায় আশ্রয় নিতেন, কোথায় মন্ত্রিত্ব করতেন – সেসব কথা একবার চিন্তা করেও তারা দেখলেন না।

বাংলার বাঘ স‍্যার আশুতোষ মুখার্জির সুযোগ‍্য সন্তান, ভারতকেশরী ডঃ শ‍্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ‍্যায়কে আমরা একজন বিচক্ষণ রাজনীতিক হিসাবেই জানি। প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ। রাজনীতি ও শিক্ষা ছাড়াও আর্তসেবা, ধর্ম, সাহিত‍্য, সমাজসেবা প্রভৃতির দিকে ছিল তাঁর স্বচ্ছন্দ পদচারণা। তিনি ছিলেন ভারতমাতার এক কৃতী সন্তান। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছিলেন, হয়েছিলেন পোষ্ট গ্র‍্যাজুয়েট কাউন্সিল অফ আর্টস অ‍্যান্ড সায়েন্সের সভাপতি, ফ‍্যাকাল্টি অফ আর্টসের ডিন, ইন্টার ইউনিভার্সিটি বোর্ডের চেয়ারম‍্যান, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সের কোর্ট ও কাউন্সিল মেম্বার এবং আরও অনেক কিছু। ডঃ শ‍্যামাপ্রসাদ মুখার্জিই প্রথম ভারতীয়, যিনি রয়‍্যাল সোসাইটি অফ বেঙ্গলের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে তাঁর এই সব কৃতিত্বকে ছাপিয়ে তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ অবদান ছিল পশ্চিমবঙ্গকে পাকিস্তানের কবল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আসা।

ইংরেজের চক্রান্ত, মুসলিম লীগের দাবি, জাতীয় নেতাদের গদির লোভ আর অদূরদর্শিতার জন‍্য যখন ভারত বিভাজন অনিবার্য হয়ে উঠেছিল, পাকিস্তান গঠন রোধ করার কোনো উপায় ছিল না, তখন শ‍্যামাপ্রসাদ রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে পশ্চিমবঙ্গকে পাকিস্তানের কবল থেকে ছিনিয়ে এনেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ গঠনে শ‍্যামাপ্রসাদের এই কালোত্তীর্ণ ভূমিকা সম্পর্কে আজও বাঙ্গালী অজ্ঞাত। বলা ভালো, জানানোর কোনো চেষ্টাও করা হয়নি এ যাবৎ। তথ‍্যের বিকৃতি ঘটিয়ে এরা শ‍্যামাপ্রসাদকে পশ্চিমবঙ্গের মাটিতেই করে রেখেছেন ব্রাত‍্য, অপাঙক্তেয়। আর কে না জানে, তথ‍্য বিকৃতিতে কমিউনিস্টদের জুড়ি মেলা ভার? আলোচ‍্য প্রবন্ধে পশ্চিমবঙ্গ গঠনে ডঃ শ‍্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ‍্যায়ের সেই কালোত্তীর্ণ ভূমিকাকেই ঐতিহাসিক তথ‍্যসমূহের আলোকে সীমায়িত পরিসরে তুলে ধরবার চেষ্টা করবো।

সালটা ১৯৪৬। মার্চ মাস। লর্ড পেথিক লরেন্সের নেতৃত্বে ‘ক‍্যাবিনেট মিশন’ ভারতে আসে এবং একটি প্রস্তাব জনসমক্ষে পেশ করে। কী ছিল সেই প্রস্তাবে? প্রস্তাবে বলা হয়, মুসলিম লীগের পাকিস্তান গঠনের দাবিকে স্বীকৃতি দেওয়া হল। তবে সেই সঙ্গে ভারতে অন্তবর্তী সরকার গঠন ও সংবিধান রচনার প্রস্তাবও দেওয়া হয়। ক‍্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাবে এই অন্তবর্তী সরকার গঠন ও সংবিধান রচনায় অংশগ্রহণ নিয়ে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগে মতভেদ হয়। ফলতঃ, কংগ্রেস অন্তবর্তী সরকারে যোগদানের সিদ্ধান্ত নিলেও মুসলিম লীগ এই প্রক্রিয়া থেকে সরে আসে।

মুসলিম লীগের প্রধান মহম্মদ আলি জিন্নাহ সহ অন‍্যান‍্য নেতৃবৃন্দের চোখে তখন ভারত ভাগ করে মুসলমানদের জন‍্য স্বতন্ত্র ও স্বাধীন পাকিস্তান গড়ার স্বপ্ন। তাই ক‍্যাবিনেট মিশনের অন্তবর্তী সরকারে যোগদানের প্রস্তাব প্রত‍্যাখ‍্যান করে ১৯৪৬-এর ২৭-২৮ শে জুলাই মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের সভায় প্রস্তাব দেন ‘Direct Action’-এর। এই ‘Direct Action’-এর তত্ত্ব সম্পর্কে জিন্নাহ বললেন, “What we have done today is the most heroic act in our history… now the time has come for the Muslim nation to resort to direct action. I am not prepared to ethics. We have a pistol and are in position to use it.” (Azad, Morning News, 11.8.46)। জিন্নার এই বক্তব‍্য থেকেই স্পষ্ট তাঁর প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল? ১৯৪৬-এর ১৬ই আগস্ট, মুসলিম লীগের দাবিতে ‘প্রত‍্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’ (Direct Action Day) পালিত হয়। ফলতঃ, শুরু হয়ে যায় ভয়াবহ দাঙ্গা। প্রথমে কলকাতায়। তারপরে শুরু হয় পরিকল্পিত গণহত্যা। নোয়াখালি, ত্রিপুরা, ঢাকা, চট্টগ্রামে হিন্দুদের খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ করা হয়। বিশিষ্ট সাংবাদিক অনিমিত্র চক্রবর্তী লিখছেন, “অকস্মাৎ রাত্রির নিস্তব্ধতা খান-খান করে ধেয়ে এলো কাশেমের ফৌজ, মুসলিম লীগের নোয়াখালী অঞ্চলের নেতা কাশেম আলীর আদেশে। সঙ্গত দিল গোলাম সারওয়ারের নিজস্ব বাহিনী। উদ্দেশ্য হিন্দু বিনাশ। কয়েক মাস ধরে কলকাতায় যে হত্যাযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়েছিল, ১৬ই আগস্ট, ১৯৪৬–এ যা শুরু হয়েছিল মুসলমানদের নৃশংসতম আক্রমণে। কিন্তু শেষ হয়েছিল হিন্দুদের ভয়াল, ভয়ঙ্কর প্রত্যুত্তরে – তার প্রতিশোধের বন্য আকাঙ্ক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ইসলামিক নেতৃত্ব। মুহূর্তের মধ্যে নোয়াখালী জেলার রামগঞ্জ, বেগমগঞ্জ, রায়পুর, লক্ষ্মীপুর, ছাগলনাইয়া, সন্দ্বীপ অঞ্চলগুলি হল চরমতমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। পার্শ্ববর্তী টিপেরা জেলার হাজিগঞ্জ, ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর, লক্ষম ও চৌদ্দগ্রাম অঞ্চলগুলো হয়ে উঠলো উপদ্রুত। এক perfect planning-এর সাহায্যে Hindu racial extermination-এর পরিকল্পনা execute করা হল। এক সার্বিক হিন্দু গণহত্যার দরুণ কতজন যে প্রাণ হারালেন, কত হিন্দু নারী যে ধর্ষিতা হলেন, কতজনকে যে জোর করে গরুর মাংস খাওয়ানো হল, কতজন পুরুষকে যে জোর করে সুন্নত করিয়ে মেরে ফেলা হল, কতজন হিন্দু নারীকে যে গণধর্ষণ করে পা দিয়ে তাঁদের মাথার সিঁদুর ডলে দেওয়া হল, কতজন যে চিরতরে হারিয়ে গেলেন, কতজন হিন্দু নারী যে এক লহমায় গৃহবধূ থেকে বারবণিতায় রূপান্তরিত হলেন, তার হিসেব গত প্রায় ৮০ বছরেও পাওয়া যায়নি।’’

বাঙ্গালার প্রাদেশিক আইনসভায় তখন মুসলিম লীগের মন্ত্রিসভা এবং বাঙ্গালার প্রধানমন্ত্রী হুসেন শাহিদ সুরাবর্দী। শ‍্যামাপ্রসাদ সেই সময় দাঙ্গাবিধ্বস্ত কলকাতার মুসলিম লীগের মন্ত্রিসভার উদ্দেশ‍্যে বললেন, “ভুলে যাবেন না কলিকাতার এই হত‍্যালীলায় কারা সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হিন্দু-মুসলমান উভয় শ্রেণির দরিদ্র ব‍্যক্তিরাই দাঙ্গায় সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্তদের শতকরা নব্বই জনই গরিব ও নির্দোষ। নেতাদের যদি মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটে থাকে এবং তাঁরা এমন অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে থাকেন, যা সামলাবার হিম্মত তাঁদের না থাকে, তা হলে এমন দিন আসবে, যখন সাধারণ মানুষই ঘুরে দাঁড়াবে এবং নিজেরা পিষ্ট হবার বদলে নেতাদেরই পিষ্ট করে মারবে।”

শুধু বাঙ্গালা নয়, ১৯৪৭-এর ফেব্রুয়ারি মাসে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা শুরু হল পাঞ্জাবেও। দাঙ্গাবিধ্বস্ত পাঞ্জাবের হিন্দু ও শিখরা পাঞ্জাব ভাগের দাবি তুললো। ভারতীয় কংগ্রেসও এইসময় ভারত ভাগের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে নিতে বাধ্য হলো।

ইতিমধ‍্যে ভারতে ভাইসরয়ের দায়িত্ব নিয়ে আসেন লর্ড মাউন্টব‍্যাটেন। তিনি ঘোষণা করলেন, বৃটিশ কমনওয়েলথের অন্তর্ভুক্ত দুটি পৃথক ও স্বাধীন রাষ্ট্র হবে ভারত ও পাকিস্তান। অখণ্ড ভারতের দাবিদার শ‍্যামাপ্রসাদকেও মেনে নিতে হল এই ভারত বিভাজনের প্রস্তাব। তবে মুসলিম লীগের আগ্রাসন থেকে পশ্চিমবঙ্গকে বাঁচাতে এই প্রথম তিনি বাঙ্গালা ভাগের দাবিতে মুখর হলেন। তিনি বাঙ্গালা ভাগের পক্ষে জনমত গঠনের জন‍্য সারা বাঙ্গালায় হরতাল ডাকলেন। ১৯৪৭-এর ১৫ ই মার্চ ও ৪ ঠা এপ্রিল শ‍্যামাপ্রসাদের উদ্যোগে কলকাতায় ও তারকেশ্বরে শুরু হল Bengal Partition Convention। এই সম্মেলনে যোগ দিলেন লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ। সম্মিলিত কন্ঠের দাবিও উঠল বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব কার্যকরী করার। ৪ঠা মে সারা ভারত জুড়ে একই সঙ্গে ও একই উদ্দেশ‍্যে দু’হাজার জনসভার আয়োজন করা হল। হিন্দু মহাসভা সম্মেলনে সভাপতির অভিভাষণে শ‍্যামাপ্রসাদ বললেন, “মুসলমানদের প্রতি আমাদের কোনও বিদ্বেষভাব নেই। আমরা তাদের উপর বৈরীভাব পোষণ করি না কিংবা আধিপত‍্যও করতে চাই না। কিন্তু আমরা মুসলিম লীগের নীতির সমালোচনা করি… পাকিস্তান সৃষ্টি করে সাম্প্রদায়িক সমস‍্যার সমাধান হবে না। হিন্দু মহাসভা সকল সম্প্রদায়ের, বিশেষ করে মুসলমানদের প্রতি সহযোগিতার হাত প্রসারিত করতে এবং তাদের সঙ্গে একত্রে মিলে সারা ভারতের মঙ্গলার্থে সঠিক জাতীয় নীতি গড়ে তুলতে আগ্রহী।

এইসময় শ‍্যামাপ্রসাদের বঙ্গভঙ্গের সমর্থনে এগিয়ে আসেন বাঙ্গালার প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবীরা। কে ছিলেন না সেখানে? ভাষাতত্ত্ববিদ ডঃ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ঐতিহাসিক ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার, ডঃ মেঘনাদ সাহা, ডঃ যদুনাথ সরকার, ডঃ মাখনলাল রায়চৌধুরী প্রমুখ। দলিত নেতাদের মধ‍্যে প্রেমহরি বর্মণ ও মতুয়া মহাসংঘের প্রধান প্রমথরঞ্জন ঠাকুরও বাঙ্গালা ভাগের পক্ষে আহ্বান জানান। ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন করে লেখা হল, “দুই সম্প্রদায়ের মিলনের আশা সুদূর পরাহত। বঙ্গ বিভাজনের প্রস্তাব স্থির ভাবে বিচার করিবার প্রয়োজন হইয়াছে।”

যে যুক্তিতে জিন্নাহ দেশভাগের সাহস দেখালেন, ঠিক সেই যুক্তিতেই শ‍্যামাপ্রসাদ ও হিন্দু মহাসভা প্রদেশভাগের দাবি তুললেন। প্রমাদ গুণলেন জিন্নাহ ও জিন্নাহ অনুগামী অন‍্যান‍্য মুসলিম লীগ নেতৃবর্গ। জিন্না বড়লাট মাউন্টব‍্যাটেনকে বললেন, “Please do not give me moth-eaten Pakistan’’।

শ‍্যামাপ্রসাদের এই বঙ্গভঙ্গের দাবিকে নস‍্যাৎ করতে হুসেন শাহিদ সুরাবর্দী আনলেন যুক্তবঙ্গ গঠনের প্রস্তাব। তিনি বললেন, “ভারত বা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত না করে, বাঙ্গালাকে অখণ্ড ও স্বাধীন রেখে একটা যুক্তবঙ্গ তৈরি করা যেতে পারে।” আসলে জিন্নাহর যে অভিসন্ধি “…an independent Bengal would be a sort of Subsidiary Pakistan”, তাকেই মান‍্যতা দিলেন সুরাবর্দী। সুরাবর্দীর এই যুক্তবঙ্গের প্রস্তাবকে সমর্থন জানাতে এগিয়ে এলেন বাংলার প্রাদেশিক কংগ্রেসের প্রধান কিরণশঙ্কর রায় ও ফরোয়ার্ড ব্লকের প্রধান শরৎচন্দ্র বসু। এই প্রস্তাব সমর্থন করলেন তদানীন্তন বাঙ্গালার ছোটলাট ফ্রেডেরিক্ বারোজ। তিনি বললেন, বাঙ্গালা অখন্ড থাকুক এবং সেখানে মিলেমিশে সুরাবর্দী ও কিরণশঙ্কর গঠন করুক যৌথ মন্ত্রিসভা। যদিও মাউন্টব‍্যাটেন এই প্রস্তাবকে নাকচ করে জানালেন, “আসন্ন ভারত ভাগের ঘোষণাপত্রে তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী বাঙ্গালার জন‍্য স্বতন্ত্র ব‍্যবস্থা এবং কলকাতাকে ‘মুক্ত শহর’ ঘোষণা করা সম্ভব হবে না।”

শ‍্যামাপ্রসাদ সতর্ক প্রহরীর ন‍্যায় এই বিষয়ের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রেখেছিলেন। শেষ পর্যন্ত ১৯৪৭-এর ২রা মে, ভাইসরয় মাউন্টব‍্যাটেনকে নয় দফা যুক্তি দেখিয়ে বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব কার্যকরী করে পশ্চিমবঙ্গ গঠনের জন‍্য আবেদন করেন। সেই আবেদনপত্রে শ‍্যামাপ্রসাদ লেখেন, “…আমি ন্যায়তঃ ও ধর্মতঃ বিশ্বাস করি যে এটি আমাদের কাছে জীবনমরণ সমস‍্যা। ভারতে স্বাধীনতা লগ্ন আগতপ্রায় এবং আমরা বাঙ্গালীরা, যারা ভারতীয় জনগোষ্ঠীর মধ‍্যে সংখ‍্যায় নগণ‍্য নই, ভারতের সমৃদ্ধি সাধনে যাদের অবদান সর্বাধিক, তাদের দাবি করার অধিকার আছে যে ভবিষ্যৎ স্বাধীন ভারতে আমরা এমন একটি আলাদা স্থান চাই, যেখানে আমরা নির্ভয়ে বসবাস করতে পারি এবং শান্তি ও স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে পারি।”

শ‍্যামাপ্রসাদের এই আবেদনের একমাস পরই ২০শে জুন, ১৯৪৭-এ প্রদেশ ভাগ এবং ভারত ভাগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। শ‍্যামাপ্রসাদের সুদীর্ঘ ও অক্লান্ত শ্রমের বিনিময়ে গড়ে ওঠে আজকের পশ্চিমবঙ্গ।

এই ইতিহাস হয়তো অনেকেরই অজানা। আমরা সকলেই জানি বিধানচন্দ্র রায়কে পশ্চিমবঙ্গের রূপকার বলা হয়। তাঁর নামে কলকাতায় রাস্তা আছে, হাসপাতাল আছে, পার্ক আছে, রেল স্টেশন আছে, পৃথক একটি নগর আছে। অথচ পশ্চিমবঙ্গের স্রষ্টা ডঃ শ‍্যামাপ্রসাদ মুখার্জির অবদানকে পশ্চিমবঙ্গবাসী বিশেষ করে বর্তমান প্রজন্ম জানেই না। যারা জানে, তারাও সেটা অস্বীকার করতে চায়। এত বড় অকৃতজ্ঞতা বাঙ্গালী ছাড়া আর কার পক্ষে সম্ভব? আসুন, আমাদের এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার আজ সময় এসেছে। চলুন, আমরা সকলে একজোট হই। সকলে সম্মিলিতভাবে মিথ‍্যার বেড়াজাল ভেঙ্গে সত‍্যের দীপ্তির প্রকাশ ঘটাই। বাঙ্গালী মননে শ‍্যামাপ্রসাদকে প্রতিষ্ঠা করি, পশ্চিমবঙ্গের প্রতিষ্ঠাতা, বাঙ্গালী হিন্দুর পরিত্রাতা রূপে আমরা তাঁকে আমরা তুলে ধরি। সেটাই হবে আমাদের তথা বাঙ্গালীর তরফ থেকে ভারতকেশরীর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ‍্য।

গ্রন্থঋণ:
১. ডঃ শ‍্যামাপ্রসাদ, বঙ্গবিভাগ ও পশ্চিমবঙ্গ, দীনেশচন্দ্র সিংহ, গ্রন্থরশ্মি, কলকাতা, ১ম সংস্করণ, ১৪০৭ বঙ্গাব্দ।
২. ভারতকেশরী শ‍্যামাপ্রসাদ, সুশান্তকুমার সাহিত‍্যরত্ন, সাহিত‍্যম, কলকাতা, ১ ম সংস্করণ, ২০০১।
৩. বিজয় আঢ‍্য সম্পাদিত ‘স্বস্তিকা’, শ‍্যামাপ্রসাদ স্মরণ সংখ‍্যা, কলকাতা, ২০১০।
৪. দূরদর্শী রাজনীতিক ডঃ শ‍্যামাপ্রসাদ, শ‍্যামলেশ দাশ, শ্রীভূমি পাবলিশিং, কলকাতা, ১ম সংস্করণ, ১৯৯৭।
৫. Portrait of a Martyr, A Biography of Dr. Shyama Prasad, Balraj Madhok — Mookerjee Rupa, Delhi, Centenary Ed., 2001.
৬. The Life and Times of Dr. Shyama Prasad Mookerjee, Tathagata Roy, Prabhat Prakashan, New Delhi, 1st Ed., 2012.

লেখক পরিচিতিঃ পি.এইচ.ডি গবেষক, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিভাগ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়; কার্যকর্তা, ভারতীয় ইতিহাস সংকলন সমিতি, পশ্চিমবঙ্গ। (তথ্য এবং মতামত লেখকের নিজস্ব)

আপনাদের মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here